উল্টোরথে বাঁকুড়া পরিক্রমা
indrani sen
ইন্দ্রাণী সেন

বাঁকুড়া: সকাল থেকে ঝড়বৃষ্টিকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উল্টোরথে মাতল জেলাবাসী। বাঁকুড়া থেকে বড়জোড়া আবার বিষ্ণুপুর থেকে সোনামুখী হয়ে ইন্দাসে রথের দড়িতে টান দিতে ভিড় ভক্তদের। স্থানীয় মন্দির সূত্রের খবর অনুযায়ী, রথের দিন মন্দিরের বিগ্রহ রথে করে ঘোরানো হয়। আবার বড়জোড়ার হাটআশুড়িয়ায় ইস্কন-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রভুপাদের নির্দেশ অনুযায়ী গ্রামবাসীদের প্রসাদ বিতরণ করার নিয়ম। আবার খোদ বিষ্ণুপুরে উল্টোরথেই মেতে থাকেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেল, এ দিন বিষ্ণুপুর শহরে আগত অতিথিদের সুধা আর মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়, তার পর জল।

বিষ্ণুপুরের মাধবগঞ্জের রথ

এ বার আসি বিষ্ণুপুরের উল্টোরথ যাত্রা প্রসঙ্গে, বিষ্ণুপুরে উল্টোরথের প্রস্তুতি চলে সারা বছর ধরে। শনিবার বকুলকুঞ্জে সমস্ত দেবতার পুজো দিয়েই বিষ্ণুপুরে শুরু হয়েছে উল্টোরথের । রবিবার শহরের কৃষ্ণগঞ্জ ও মাধবগঞ্জের মাঠে ভক্তদের সমাগম শুরু হয়। উল্টোরথের শোভাযাত্রা দেখতে ভক্তদের ঢল নামে। কৃষ্ণগঞ্জের আটপাড়ার আরাধ্য দেবতা শ্রী শ্রী রাধালালজিউ আর তাঁর প্রতীক গড়ুর আর মাধবগঞ্জের এগাড়োপারার আরাধ্য দেবতা শ্রী শ্রী মদনগোপালজিউ-র প্রতীক এঁড়ে গোরু। এই দুই বিগ্রহকে সামনে রেখে সারারাত ধরে চলে পুজোপাঠ আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বিষ্ণুপুরের মাধবগঞ্জের মদনগোপালজিউ

এই দুই পুজো কমিটির উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষ্ণগঞ্জ ও মাধবগঞ্জে দুই এলাকায় দু’টি পৃথক মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে অনান্য বছরের মতো। এই বছরও জন প্লাবনে প্লাবিত হবে বিষ্ণুপুর বলেই আশা করছেন উদ্যোক্তারা। বিষ্ণুপুরের মহকুমাশাসক মানস মণ্ডল বলেন, “এ বার প্রথম ট্যাবলো নিয়ে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে, একই সাথে বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যবাহী লন্ঠন, দশাবতার তাস-সহ বিষ্ণুপুরের সংস্কৃতি শোভাযাত্রার ট্যাবলোগুলোর মধ্যে দিয়ে তুলে ধরা হয়। সমস্ত রকম অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা প্রস্তুত। সুষ্ঠ ভাবে যাতে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় সেদিকেও নজর রেখেছি”।

বিষ্ণুপুরের কৃষ্ণগঞ্জের রথ

অন্যদিকে বাঁকুড়ার বড়জোড়া ব্লকের হাটআশুড়িয়া গ্রামের মানুষ ইস্কন-মায়াপুর অনুমোদিত এই গ্রামের শ্রীশ্রী হরেকৃষ্ণ নামহট্ট সংঘের উদ্যোগে সোজারথ থেকে উল্টোরথ উৎসবে মেতে থাকেন।

বাঁকুড়ার বড়জোড়া ব্লকের হাটআশুড়িয়া গ্রামের জগন্নাথ সুভদ্রা ও বলরামের বিগ্রহ

এখানে এই সাতদিন প্রথা মেনে মন্দিরে জগন্নাথ ,সুভদ্রা ও বলরামের ছাপ্পান্ন ভোগের আয়োজন করা হয়। ভগবানকে পোলাও, বিভিন্ন পিঠে ,পায়েস, মিষ্টি, সাদা ভাত, ছানার পায়েস, রসমালাই, মালপোয়া ও হরেক রকম খাবার অর্পণ করা হয়।

শোভাযাত্রার মাধ্যমে বিগ্রহ মন্দির থেকে রথের নিয়ে আসা হচ্ছে।

হাটআশুড়িয়া শ্রীশ্রী হরেকৃষ্ণ নামহট্ট সংঘের জয়বিজয় দাস বলেন, এলাকার মানুষের সহযোগিতায় উল্টো রথের দিন প্রভূপাদ-এর নির্দেশে এলাকার প্রতিটি পরিবারকে জগন্নাথদেবের প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

হাটআশুরিয়া গ্রামে জগন্নাথের ছাপান্ন ভোগ

অন্যদিকে সোনামুখীর বাঁকুড়ার সোনামুখীতে মহাধুমধামে উল্টোরথ যাত্রা পালিত হয়। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন শ্যামসুন্দর জিউর রথযাত্রা। প্রচলিত কথা অনুযায়ী সোনামুখীর বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের জনৈক প্রয়াত মহেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের কূল দেবতা শ্যামসুন্দর জীউ ও রাধারানির রথযাত্রার সূচনা করে কাঠের সুদৃশ্য দশ চুড়া রথও তৈরি করান। প্রচলিত এই রথই হল সোনামুখীর প্রথম রথ।

সোনামুখীর রথ

অন্যদিকে বাঁকুড়ার ইন্দাসের আকুই এর গবপুর গ্রামের ব্যতিক্রমী রথ হলো স্বরুপনারায়ণের রথ। আমরা সাধারণ ভাবে রথযাত্রায় রাধাকৃষ্ণ বা জগন্নাথ সুভদ্রা ও বলরামের রথ দেখতে অভ্যস্ত। কিন্ত এই রথ বাঁকুড়ার লৌকিক দেবতা ধর্মঠাকুরের বা ধর্মরাজের।

ইন্দাস এর আকুই এর গবপুর এ স্বরূপনারায়ণের রথ

কূর্ম-রূপী স্বরূপনারায়ণের মূর্তি সঙ্গে কামিখ্যে ও ধামাস কন্যার বিগ্রহকে মন্দিরে বিশেষ পূজার্চনার পর শোভাযাত্রা সহকারে রথে নিয়ে আসা হয়। পুজোর পর রথের দঁড়িতে টান দিতে অগণিত ভক্ত সমাগম ঘটে। যাওয়া-আসা নিয়ে মোট ছয়বার রথ টানার রীতি।

স্বরূপনারায়ণ ক্যামিখ্যে ও ধামাস কন্যার বিগ্রহ

রথ শেষে আবার স্বরুপনারায়ণ,কামিখ্যে ও ধামাস কন্যাকে বিশেষ পুজোর পর মন্দিরে রেখে আসা হয়। স্বরুপনারায়ণ যে বর্তমান মন্দির রয়েছেন, সেই মন্দির নির্মাণ করে দেন বর্ধমানের মহারাজ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here