assembly of storks

নিজস্ব প্রতিনিধি, বীরভূম: এরা গ্রামের অতিথি, এরা গ্রামের লক্ষ্মী। এরা এলে সকলের মন খুশিতে ভরে যায়, এরা চলে গেলে সবাই বিমর্ষ হয়ে যায়। এদের ফের আসার আশায় বেঁচে থাকে ইসলামপুর। এরা অন্য কেউ না, এক দল পরিযায়ী পাখি,  শামুকখোল। এক ধরনের সারস এরা। তবে এরা শীতে আসে না, আসে বর্ষায়। এ বারেও তার অন্যথা হয়নি। কলকাকলিতে মাতিয়ে রেখেছে সারা গ্রাম। আর তাদের রক্ষার জন্য দল তৈরি করে নজরদারি চালাচ্ছে ইসলামপুরের গ্রামবাসীরা।

গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কোপাই নদী। দু’ ধারে ধানখেত। বর্ষা শুরু হতেই হাজার হাজার শামুকখোল যথারীতি চলে এসেছে বীরভুমের ইসলামপুর গ্রামে। এরা দল বেঁধে আসে। পক্ষী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজননের জন্য এরা নিরিবিলি শান্তিপ্রিয় গ্রাম বেছে নেয়। সেখানে বাসা বাঁধে।

এমনই এক নিরিবিলি গ্রাম ইসলামপুর। গ্রামের যে সব গাছের ডাল শক্ত যেমন তেঁতুল, বট, পাকুড় ইত্যাদি, সেই সব গাছে বাসা বাঁধে তারা। জীবনধারণের জন্য এই গ্রামে গ্রামের খাবারের অভাব হয় না। কারণ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছ নদী ও রয়েছে দিগন্তবিস্তৃত ধানখেত। নদী আর ধানখেত থেকে খাবার জোগাড় করে নিয়ে আসে ওরা, নিজেরা খায়, বাচ্চাদের খাওয়ায়। এরা মূলত শামুক খায়, তাই নাম শামুকখোল।

চোরাশিকারিদের নজর এই শামুকখোলের ওপর। তাই তাদের হাত থেকে গ্রামের ‘লক্ষ্মীদের’ রক্ষা করার জন্য নজরদারি টিম গড়েছেন গ্রামবাসীরা। রীতিমতো পাহারার ব্যবস্থা হয়েছে। নজর রাখা হচ্ছে হাজার হাজার শামুকখোলের ওপর। গ্রামবাসীদের এই তৎপরতা চোরাশিকারিদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। শুধু নজরদারি নয়, আরও বেশি করে শামুকখোল যাতে এই গ্রামে আসে, এখানে এসে বংশবিস্তারের সুযোগ পায়, তার জন্য নতুন নতুন গাছ রোপণও করছেন গ্রামবাসীরা।

storks in islampur
ইসলামপুর গ্রামে বাসা বেঁধেছে শামুকখোল।

কিন্তু এ বার একটু একটু করে মন খারাপ হতে শুরু করেছে গ্রামবাসীদের। গ্রামের লক্ষ্মীদের যে ফিরে যাওয়ার সময় এল। দুর্গাপুজো শেষ হতেই ওদের যাওয়ার বেলা চলে আসবে। নবজাতক-নবজাতিকাদের নিয়ে উড়ে যাবে নিজেদের গন্তব্যে। এত কলরব আবার নিস্তব্ধ হয়ে যাবে। পরের বর্ষা আসা পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর গুণবেন গ্রামবাসীরা।

ইসলামপুরের মানুষজন কি কোকরেবেল্লুর গ্রামের নাম শুনেছেন? না শোনারই কথা। অথচ দু’টি গ্রামের মধ্যে মিল অনেক। এক সময়ের এক অখ্যাত গ্রাম এখন শিরোনামে। বেঙ্গালুরু আর মায়সুরুর (মহীশুর) মাঝে মাদ্দুরের কাছে এই গ্রাম এখন সারস পাখির অভয়ারণ্য। এর শুরুটাও কিন্তু ইসলামপুরের মতো। ইসলামপুরের মতো এই গ্রামেও শক্তপোক্ত উঁচু উঁচু গাছ আছে, বিশেষ করে তেঁতুল গাছ। এক ধরনের সারস বিশেষ করে পেন্টেড স্টর্ক এখানে আসতে শুরু করে প্রজননের জন্য। প্রজননের উপযোগী নিরাপদ, নিরিবিলি গ্রামটি পেয়ে তাদের আসা বাড়তে থাকে। গ্রামবাসীরাও দেখেন তাদের ত্যাগ করা বিষ্ঠায় দুর্গন্ধ থাকলেও তা থেকে তৈরি হচ্ছে ভালো সার। গ্রামবাসীরাও এগিয়ে আসেন এদের রক্ষা করতে। মজার কথা হল, ইসলামপুরের মতো কোকরেবেল্লুরের মানুষজনও মনে করেন, এই সারস তাদের লক্ষ্মী। তাদের সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আসে এই সারসদল।

কিন্তু শুধু গ্রামবাসীদের উদ্যোগে কতটা এগোনো যায়? তাঁদের এই উদ্যোগ দেখে এগিয়ে আসেন সংরক্ষণবিদরা, এগিয়ে আসে প্রশাসন। আজ ‘কোকরেবেল্লুর’ একটা আন্তর্জাতিক নাম, পর্যটকদের কাছেও রীতিমতো পরিচিত সে।

ইসলামপুরের পাশে এগিয়ে আসুন না সংরক্ষণবিদরা, এগিয়ে আসুক প্রশাসন। সে-ও একদিন দ্বিতীয় ‘কোকরেবেল্লুর’ হয়ে উঠবে।

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন