payel samanta
পায়েল সামন্ত

ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ে মেতে উঠেছে সাবেক ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর। ১৯৯৮ সালে জিদানদের জয়ে যে উচ্ছ্বাস দে্খা যায়নি, গ্রিজম্যানদের এ বারের জয়ে চন্দননাগরিকদের উচ্ছ্বলতা একটু বেশিই। এই উৎসব নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক।

এক দলের বক্তব্য যারা আমাদের প্রভু ছিল, তাদের জয়ে আমরা কেন উল্লাস করব?এই মতের বিরোধীদের বক্তব্য, খেলার মাঠে অতীতের বৈরিতা ধরে রাখা ঠিক নয়। তাই ফ্রান্সকে সমর্থনে অন্যায়ের কিছু নেই।

হুগলি নদীর তীরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বণিকরা তাদের ভাগ্য অন্বেষণে এসেছিল। এক এক শহরে, এক একটি দেশের জাহাজ নোঙর ফেলেছিল। ১৬৭৩ সালে ফরাসিরা চন্দননগরে ঘাঁটি গাড়ে। তার পর ১৯৫১ সালে চন্দননগর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত শহরের ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে বারবার। কখনও ইংরেজ বা কখনও ফরাসিদের অধীনে থেকেছে চন্দননগর।

france chandannaagar

ফ্রান্স বিশ্বকাপ জেতার পর রবিবার রাতে উল্লাসে ফেটে পড়েছে এই শহর। বেশোহাটা থেকে উর্দিবাজার, ডুপ্লেক্স পট্টি থেকে নাড়ুয়া বিভিন্ন জায়গায় ফ্রান্সের পতাকা ঝুলতে দেখা গিয়েছে গত এক মাস। প্রশ্ন উঠছে, ইংল্যান্ড জয় পেলে কি বাংলার মানুষ উল্লাস করত, তা হলে ফরাসিদের জয়ে চন্দননগর উৎসব করবে কেন? গবেষক দেবাশিস মুখোপাধ্যায় বলেন, “আসলে অনেকেই নিজের শহরের ইতিহাসটা জানেন না। ইতিহাস জানলে কেউ উল্লাস করতে পারে না। এটা একেবারেই কাঙ্খিত নয়।”

কেন এ কথা বলছেন তিনি? গবেষকের মতে, ফরাসিরা চন্দনগরকে লুঠ করেছে। এই শহর থেকেই তারা ক্রীতদাস চালান করেছে। এক সময় বাংলার শস্যাগার ছিল চন্দননগর। বিখ্যাত ছিল বস্ত্রশিল্প। এ সব শেষ করে ওরা নীলচাষ করেছে।

ইতিহাসের এই তথ্য নিয়ে ভাবিত নয় মূলত নতুন প্রজন্ম। খলিসানির বসুবাড়ির সদস্য সৌরভ বসু এখনও সেই শত্রুতা বয়ে নিয়ে যেতে রাজি নয়। তিনি বলেন, “ইংরেজরা যেমন ভারতকে লুঠ করেছে, তেমনি ফরাসিরা চন্দননগরকে অনেক কিছু দিয়েছে। সে কারণেই আজও আমাদের স্কুলে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে ফরাসি পড়ানো হয়। তা হলে তো সেগুলোও বন্ধ হওয়া উচিত।”

চন্দননগরের বিশিষ্ট সংস্কৃতি কর্মী অজিত মুখোপাধ্যায় থেকে প্রবীণ নাট্যকর্মী সৌম্যদেব বসু- এঁদের পাল্টা যুক্তি, “ব্রিটিশদের পাতা রেল লাইনে সফর করি বলে কি ইংরেজরা জিতলে লাফাতে হবে? ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলে আমরা ওদের পতাকা নিয়ে রাস্তায় নামতাম? যদি সেটা শোভন না হত, তা বলে ফ্রান্স নিয়ে উদ্বাহু হব কেন?’’

france chandannagar

এই সব প্রখর যুক্তির জবাব না দিয়ে অনেকে শুধু আবেগে ভেসে যেতে চান। উত্তর চন্দননগরের বাসিন্দা সমীরণ রায় যেমন বললেন, “খেলার মাঠের সঙ্গে রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক না। কই, আর্জেন্তিনা ও ব্রাজিলের পতাকা ঝোলালে আপত্তি করেন না তো? মুঘলরা কবে এ দেশে সম্পদ হরণ করেছিল, সে জন্য এখন আমরা কি তাদের বংশধরদের খুঁজে বের করে শূলে চড়াব? করিনা কাপুরের ছেলের নাম তৈমুর যদি হতে পারে, তা হলে ফরাসি পতাকা ওড়ানোয় আপত্তি কোথায়?”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here