সবং: প্রত্যাশামতোই সবং বিধানসভা উপনির্বাচনে জয়ী হল তৃণমূল কংগ্রেস। জয়ী হলেন সবং-এর প্রাক্তন কংগ্রেস বিধায়কের স্ত্রী গীতা ভুঁইয়া। তাও সেটা বিপুল ব্যবধানে। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে তাঁর স্বামী মানস ভুঁইয়া নিকটতম তৃণমূল প্রার্থীকে হারিয়েছিলেন ৪৯, ১৬৭ ভোটে। সেখানে এবার তৃণমূল প্রার্থী গীতা নিকটতম সিপিএম প্রার্থীকে হারিয়েছেন ৬৪,১৯২ ভোটে। অর্থাৎ ব্যবধান বেড়েছে অনেকটাই। তারওপর গীতাদেবী ভোট পেয়েছেন ১,০৬,১৭৯। অর্থাৎ মোট ভোটের পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি ভোট এসেছে তৃণমূলের ঘরে। এক কথায় সবং বিধানসভা উপনির্বাচনে মানস ভুঁইয়াকেও হারিয়ে দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী।

সাধারণ ভাবে, খুব কিছু ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বা রাজনৈতিক অবস্থায় চমকপ্রদ কোনো পরিবর্তন না ঘটলে উপনির্বাচনে জেতে রাজ্যের শাসক দলই। বঙ্গ রাজনীতি বা ভারতের রাজনীতির এটাই দস্তুর। কিন্তু তা সত্ত্বেও সবং বিধানসভার উপনির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে উঠে আসবে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য।

আরও পড়ুন: তামিলনাডুতে নয়া ইতিহাস, জয়ললিতার মৃত্যুতে খালি হওয়া আসনে হারল তাঁর দল, জিতল না বিরোধী ডিএমকে-ও

সবং বিধানসভাটি বরাবরই বাম ও কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি। এখানে কখনও জিতেছে বামেরা, কখনও জিতেছে কংগ্রেস। লড়াই হয়েছে জোরদার। তবে ২০০১ সাল থেকে জিতে আসছিল কংগ্রেসই। বা বলা যায় জিতছিলেন মানসবাবু। ২০১১ সালে পরিস্থিতি বদলায়, রাজ্য রাজনীতির ক্ষমতা পরিবর্তনের সেই বছরে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে তৃণমূল। সেই জোট পায় ৯৮ হাজার ভোট। বামেরা পায় ৮৫ হাজার ভোট। সেই থেকে রাজ্যে ভাঙন শুরু হয় বামেদের ভোটে। অন্যদিকে বিরোধীর ফাঁকা জায়গাটা দখল করতে শুরু করে বিজেপি। রাজ্যের বহু উপনির্বাচনে মোদী হাওয়ায় ভর করে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসতে থাকে বিজেপি। এর মধ্যেই ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে বাম-কংগ্রেস জোট হয়। সেই জোটের প্রার্থী হিসেবে মানসবাবু প্রায় ১ লক্ষ ২৮ হাজার ভোট পান(সেই তুলনায় এবারের জয়ী প্রার্থী ২০ হাজারেরও কম ভোট পেয়েছে)। দ্বিতীয় স্থানে থাকা তৃণমূল পায় ৭৭ হাজারেরও বেশি ভোট। বিজেপি পায় ৫,৬১০ টি ভোট। আড়াই শতাংশের মতো।

অর্থাৎ সবং বিধানসভার ভোটের ফল বিশ্লেষণ জটিল। গত বারের বিধানসভার নিরিখে দেখলে এবার তৃণমূল তাঁদের ভোট বাড়িয়েছে হাজার তিরিশেক। অর্থাৎ মানসবাবুকে নিজের দলে টেনে ওটাই হয়েছে তাদের লাভ। কংগ্রেস চতুর্থ স্থানে রয়েছে ১৮ হাজার ভোট ধরে রেখে(সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে তাঁদেরই)। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, বাকি ৭৫ থেকে ৮০ হাজার ভোট ভাগ হয়েছে(এবার গত বিধানসভার তুলনায় হাজার পাঁচেক ভোট কম পড়েছিল) সিপিএম এবং বিজেপির মধ্যে। বিজেপি তৃতীয় স্থানে থাকলেও তাঁদের ভোট চমকপ্রদ ভাবে বেড়ে হয়েছে ৩৭, ৪৭৬। অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ৩২ হাজার। অন্যদিকে বারবার বিভিন্ন ভোটে বিজেপির পেছনে পড়ে যাওয়ার পর প্রায় ৪২ হাজার ভোট ধরে রেখে, দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে সিপিএম।

সব মিলিয়ে ভোটের হিসেবে বিজেপির অগ্রগতি দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। কিন্তু গত বিধানসভায় বাম-কংগ্রেস জোট থাকায় পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না এবার বামেদের ভোটে ক্ষয় অব্যাহত থাকল কি না। বরং বলা চলে, তৃণমূলের এই ভরা বাজার এবং বিজেপির উত্থানের সময়ে ৪২ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করে সিপিএম খুশি হতেই পারে।

এবার তৃণমূল। মানসবাবুকে দলে টেনে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের সিকিভাগও নিজেদের ভোটে যোগ করতে পারেনি শাসক দল। তা ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছে তিন বিরোধী দলের মধ্যে। চতুর্মুখী লড়াইয়ে এই কেন্দ্রটি নিশ্চিতভাবেই তৃণমূলের দখলেই থাকত। সেক্ষেত্রে হয়তো তৃণমূল-বিরোধী কংগ্রেসি ভোটারদের একটা বড়ো অংশ এবার এভাবে বিজেপির দিকে ঢলে পড়তেন না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, যে কোনো দলের চেয়ে  লাভ বেশি হল ভুঁইয়া পরিবারেরই। কর্তা রাজ্যসভায়, গিন্নি বিধানসভায়। বারো ভুঁইয়ার বংশধররা যদি এটুকু ক্ষমতা না উপভোগ করতে পারেন, তাহলে আর গণতন্ত্রের মানে কি!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here