korok home jalpaiguri

নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি: এক মাস  না কাটতেই ফের কাঠগড়ায় জলপাইগুড়ির কোরক হোম। বাথরুমের দেওয়াল ভেঙে পালিয়ে গেল দুই নাবালক আবাসিক।একজন উদ্ধার হলেও অন্যজন এখনো নিখোঁজ। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। তার থেকে বড় প্রশ্ন, কেন বারবার আবাসিক পালানোর ঘটনা ঘটছে? গলদ কোথায়?

শনিবার রাত একটা নাগাদ দোতালার বাথরুমের দেওয়াল ভেঙে, জলের পাম্পের ঘরে উঠে প্রাচীর টপকে পালায় বছর তেরোর ওই দুই নাবালক। হোমের সিসিটিভিতে সেই ঘটনা ধরাও পড়েছে। একজনের বাড়ি ডুয়ার্সের কালচিনি, অপরজনের বাড়ি মাদারিহাটে। বেশ কিছুক্ষণ পর ঘটনার টের পেয়ে কোতোয়ালি থানায় খবর দেন হোম কর্তৃপক্ষ। হোমের কর্মীরাও খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিছুটা দূরে কালচিনির বাসিন্দা ওই কিশোরকে উদ্ধার করে পুলিশ। অন্যজনকে রবিবার পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। উদ্ধার হওয়া কিশোরকে আপাতত পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। জেলা শিশু সুরক্ষা সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।

জলপাইগুড়ির এই সরকারি হোমটি থেকে আবাসিক পালানোর ঘটনা নতুন নয়। গত বছর মে মাসে ঘরের দেওয়াল ভেঙে ২১ ফুট উচু প্রাচীর টপকে পালিয়েছিল আটজন। ছয়জন উদ্ধার হলেও দু’জনকে এখনো পাওয়া যায়নি। তার আগেও একাধিকবার আবাসিক পালানোর ঘটনা ঘটেছে।

গতকাল রাতে পালানো যে কিশোর উদ্ধার হয়েছে, সে গত ২৭ ডিসেম্বরও হোম থেকে পালিয়েছিল। চারদিন পর তাকে উদ্ধার করে ফের হোমে ফেরত পাঠানো হয়। গতকাল রাতে আরেক কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে বাথরুমের দেওয়াল দু’জায়গা দিয়ে ভেঙে ফের পালায় সে। উদ্ধার হওয়ার পর সে স্পষ্ট জানিয়েছে, এই হোমে সে থাকতে চায় না। তার অভিযোগ, মারধর তো চলেই, সাথে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও দেওয়া হয় না। এর আগেরবার পালানোর খেসারত হিসেবে ফেরত আসার পর তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল, কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছে পিতৃ-মাতৃহীন কিশোরটি।

মারধরের অভিযোগ আগেও উঠেছিল। গত ডিসেম্বর মাসে পালানোর জন্য সাহায্য করার অভিযোগে হোমের তিন কিশোরকে মারধর করেছিলেন বর্তমান হোম সুপার দেবব্রত দেবনাথ সহ হোমের তিন আধিকারিক, অভিযোগ জানিয়েছিল নির্যাতিত কিশোররা এবং হোমের বেশ কয়েকজন কর্মীও। সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খোলার “অপরাধে” হোমের পাঁচ কর্মীকে কাজ থেকে সাময়িকভাবে সরিয়েও দেওয়া হয়েছে। এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারাও জানিয়েছেন, হোমে শিশুদের মারধর করা হয়।হোমের পাশেই বাড়ি ক্ষিরোধ চৌধুরীর। তিনি আজ জানিয়েছেন, তাঁরা প্রায়দিনই বাইরে থেকে মারধর, শিশুদের কান্নার আওয়াজ পান।

সরকারি এই হোমটিতে মুলত দরিদ্র, পরিবারহীন, উদ্ধার হওয়া এবং কিশোর অপরাধে জড়িয়ে যাওয়া নাবালকদের রাখা হয়। প্রশ্ন,মাথার ওপর নিশ্চিত ছাদ, থাকা, খাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার শিশুরা পালিয়ে যায়। কীসের অভাব তাদের?

jalpaiguri
পুলিশ হেফজতে উদ্ধার হওয়া নাবালক

মনোবিদরা জানাচ্ছেন, এই শিশুরা বাড়িতে বাবা-মার আদরে বেড়ে ওঠা আর পাঁচটা শিশুর থেকে আলাদা। বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে এসে এদের হোমে ঠাই হয়। খাওয়া বা মাথার ওপর ছাদ পেলেও এদের অস্থির মানসিকতা বারবার হোম থেকে পালিয়ে যেতে উদ্ধুদ্ধ করে। একমাত্র উপযুক্ত কাউন্সেলিং এবং বাড়ির মতো পরিবেশ দিতে পারলে তবেই এই প্রবণতা কমবে বলে মত মনোবিদদের। হোমের আধিকারিক-কর্মীদেরও এঁদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে, বলছেন তাঁরা।

এই মুহূর্তে হোমের তিনজন নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষী রয়েছেন। এ ছাড়াও দু’জন পুলিশকর্মী এবং চারজন সিভিক  ভলান্টিয়ার দিনরাত পাহারায় থাকেন। রয়েছে সিসিটিভিও। এত নজরদাড়ি সত্ত্বেও কীভাবে বারবার আবাসিক পালাচ্ছে উঠছে সেই প্রশ্নও।

এত অভিযোগ, এত প্রশ্ন থাকলেও তার কোন সদুত্তর অবশ্য পাওয়া যায়নি হোমের তরফে। সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথাই বলতে চাননি হোম সুপার দেবব্রত দেবনাথ।

 

jalpaiguri
এই জায়গা ভেঙেই পালিয়েছিল দুই আবাসিক

তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন জেলাশাসক রচনা ভগত। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য জেলার সমাজ কল্যাণ আধিকারিককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাসও দিয়েছেন।

যদিও এলাকার মানুষ মনে করেন, আবাসাকি পালানো এবং তারপর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দুটোই পুরোনো ব্যাপার। এর সমাধান আদৌ কোন পথে, এবার বোধহয় সেটা ভাবার সময় এসেছে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন