নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : হাতখরচের টাকায় টান পড়ছিল। সেই অভাব মেটাতে বুজুরুকির আশ্রয় নিয়েছিল বারো ক্লাসের ছাত্রটি। তাতে তার আশা প্রায় পূরণও হয়ে গিয়েছিল, যার মূলে রয়েছে আমাদের সেই কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস।

জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত এলাকা উত্তর ভুস্কাডাঙা। রবিবার আলো ফুটতেই জোর খবর ছড়িয়ে পড়ে উত্তর ভুস্কাডাঙার ঘরে ঘরে। এক কিশোর মাটি খুঁড়ে পেয়েছে মা-কালীর স্বর্ণমূর্তি। অতি প্রাচীন সেই দেবীপ্রতিমা নাকি খুবই জাগ্রত। নিমেষে ভিড় জমে যায় সেখানে। জানা যায় মাটি খুঁড়ে সেই মূর্তি বের করেছে প্রভাকর রায় নামে এক কিশোর। জমা হওয়া ভিড়ের কৌতূহল মেটাতে প্রভাকর জানায় এক আশ্চর্য ঘটনা। শনিবার গভীর রাতে তাকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে মা নাকি আদেশ দিয়েছিলেন, বাড়ির পাশের পতিত জমিতে মাটি খুঁড়লেই মিলবে মায়ের স্বর্ণমূর্তি। সেই স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করে ভক্তিভরে পুজো করলে মিলবে সমস্ত পাপ থেকে উদ্ধার, গোটা গ্রামে আসবে সুখ-শান্তি।

সেইমতো সকালে সেই জমি খুঁড়তেই নাকি এই প্রতিমা পেয়েছে প্রভাকর। ব্যাস, এর বেশি আর বলতে হয়নি। এই গল্প ছড়িয়ে যেতেই ভিড় বাড়তে থাকে। আর তার সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রণামীর অঙ্কও। দশ, বিশ, পঞ্চাশ, যে যেমন পেরেছেন মায়ের পায়ে প্রণামী দিয়েছেন। দুপুরের মধ্যেই বেশ কয়েক হাজার টাকা জমা হয়ে যায়। ভিড়ে ঠাসা জনতার চোখে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রটি তখন ‘পুণ্যাত্মা প্রাণ’।

মায়ের পায়ে ৫১ টাকা প্রণামী দিয়ে মণীষা বর্মণ নামে এক গৃহবধূ বলেই ফেললেন, এত বড়ো পুণ্য কর্মের সৌভাগ্য তাঁর নাকি এই প্রথম। যদিও এর পরে আরও বাকি ছিল। কিছু অত্যুৎসাহী মানুষ আলোচনা শুরু করেন, গ্রামে সুখ-শান্তি চিরপ্রতিষ্ঠা করতে এই প্রতিমা  রেখে একটি কালীমন্দির তৈরি করলে কেমন হয়? এতেও সাড়া পেতে দেরি হয়নি।

এ বার প্রমাদ গোনেন কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। এতক্ষণ রগড় দেখে তাঁরা কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কিন্তু যে হারে ভিড় বাড়ছিল এবং পাল্লা দিয়ে প্রণামীর অঙ্কও ফুলেফেঁপে উঠছিল, তাতে একটা গোলমালের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছিল। তাই আর দেরি না করে ময়নাগুড়ি থানায় খবর দেন তাঁরা। আসেন থানার আইসি সুকুমার মিশ্র। ভিড়ের মুখ থেকে গল্প শুনেই তাঁর সন্দেহ হয়। ডেকে আনা হয় একজন স্বর্ণকারকে। তিনি পরীক্ষা করে জানিয়ে দেন, প্রতিমাটি সোনার তো নয়ই, খুব বেশি পুরোনোও নয়। এর পরেই চাপে পড়ে সত্য কবুল করে প্রভাকর। বাড়ির দেওয়া হাতখরচের টাকায় কুলোচ্ছিল না। তাই বাড়তি টাকা জোগাড় করতেই এই ফন্দি আঁটে সে। শনিবার ময়নাগুড়ি বাজারের একটি দোকান থেকে ১৫০০ টাকায় পেতলের মূর্তিটি কিনে নিয়ে আসে। রবিবার আলো ফোটার আগেই বাড়ির পাশের জমিতে মাটি খুঁড়ে সেটি পুঁতে দেয় প্রভাকর। তার পর আলো ফুটতেই শুরু হয় নাটক।

তবে আসল সত্য জানাজানি হতেই কিন্তু উলটো প্রতিক্রিয়া শুরু হয় উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে। যাঁরা এতক্ষণ ভক্তিরসে আপ্লুত ছিলেন তাঁরাই এ বার মারমুখী হয়ে ওঠেন। বেগতিক দেখে পুলিশ ওই কিশোরকে থানায় নিয়ে যায়। এলাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় তাকে আপাতত পুলিশের হেফাজতেই রাখা হয়েছে।

সমস্ত ঘটনায় হতবাক প্রভাকরের বাবা তপন রায় জানিয়েছেন, ছেলের কেন এমন দুর্মতি হল তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না। গ্রামের মহিলারা বলছেন, ঠাকুর-দেবতা নিয়ে এমন দুষ্কর্ম ঠিক হয়নি।

যদিও প্রশ্ন কিন্তু একটা থেকেই যায়। টাকার লোভে কিশোরটি না হয় এমন কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, কিন্তু যাঁরা কিছু না ভেবেই কুসংস্কারে আবেগতাড়িত হয়ে প্রণামীর টাকা ফেলেছেন তাঁরাও কি এর জন্য দায়ী নন? জলপাইগুড়ি সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের সম্পাদক অধ্যাপক রাজা রাউত জানিয়েছেন, কার্যকারণ বিচার না করেই কোনো কিছুর ওপর অন্ধবিশ্বাস করাটাই এই ধরনের বুজুরুকির মূল। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিল একবিংশ শতাব্দীর আপাতনিরীহ এই কিশোর, যে এখন গোটা গ্রামের কাছে ‘ছিঃ ছিঃ’র পাত্র।

2 মন্তব্য

  1. Dear,sir/mam,
    Ami akjon posu sebok,amar akta street dogs & others animals er rescue center ache,Ami ei kaj ta gata 12 bachor bachor holo kori,amar kache 31 ta dogs ar 11 ta cats chili,ora San e rastay porechilo,key accident hoye porechilo,bartamane amar kache 8 ta dogs ar 4 ta beral ache,janosadharoner dristi bhangi posu pakhir opor hate bhalo hoy,apnader on line khaborer madhdhome janosadhroner proto kichu katha bolts chai.
    Jodi apanader sahojogita petam table kritiggo thaktam.
    Regards,Arindam Biswas.(Bengal heaven dogs – cats rescue & adoption center.)

    • ধন্যবাদ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। আপনি কি লিখতে চান?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here