search operation in lorry

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : দেশের সুরক্ষার ভার যাদের হাতে, তারাই কাঠ পাচারে অভিযুক্ত। বন দফতরের হাতে দুই সেনা জওয়ানের গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় এখন প্রশ্ন এই কাঠমাফিয়াদের শেকড় আরও কত গভীরে?

পাহাড়ে অশান্তি চলছে, প্রশাসন তা সামলাতেই ব্যস্ত। সেই অরাজকতার সুযোগ নিয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে অবাধে চলছে জঙ্গল ধ্বংস। সেই বহুমূল্য কাঠ পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এই পাচার রুখতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে বন দফতর, যার দায়িত্বে রয়েছেন বৈকুন্ঠপুর বন বিভাগের বেলাকোবার রেঞ্জ অফিসার সঞ্জয় দত্ত। গত ৩০ আগস্ট এই টাস্কফোর্স ডুয়ার্সের একটি বৌদ্ধগুম্ফা এবং একটি কাঠগুদামে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করেছিল পাঁচ লক্ষ  টাকার চোরাই কাঠ।

two arrested army jawans
ধৃত দুই সেনা জওয়ান।

এ বারও সূত্র মারফত টাস্কফোর্সের প্রধান সঞ্জয় দত্তের কাছে খবর আসে, কয়েক লক্ষ টাকার কাঠ কলকাতায় পাচার হবে। খবর পেয়েই বাহিনী নিয়ে অভিযানে নামেন সঞ্জয় দত্ত। শনিবার বিকেল থেকে জলপাইগুড়ির বাগরাকোট এলাকায় ওঁত পেতে ছিলেন তাঁরা। কলকাতার নম্বরপ্লেট লাগানো একটি লরি আসতে দেখে সন্দেহ হয় তাঁদের। থামানোর চেষ্টা করলেও সেই লরিটি দ্রুত বেরিয়ে যায়। প্রায় ফিল্মি কায়দায় গাড়ি নিয়ে তাড়া করে মংপং চেকপোস্টের কাছে গাড়িটিকে ধরে ফেলেন বনকর্মীরা। লরিটিতে ‘অন আর্মি ডিউটি’ লেখা ছিল।

কিন্তু তল্লাশি শুরু করতেই তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ। ট্রাক থেকে নেমে আসেন উর্দি পরা দুই সেনা জওয়ান। প্রথমে একটু ধন্দে পড়ে যান বনকর্মীরা। কারণ কাঠপাচারের খবর থাকলেও, তাতে সেনা জওয়ানরা জড়িত এমন খবর টাস্কফোর্সের কাছে ছিল না। শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। প্রথমে সেনাকর্মী হিসেবে নিজেদের প্রভাব খাটানোর জন্য হম্বিতম্বি শুরু করেন ওই দু’জন। কিন্তু এত বহুমূল্য কাঠ এবং আসবাবপত্রের নথি দেখতে চাওয়ার পর তাঁরা চুপসে যান। এর পর ওই দুই সেনা জওয়ান, গাড়ির চালক এবং কাঠভর্তি লড়িটিকে বেলাকোবা রেঞ্জ অফিসে নিয়ে আসা হয়। লরি থেকে উদ্ধার হয় তিনটি পালংক, একটি সোফাসেট, এবং প্রচুর কাঠের লগ। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকার কাঠ উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছেন বৈকুন্ঠপুর বন বিভাগের বনাধিকারিক এন উমারানি।

এ দিকে রাতভর ওই দুই সেনা জওয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন বনাধিকারিকরা। ধৃতদের মধ্যে প্রসেনজিৎ খাড়ার বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুর আর পিন্টু প্রতিহার বাঁকুড়া জেলার বাসিন্দা। তাঁরা দু’জনেই বাগরাকোট সেনাছাউনির ৬২৯ কম্যাণ্ডে কনস্টেবল পদে কর্মরত। ধৃতরা জেরায় জানিয়েছেন, কালিম্পং জেলার সাওগাও-এর বনাঞ্চল থেকে ওই গাছগুলি কেটে নিয়ে এসে আসবাব বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ধৃত লরিচালক স্বরাজ সিং জানিয়েছেন, সাড়ে নয় হাজার টাকায় লরিটি ভাড়া করে কাঠগুলি কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

the lorry with 'on army duty' board
‘অন আর্মি ডিউটি’ লেখা সেই লরি।

কিন্তু ধৃত দুই জওয়ানের কথায় অসংগতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বনাধিকারিকরা। তাঁরা নিজেদের জন্য আসবাবগুলি নিয়ে যাচ্ছিলেন দাবি করলেও, বনাধিকারিকদের সন্দেহ এই দু’জন বাহকমাত্র। সেনাবাহিনীর কোনো উচ্চপদস্থ আধিকারিকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই সেগুলি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে তাঁদের ধারণা। কারণ সেনার দুই কনস্টেবলের পক্ষে এত বহুমূল্য আসবাবপত্র কেনা  সম্ভব নয়। যে হেতু বিষয়টি সেনাবাহিনীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, তাই সেনার শীর্ষকর্তাদের চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত মুখ্য বনপাল (উত্তরবঙ্গ) এম আর বালুচ।

দীর্ঘ জেরার পর গ্রেফতার করা হয় ওই দুই সেনাকর্মী ও লরিচালককে।

রবিবার ধৃত দুই সেনা জওয়ান ও গাড়ির চালককে জলপাইগুড়ি বিশেষ আদালতে পেশ করা হয়। অভিযুক্তদের আইনজীবী স্বরূপ মণ্ডল জানিয়েছেন, তাঁদের জামিনের আবেদন খারিজ করে এক দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। সোমবার ফের তাঁদের মুখ্য বিচারবিভাগীয় বিচারকের কাছে পেশ করা হবে।

এ দিকে কাঠপাচারের মতো বিষয়ের সঙ্গে সেনাবাহিনীর নাম জড়িয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন বন বিভাগ।এ র আগেও রেলকর্মী, স্কুলশিক্ষক-সহ একাধিক সরকারি কর্মী কাঠপাচার বা বন্যপ্রাণীর দেহাংশ পাচারের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন। আজকের ঘটনায় প্রমাণ হল এর শেকড় অনেক গভীরে লুকিয়ে রয়েছে। উত্তরবঙ্গের অতিরিক্ত মুখ্য বনপাল এম আর বালুচ জানিয়েছেন, লাগাতার অভিযান চালিয়ে তাঁরা সেই শেকড় সমূলে বিনষ্ট করবেন। এই ঘটনায় টাস্কফোর্সের প্রশংসা করে রাজ্যের বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মণ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ঘটনায় যাঁরাই জড়িত থাকুন না কেন, আইন আইনের পথে চলবে। সবুজ-প্রাণ বাঁচানোই প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য, জানিয়েছেন বনমন্ত্রী।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন