bjp-jhargram
mrinal mahat
মৃণাল মাহাত

সদ্য সমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপি অভূতপূর্ব ফল করেছে জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে। আর এতেই আশঙ্কার মেঘ দেখছেন প্রান্তিক আদিবাসী জনজাতি সমাজের নেতারা। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে আদিবাসী সংস্কৃতি ও ধর্ম বিপন্ন হতে পারে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর, তিনি যে যে যায়গাগুলিতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, জঙ্গলমহলের সেই এলাকাগুলিতেই বেশি করে ধাক্কা পেয়েছে তৃণমূল। কিন্তু কেন? জঙ্গলমহলে এত উন্নয়ন স্বত্ত্বেও কেন এই ফল হল? রাজনৈতিক বিশেষঞ্জদের মতে, প্রথম কারণ, তৃণমূলের নীচুস্তরের নেতাদের সীমাহীন দুর্নীতি আর ঔদ্ধত্য। দ্বিতীয় কারণ, আরএসএস কর্মীদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকা। আর এই দ্বিতীয় কারণটিকে কেন্দ্র করেই আশঙ্কার মেঘ জমা হচ্ছে। আদিবাসী বুদ্ধিজীবীদের ধারণা যে ভাবে প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামগুলিতে সঙ্ঘ প্রভাব বিস্তার করছে, এবং গো-বলয়ের সংস্কৃতি আমদানি করছে, তাতে আদিবাসী সারনা ধর্মের মধ্যে প্রভাব পড়তে বাধ্য।

পেশায় সাংবাদিক, বিশিষ্ট আদিবাসী কুড়মী সমাজকর্মী প্রদীপ মাহাত বলেন, আদিবাসীরা নিজেদের অজান্তেই একটি ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন। তাঁরা বুঝতেই পারছেন না সঙ্ঘ পরিবার তাঁদের মধ্যে হিন্দু সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দিচ্ছে। যা খুবই ভয়ঙ্কর। এর ফলে আগামী দিনে আদিবাসী সংস্কৃতি বিপন্ন হতে পারে। কারণ আদিবাসী সংস্কৃতিতে মুর্তিপুজো, ব্রাহ্মণের ব্যবহার নেই। আদিবাসীরা এই ভুল বুঝতে না পারলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে।

সংঘ পরিবার আদিবাসীদের কাছে পৌঁছতে টাকা ঢালছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আদিবাসী নেতারা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট গবেষক সুশীল মান্ডি মনে করেন, সঙ্ঘ জঙ্গল মহলের আদিবাসীদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে। তিনি বলেন, “আমরা জানি ধর্ম একটা স্বতন্ত্র ব্যাপার, এর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কিছু থাকা উচিত নয়। কিন্তু, ভারতবর্ষে এরাই একমাত্র সংগঠন যারা ধর্মকে সরাসরি ভোটব্যাঙ্কের কাজে ব্যবহার করে”।

গরিব আদিবাসীদের অর্থের টোপ দেখিয়ে সংগঠন বিস্তারের কাজে ব্যবহার করতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা। কারণ, বেশিরভাগ মানুষই এদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে জানেন না। তাই সহজেই আদিবাসী যুবদের বিপথগামী করছে সঙ্ঘ পরিবার। জঙ্গলমহলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির একটা চক্রান্ত চলছে বলে তিনি মনে করেন।

একই মত পোষণ করেন আদিবাসী কুড়মি সমাজের রাজ্যকমিটির সদস্য প্রাণবল্লভ মাহাত। তিনি বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে যে ভাবে বজরংবলির পুজো হচ্ছে, সেই গ্ল্যামার দেখনদারির কাছে আদিবাসী সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। অল্পবয়সি আদিবাসী যুবকরা স্বাভাবিক ভাবেই বাহা, বাঁদনা ভুলে হিন্দুসংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। গো-বলয়ের সংস্কৃতি যে ভাবে আমদানি করা হচ্ছে, তাতে আদিবাসী সংস্কৃতি ধ্বংস হতে বাধ্য।

যদিও এখনও ভাবতে রাজি নন সাঁওতাল সমাজের দিশম মাঝি নিত্যানন্দ হেম্ব্রম। তিনি বলেন, জঙ্গলমহলের আদিবাসী সমাজের মধ্যে আরএসএস কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছে ঠিকই, কিন্তু ততটা খারাপ পরিস্থিতির দিকে যায়নি। সাঁওতাল সমাজও এই আগ্রাসন রুখতে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে তিনি জানান। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদিবাসী সমাজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন যায়গায় যে প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল তা শুধুমাত্র রাজ্য সরকারের বিরোধিতা বা অনুন্নয়নের জন্য নয়, একটা যোগ্য বিরোধীর ভূমিকা পালন করতে। কারণ, আদিবাসী সমাজ এগিয়ে না এলে ওই ভূমিকা নেবে বিজেপি বা আরএসএস। আর এই দলের গঠনতন্ত্র বা আদর্শ কোনো ভাবেই আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না। তাই আদিবাসী সমাজ প্রার্থী দিয়েছে। যে সমস্ত যুবরা সঙ্ঘের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, তারা আবার আদিবাসী সংস্কৃতিতে আবার ফিরে আসবেন বলে আশা ব্যাক্ত করেন নিত্যানন্দবাবু।

স্থানীয় একটি পত্রিকার সম্পাদক ও বিশিষ্ট আদিবাসী নেতা কৃষ্ণকান্ত মাহাত বলেন, জঙ্গলমহলে মূলত সারি ও সারনা ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। হিন্দুত্ববাদকে তিনি পাইথনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ধীরে ধীরে আদিবাসী সংস্কৃতিকে গিলে নিচ্ছে এরা।এবং এই কাজ যারা করছে তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে আছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ। একের পর এক জাহের থান, গরাম থান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে হনুমান মন্দির। এর জন্য তিনি আদিবাসী সমাজের উদাসীনতাকেই দায়ী করেন। খুব কম পরিমাণে হলেও আদিবাসী সমাজের কিছু বিদ্বজ্জন এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে সচেষ্ট আছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে বিজেপির ক্ষমতা বৃদ্ধিতে জঙ্গলমহলের আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন আদিবাসী বিদ্বজ্জনেরা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here