trinamul in jalpaiguri

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: মনোনয়নপত্র জমা শেষ। স্ক্রুটিনিও শেষ। নির্বাচন ঘোষণার আগে থেকেই ত্রিস্তর নির্বাচনকে বিরোধীশুন্য করার ডাক দিয়েছিল শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। মনোনয়নপত্র জমা শেষের পর দেখা গেল সেই দিকে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে তৃণমূল। নির্বাচনের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে নিয়েছে জলপাইগুড়ি জেলার প্রায় ৬% গ্রাম পঞ্চায়েত আসন।

প্রশাসনিক হিসেব অনুযায়ী জলপাইগুড়ি জেলায় গ্রাম পঞ্চায়েতের ৭৫টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছে শাসকদল তৃণমূল। যদিও জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য অন্তত ১৫০টি আসন তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাচ্ছে। যার প্রেক্ষিতে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, শুধুমাত্র সন্ত্রাস করে মনোনয়নপত্র পেশ না করতে দেওয়ার জন্যই এই আসন দখল করতে পেরেছে তৃণমূল।

জলপাইগুড়ি জেলায় ৮০টা গ্রাম পঞ্চায়েতে ১৩৪৭টি আসন রয়েছে। পঞ্চায়েত সমিতিতে ২৩৪টি আসন। জেলা পরিষদে আসন সংখ্যা ১৯টি। মনোনয়নপত্র পেশের প্রথম দিন থেকেই বিরোধী শিবির, বিশেষ করে বিজেপি এবং সিপিএম শাসকদলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলতে শুরু করে। ভয় দেখানো, মারধর করে মননোয়ন তুলতে না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে মালবাজারে সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠে সব চেয়ে বেশি। বিজেপির পার্টি অফিস পোড়ানো, সিপিএম পার্টি অফিসে হামলা, বিডিও অফিসে বিরোধীদের মনোনয়নপত্র পেশের জন্য ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

মনোনয়নপত্র জমার দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর দেখা যায় মালবাজারেই সব চেয়ে বেশি আসন দখল করেছে তৃণমূল। মালবাজার ব্লকের গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির ১৯৮টি আসনের মধ্যে ৫৮টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেয়েছে শাসকদল। এ ছাড়াও রাজগঞ্জ ব্লকে ৯টা, মেটেলি ব্লকে ৪টে, ধুপগুড়ি ব্লকে ২টো, ময়নাগুড়ি ব্লকে ১টা, নাগরাকাটা ব্লকে ১টা আসন বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নিয়েছে তৃণমূল। মালবাজার পঞ্চায়েত সমিতিতেও ৭টি আসন দখল করেছে তৃণমূল। এটা প্রশাসনিক হিসেব।

তৃণমূল জেলা নেতৃত্ব কিন্তু আরও বেশি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার দাবি জানিয়েছে। জলপাইগুড়ির তৃণমূল জেলা সভাপতি সৌরভ চক্রবর্তীর দাবি, অন্তত ১৫০টি আসন তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতছেন গ্রাম পঞ্চায়েতে। পঞ্চায়েত সমিতিতেও অন্তত ১২টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেতে চলেছেন।

এই দাবির স্বপক্ষে যুক্তি কী?

উত্তর দিয়েছে বিরোধী শিবির। বিজেপির জলপাইগুড়ি জেলা সভাপতি দেবাশিস চক্রবর্তীর দাবি, প্রথমে ভয় দেখিয়ে মনোনয়নপত্র পেশ করতে দেয়নি তৃণমূল। তার মধ্যেও বেশ কিছু জায়গায় সন্ত্রাসকে উপেক্ষা করে মনোনয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। এখন সেই সব জায়গায় ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস চালিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এই ভাবেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসন দখল করতে চায় তৃণমূল, অভিযোগ বিরোধী শিবিরের। একই সুরে অভিযোগ জানিয়েছে জেলা সিপিএম নেতৃত্ব। সিপিএমের জেলা সম্পাদক সলিল আচার্য জানিয়েছেন, মালবাজার, রাজগঞ্জ, ময়নাগুড়িতে তাঁদের প্রাথীর্দের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় দেখাচ্ছে তৃণমূল কর্মীরা। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলে বাড়ি জ্বালিয়ে, এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই ভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পঞ্চায়েত দখলের ছক কষেছে শাসকদল, অভিযোগ সিপিএম নেতৃত্বের।

যদিও সন্ত্রাসের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। বরং তারা অন্য অঙ্ক পেশ করছে। তৃণমূল নেতৃত্ব জানিয়েছে, অনেক জায়গাতেই একটি আসনের জন্য একাধিক মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে দলের মধ্য থেকেই। সেই সব আসন থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার হয়ে গেলেই তাদের জেতা আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। জলপাইগুড়ির তৃণমূল জেলা সভাপতির মন্তব্য, বিরোধীরা প্রার্থী জোগাড় করতে না পেরে মান বাঁচাতে সন্ত্রাসের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে।

যদিও সন্ত্রাসের অভিযোগ থেকে নড়ছে না বিরোধী শিবির। সন্ত্রাস করে, ভয় দেখিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের যে কৌশলে আসন দখল নেওয়ার  অভিযোগ উঠছে শাসকদলের বিরুদ্ধে, তা রুখতে ইতিমধ্যেই বিজেপি এবং বামফ্রণ্ট জলপাইগুড়ি পুলিশ সুপারকে স্মারকলিপি দিয়েছে। পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি জানিয়েছেন, শান্তি বজায় রাখতে তাঁরা পদক্ষেপও নিচ্ছেন।

কিন্তু তাতেও উৎকন্ঠা যাচ্ছে না বিরোধী শিবিরে। তাই শাসকদলকে রুখতে কোনো কোনো এলাকায় একজোট হচ্ছে বিরোধীরা। উঁচু তলার নেতৃত্ব তা জানলেও পরিস্থিতি দেখে নিচু তলার এই এক জোটকে পরোক্ষে সমর্থনই জানাচ্ছেন তাঁরা। তবে এই ভাবে শাসকের আগ্রাসন রোখা কতটা সম্ভব তা নিয়ে সন্দিহান রাজনৈতিক মহল।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here