ঝাড়গ্রামে কুড়মী ভোট দূরে ঠেলে আসন হারানোর পথে গেল না তো তৃণমূল?

0
mamata bandyopadhyay
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি সৌজন্যে দ্য প্রিন্ট।

mrinal mahatআসন্ন লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীতালিকা ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছেন জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা। জঙ্গলমহলের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ জাতি, সাঁওতাল ও কুড়মী সমাজের নেটিজেনরা ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন তৃণমূলের ঘোষিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ বার ঝাড়গ্রাম কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে রোহিনী গার্লস হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বীরবাহা সোরেন টুডুকে, যিনি জামবনী ব্লকের মেয়ে হলেও কর্মসূত্রে সাঁকরাইলের রোহিনীতে থাকেন। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে এ যাবৎ কোনো সম্পর্ক না থাকলেও কেন বীরবাহাকে টিকিট দেওয়া হল? এই প্রশ্নেই বিতর্ক দানা বেঁধেছে সারা জঙ্গলমহল জুড়ে। প্রার্থী ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বীরবাহা সোরেন টুডু, তাঁর স্বামী রবীন টুডু ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন আদিবাসী সমাজের একাংশ। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে একের পর এক পোস্ট আছড়ে পড়ছে তাদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু কেন এই ক্ষোভ? আর কীসের অঙ্কেই বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন একজনকে প্রার্থী করলেন?

জানা গেছে, বীরবাহা সোরেন টুডুর স্বামী রবীন টডু হলেন সাঁওতালদের অন্যতম বড় সংগঠন ভারত জাকাত মাঝি পারগাণা মহলের (বিজেএমপিএম) অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার জেলা পারগাণা। সমস্ত সাঁওতাল ভোট পকেটস্থ করতেই সাঁওতাল সমাজের এই শীর্ষ নেতার স্ত্রীকে প্রার্থী করা হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। কিন্তু প্রার্থী ঘোষণা হওয়ার পর পরই ক্ষোভের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভারত জাকাত মাঝি পারগাণা মহলের কর্মী-সমর্থকদের কাছ থেকেই। সাঁওতাল যুবকর্মীদের বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে রবীনবাবুকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, রবীনবাবু ও তাঁর স্ত্রী সমাজের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। সমাজের ব্যানারে এত আন্দোলন আসলে টিকিট পাওয়ারই কৌশল ছিল বলে পোস্টগুলিতে মন্তব্য করা হয়েছে।

তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রার্থীপদ ঘোষণা হওয়ার পর পরই প্রথম ক্ষোভ প্রকাশ করেন সারিকাথা নামে একটি ফেসবুক পেজ। সেখানে বলা হয়, নিজের সহধর্মিনীকে প্রার্থী করে আদিবাসীদের আন্দোলন দমিয়ে দেওয়ার চক্রান্তে শামিল রবীন টুডু। আপামর সাঁওতাল সমাজের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন যাদবপুরে মিমি চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে সেলেব প্রার্থী দিচ্ছে বিজেপি!

জুলু ইপিল হাঁসদা নামে এক ব্যাক্তি তাঁর পোস্টে লেখেন, যে রবীন টুডু সাঁওতাল সমাজের সঙ্গে প্রতারণা করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়, তার স্ত্রীকে একটিও ভোট নয়। সাঁওতালি সিনেমার বিশিষ্ট অভিনেত্রী বীরবাহা হাঁসদা বলেন, সাংসদ হোয়ার লোভে সাঁওতালি সমাজের কিছু নেতানেত্রী রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন। ক’ দিন ধরেই রবীনবাবুর বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে আসছেন সাঁওতাল সমাজের ছাত্র-যুবরা। একটা সম্পূর্ণ ভাবে অরাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষপদে থেকে, রাজনীতি থেকে দূরে থাকার গল্প শুনিয়ে, সাধারণ সাঁওতাল সমাজকে একজোট করে কী ভাবে তিনি ব্যক্তিস্বার্থে নিজের স্ত্রীকে প্রার্থী করলেন, এই ইস্যুতেই এখন সরগরম জঙ্গলমহল।

রবীনবাবু শুক্রবার এক প্রেস বিবৃতিতে দাবি করেন, সমাজের স্বার্থেই, সমাজের কথা বলতেই বীরবাহা প্রার্থী হয়েছেন। এই প্রার্থিপদে তাঁর কোনো হাত নেই বলে জানিয়েছেন রবীনবাবু। যদিও রবীনবাবুর এই পোস্টে সাঁওতাল যুবরা আক্রমণ অব্যাহত রাখেন। তাঁকে ‘মিথ্যাবাদী’, সুবিধাবাদী’ বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

অন্য দিকে কুড়মী সমাজেরও রোষের মুখে পড়েছেন সাংসদ প্রার্থী বীরবাহা সোরেন ও তাঁর স্বামী রবীন টুডু। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রের একক ভাবে সব চেয়ে বেশি ভোট রয়েছে এই কুড়মী সম্প্রদায়ের। আগে আদিবাসী তালিকায় থাকলেও, স্বাধীনতার পর এদের বাদ দেওয়া হয় তালিকা থেকে। তাই আদিবাসী তালিকায় তাদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে সাম্প্রতিক কালে জোরালো আন্দোলন করছে আদিবাসী কুড়মী সমাজ।

আর এখানেই ভুল করে ফেলেছেন রবীন টুডু। সাঁওতাল সমাজের জেলা পারগাণা হিসাবে গত ক’ বছর কুড়মী সমাজকে  আদিবাসী তালিকায় ফিরিয়ে আনার বিরোধিতা করে বিভিন্ন সভা, অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বক্তৃতা করেছেন। তিনি বলেছেন, কুড়মী সমাজকে কোনো মতেই আদিবাসী তালিকায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। রবীনবাবুর এক সময়ের এই সব বক্তৃতার ফুটেজ ঘুরে বেড়াচ্ছে কুড়মী সমাজের বিভিন্ন গ্রুপে। আদিবাসী কুড়মী একতা মঞ্চ নামে এক সংগঠন থেকে চরম কুড়মী-বিরোধী এক নেতার স্ত্রীকে ভোট না দেওয়ার আবেদন করা হয়ে হয়েছে। তাদের পোস্টে বলা হয়েছে, কুড়মী সমাজের পক্ষে রবীনবাবুর মতো একজন সাম্প্রদায়িক, সঙ্কীর্ণ মানসিকতার মানুষকে কখনোই ভোট দেওয়া সম্ভব নয়।

ক্ষুব্ধ কুড়মী সেনার সদস্যরাও। তাদের বক্তব্য, সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ভাবে গড়ে ওড়া কুড়মী আন্দোলনকে অপমান করেছেন রবীনবাবু। কুড়মীরা যাতে সুযোগ সুবিধা না পায় তার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন রবীন টুডু-সহ ভারত জাকাতের নেতৃবৃন্দরা। রবীনবাবুর এই আচরণকে একদমই ভালো ভাবে নিচ্ছেন না কুড়মী সংগঠনগুলির নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, রবীনবাবু সাধারণ সাঁওতাল সমাজকে ভুল বুঝিয়ে কুড়মীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন। একটা দাঙ্গার পরিস্থিতির  সৃষ্টি করেছিলেন এঁরা। সাংসদ উমা সোরেন কুড়মীদের ব্যাপারে জেনিভা সম্মেলনে বক্তৃতা করায় তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করেছিলেন রবীনবাবুরা। এই অপমান কোনো মতেই মানতে পারছেন না কুড়মীরা। ইতিমধ্যেই বীরবাহা সোরেনকে যাতে ভোট না দেওয়া হয় তার জন্য ফেসবুকে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন কুড়মী সংগঠনগুলি।

পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে কুড়মী সমাজ থেকে তৃণমূলের ভোট পাওয়ার সম্ভাবণা ক্ষীণ। অন্য দিকে সাঁওতাল সমাজেরও একটা অংশের ভোট তৃণমূল পাবে না বলে  রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মত। এ ক্ষেত্রে ঝাড়গ্রাম আসনে প্রার্থী চয়নের ক্ষেত্রে একটা মারাত্মক ভুল করে ফেললেন মুখ্যমন্ত্রী, মনে করছেন রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা। এমতাবস্থায় বিজেপি, সিপিএমের সুযোগ নেওয়া অবশ্যম্ভাবী। ঝাড়গ্রাম আসন হারানোরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে। সাঁওতাল ভোট পকেটে পুরতে গিয়ে কুড়মী ভোট হারানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে জঙ্গলমহলে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here