suicide

ওয়েবডেস্ক: এই রাজ্য কন্যাসন্তানের উন্নতিকল্পে শুরু করেছে কন্যাশ্রী প্রকল্প। দেশও অন্য দিকে জোর দিয়ে যাচ্ছে কন্যাদের শ্রীবৃদ্ধির উপর। চলছে জোর প্রচার- মেয়েকে বাঁচাও, মেয়েকে পড়াও! কার্যত কিন্তু কন্যা সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখলেও সে-ই যখন আরেক কন্যার জন্ম দিচ্ছে, তখন নীতি হয়ে যাচ্ছে তাকে পোড়াও!

শুনতে অতিরঞ্জিত লাগলেও এই দেশ, এই রাজ্যের মেয়েদের কাছে নির্যাতন হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অত্যাচারের লক্ষ্য বিশেষ করে গৃহবধূরা। এখনও যে আমাদের দেশের অনেক গৃহবধূই উপার্জনের দিক থেকে স্বাবলম্বী নন। ফলে, তাঁদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে অত্যাচারের মাত্রা বাড়ছে। যার চরম পরিণতি মৃত্যু। হয় অত্যাচারিত হতে হতে মেয়েরা নিজেই বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ, অথবা তাঁদের হত্যা করে সেই ঘটনা আত্মহত্যা বলে প্রচার করার উদাহরণ প্রায় রোজই চোখের সামনে আসছে।

উদাহরণের জন্য সদ্য অতীত শুক্রবারেও ফিরে তাকানোর প্রয়োজন নেই। চোখ রাখা যাক শনিবারেই। ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে রাজারহাটের এক গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনা। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফতেমা বিবির অগ্নিদগ্ধ দেহ আবিষ্কার করেন প্রতিবেশীরা। স্বামী-সহ শ্বশুরবাড়ির ৮ সদস্য তাঁকে খুন করে রেখে ফেরার। ঘটনায় পুলিশ তার কর্তব্য যথাবিধি পালন করেছে। অর্থাৎ, দেহ নিয়ে গিয়েছে ময়নাতদন্তের জন্য। এবং, স্বামী-সহ ওই ফেরার ৮ জনের বিরুদ্ধে ভারতীয় সংবিধানের দণ্ডবিধির ৩০২ নম্বর ধারায় খুনের মামলা রুজু করেছে। অভিযোগ, পর পর চারটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়াতেই পুড়ে মরতে হল তাঁকে।

এবার চোখ রাখা যেতে পারে মহেশতলায়। সেখানেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গৃহবধূ হত্যার ঘটনায়। সুমনা পোদ্দার নামের ওই গৃহবধূকেও পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে। যা আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টায় ছিল শ্বশুরবাড়ির লোকজন। কাজটি সেরে তারাও ফেরার হয়েছে। রাজারহাট আর মহেশতলা- দুই অঞ্চলের গৃহবধূর মৃত্যুর নেপথ্যেই আরও এক ঘটনা রয়ে গিয়েছে সাধারণ সূত্র হিসাবে। সেটা হল পণের দাবি। রাজারহাটের ফতেমা বিবির বাপের বাড়ির লোকজন জানিয়েছেন, গত ১৭ বছর ধরে ক্রমাগত বাপের বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসার জন্য ফতেমাকে চাপ দিত শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। সুমনার বাপের বাড়ি থেকে বিয়ের সময়ে মোটা টাকা পণ দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু তাতেও শ্বশুরবাড়ির লালসা মেটেনি- রোজই টাকা নিয়ে আসার দাবিতে অত্যাচার চলতে থাকে তাঁর উপরে।

২০১৫ সালে ১৪,৬০২ জন মহিলার মৃত্যুর ঘটনা জানা যাচ্ছে। হয় তা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা অথবা সরাসরি হত্যা! এর মধ্যে কলকাতার মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩৯!

এই রাজ্য শনিবার আরও এক গৃহবধূর পুড়ে মরার ঘটনার সাক্ষী থেকেছে। এই ঘটনাটি মালদহের। শুক্লা বিশ্বাস তাঁর স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে বচসার পর গায়ে আগুন দিয়েছেন- এমনটাই অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, এখানেও পণের জন্য অত্যাচার ছিল সাধারণ সূত্র। এ ছাড়া ছিল স্বামীকর্তৃক অবহেলার প্রসঙ্গটিও। শুক্লার স্বামী কর্মসূত্রে অন্য রাজ্যে থাকতেন। ইদানিং তিনি আর স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাইতেন- তেমনটাই দাবি করা হয়েছে।

গৃহবধূদের মৃত্যুর হার যে ক্রমাগতই বাড়ছে এই রাজ্যে, ইতিমধ্যেই তা স্বীকার করেছে সরকারি সমীক্ষাও। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর ২০১৫ সালের সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রতি দুজন মহিলার মৃত্যুর মধ্যে একটি হয় আত্মহত্যা, নয় তো হত্যা। কারণ হিসাবে দর্শানো হচ্ছে শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার। এই অত্যাচারও ঘুরে-ফিরে দুই কারণে- পণের দাবি বা কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়া। হিসাব আরও বলছে, এ ভাবে ২০১৫ সালে ১৪,৬০২ জন মহিলার মৃত্যুর ঘটনা জানা যাচ্ছে। হয় তা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা অথবা সরাসরি হত্যা! এর মধ্যে কলকাতার মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩৯! ২০১৪ সালে রাজ্যে এই সংখ্যাটা ছিল ১৪,৩১০। অর্থাৎ, বছরে সংখ্যাটা ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বলতে অসুবিধা নেই, এ ভাবে প্রতি বছরেই ধাপে ধাপে তা বেড়ে চলেছে।

মহিলাদের উপর অত্যাচার এবং পরিণামে তাঁদের হত্যা বা আত্মহত্যার ঘটনা যে বাড়ছে, তার সঙ্গে সহমত রাজ্য মহিলা কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন সুনন্দা মুখোপাধ্যায়ও। সমাজ যে অবক্ষয়ের মধ্যেই আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে আছে, তা স্বীকার করতে দ্বিধা করছেন না তিনি। তাঁর দাবি, পুরুষরা নারীদের মানুষ হিসাবে গণ্য করে না বলেই এমন ঘটনা বেড়ে চলেছে। এ ব্যাপারে সমাজ ক্রমশই ডুবে যাচ্ছে লিঙ্গবিদ্বেষের অন্ধকারে। অন্য দিকে মনোবিদদের দাবি, সমাজ এখনও নারীদের বোঝা হিসাবেই দেখে। সেই জন্যেই মেয়েদের বিয়ে দিতে হলে টাকা খরচ হবে, পরেও তার জের চলবে- এই সব আতঙ্ক থেকেই বাড়ছে কন্যাসন্তান হত্যার ঘটনা। পরিণামে যিনি কন্যাসন্তানের জন্ম দিচ্ছেন, তাঁর উপরেও নেমে আসছে অত্যাচারের কোপ।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন