পাপিয়া মিত্র

কলকাতা: উপলক্ষ জন্মসার্ধশতবর্ষে ভগিনী নিবেদিতাকে শ্রদ্ধা জানানো। এই সূত্রে স্মরণ করা হল ভারতের ইতিহাসের দিগাঙ্গনাদের। এক অভিনব, অনন্য পন্থায়। দেওয়ালপঞ্জিতে ধরে রাখা হল তাদের কীর্তি-কাহিনি। শুভ উদ্যোগ সংস্কার ভারতীর।

এক দেওয়ালে ৪৩ জন মহিয়সী। চার দেওয়ালের গণ্ডি টপকে তাঁরা যে জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাঁদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তা মনে করিয়ে দিল সংস্কার ভারতী, পশ্চিমবঙ্গ (দক্ষিণবঙ্গ)। ভগিনী নিবেদিতা চাইতেন ভারতবর্ষের নারীর মহিমাময় রূপ বিকশিত হোক, উদ্ভাসিত হোক। আত্মত্যাগী ও সেবাব্রতী লোকমাতাকে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার জন্য ভারতবর্ষের নানা প্রান্তের ফুল দিয়ে মালা গাঁথা হল। এ ভাবেই নিবেদিতাকে শ্রদ্ধা জানাল সংস্কার ভারতী।

কারা রয়েছেন দেওয়ালপঞ্জিতে? আমরা পেলাম রানি ফুলেশ্বরীকে (১৭১৪-১৭৪৪), যিনি শকুন্তলা কাব্য অসমিয়ায় অনুবাদ করেছিলেন ও সংস্কৃত চর্চার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। পাতা সরে গিয়েছে মহাকাব্যে। সময়ের হাত ধরে এসেছেন সীতা-দময়ন্তী-সাবিত্রীরা। আছেন দানশীল বিদুষী রানি রাসমণি, রানি ভবানী ও অহল্যাবাঈ হোলকর। বারোমাসের পাতাগুলি সেজে উঠেছে সেই সব বীরাঙ্গনাকে নিয়ে — কল্পনা দত্ত, কনকলতা বড়ুয়া (অসম), প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, রানি পদ্মিনী (চিতোর), রানি দুর্গাবতী (মধ্যপ্রদেশ), ঝলকারীবাঈ (ঝাঁসি), ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, আজাদ হিন্দ বাহিনী খ্যাত লক্ষ্মী সেহগল, মাতঙ্গিনী হাজরা, পার্বতী গিরি (ওড়িশা), বীণা দাস, কিট্টুর রানি চেনাম্মা (কর্নাটক), রানিভেলু নাচিয়ের, রানি গাইদেনল্যু (মণিপুর) — পাতা আলোকিত হয়েছে তাঁদের কৃতকর্মে। মহাকাব্য, আধ্যাত্মিকতা, জাতীয়তা, আত্মত্যাগ, শিক্ষা, মাতৃশক্তি, পবিত্রতীর্থ, ভারতবাণী, মনুষ্যত্ব, মহাপুরুষ এবং ভারত ও তার জনগণ এই দ্বাদশ পর্বে সমৃদ্ধ হয়েছে রূপরেখা। যে সব বিদুষীর কর্মতপস্যা প্রকাশিত হয়েছে তাঁরা যেমন সমাজের আদর্শ পাশাপাশি যাঁরা আড়ালে থেকে গেলেন তাঁরাও নমস্য, এক পাতায় ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ সমস্যা।

রয়েছে রানি কর্ণাবতীর কথা, যিনি অন্য ধর্মভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়েছিলেন, আছেন কোটারানি, যিনি ঝিলম নদী থেকে খাল কেটে শ্রীনগর শহরকে বন্যামুক্ত করেছিলেন। আছেন মহারাষ্ট্রের আনন্দবাঈ জোশি, চিকিৎসার অভাবে নিজের শিশুপুত্রের মৃত্যু হওয়ায় যিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে উত্তীর্ণ হয়ে চিকিৎসক হন। মঞ্চের নটী বিনোদিনী তো সর্বজনপরিচিত, যাঁর ‘চৈতন্যলীলা’ দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস মাথা ছুঁয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। আছেন পণ্ডিত রমাবাঈ, যাঁকে কলকাতার তৎকালীন পণ্ডিতসমাজ ‘পণ্ডিতা’ ও ‘সরস্বতী’ উপাধিতে ভূষিত করে। চন্দ্রমুখী বসু, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়কে তো আমরা ভালোই চিনি। আছেন প্রথম আত্মকথন লেখিকা রাসসুন্দরী দেবী। আছেন ঠাকুরবাড়ির স্বর্ণকুমারী দেবী, বিদ্যাচর্চা ও সংস্কৃতিচর্চায় যিনি সেই সময়ের নারীসমাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে স্মরণ করা হয়েছে মীরাবাঈ এবং এমএস শুভলক্ষ্মীকে। এই দেওয়ালপঞ্জিতে রয়েছেন শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, লেখিকা বেগম রোকেয়া, বাংলায় মহিলাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে যাঁর অবদান কখনও ভোলার নয়।

ভগিনী নিবেদিতা রয়েছেন, আর ‘খুকি’র মা থাকবেন না, তা কি হয়? তাই আছেন মানবমনের জাদুকরি মা সারদা। পাশাপাশি আছেন সারদেশ্বরী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম অধ্যক্ষা গৌরীমা। সংগ্রহে রাখার মতো এই দেওয়ালপঞ্জিটির পরিকল্পনা ও রূপায়ণে ভারতীয় সংস্কৃতি ন্যাস। বাংলার নতুন বছরের আগের দিন অ্যাকাডেমি অফ ফাইনআর্টসে প্রকাশিত হয় ১৪২৪-এর এই দেওয়ালপঞ্জি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন সুনন্দা মুখোপাধ্যায় সহ বিশিষ্ঠজনেরা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here