শৈবাল বিশ্বাস

কলেজের মতো এবারে রাজ্য‌ের গ্রন্থাগারগুলিতেও নির্বাচন বন্ধ করে দিতে চলেছে রাজ্য‌ সরকার। মুখ্য‌মন্ত্রী মমতা ব্য‌ানার্জি কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেমন দলহীন কমিটি গড়ার পক্ষে গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রেও তাই। তবে ফারাকটা হল কলেজের ক্ষেত্রে ছাত্ররাই সংসদে মনোনীত হবেন, কিন্তু গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে তার কোনও ব্যাপার নেই। একজন গ্রন্থাগারের সদস্য‌ ছাড়া বাকি পদগুলিতে সরকার বা গ্রন্থাগার দফতর যাকে মনে করবে তাঁকেই বসিয়ে দিতে পারে। গত ৩মে এই মর্মে সরকার একটি বিঞ্জপ্তি জারি করে বলেছে (বিজ্ঞপ্তি নং-৩৫৭/এমইই/সেক্ট,তারিখ-৩/৫/২০১৭) ওয়েস্টবেঙ্গল পাবলিক লাইব্রেরি অ্য‌াক্ট ১৯৭৯-এর ২৩ ধারার ১ নম্বর উপধারা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জেলা গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে জেলা গ্রন্থাগার আধিকারিক হবেন সভাপতি, গ্রন্থাগারিক হবেন সম্পাদক। কমিটিতে থাকবেন জনশিক্ষা প্রসার দপ্তরের এক্সটেনশন অফিসার,জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত কর্মাধ্য‌ক্ষ, পঞ্চায়েত সমিতি বা পুরসভার মনোনীত কোনও ব্য‌ক্তি, এলএলএ বা স্থানীয় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ মনোনীত দু’জন ব্য‌ক্তি যাঁদের লেখাপড়ার ব্য‌াপারে উৎসাহ রয়েছে। এ ছাড়া থাকবেন জেলা গ্রন্থাগারের একজন প্রবীণ আজীবন সদস্য‌, একাধিক আজীবন সদস্য‌ থাকলে ঘুরেফিরে একজন কমিটিতে থাকবেন। সংস্থাগত সদস্য‌পদ রয়েছে এমন সংস্থা থেকে এলএলএ মনোনীত একজন,গ্রন্থাগারের কর্মীদের মধ্য‌ে থেকে একজন এবং ছ’জন সদস্য‌ যাঁদের সভাপতি ও গ্রন্থাগারিক মিলে বেছে নেবেন।

টাউন বা সাব ডিভিশনাল লাইব্রেরির ক্ষেত্রে এলএলএ সভাপতি মনোনীত করবে। গ্রন্থাগারিক হবেন সম্পাদক। এলএলএ লেখাপড়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একজনকে যুগ্ম সম্পাদক মনোনীত করবেন। কমিটিতে থাকবেন, বিডিও বা এসডিও মনোনীত একজন, পঞ্চায়েত সমিতি বা গ্রাম পঞ্চায়েতের একজন, একজন আজীবন সদস্য‌(ঘুরিয়ে ফিরিয়ে), এ ছাড়া গ্রন্থাগারিক ও সভাপতি মিলে চারজন সদস্য‌কে বেছে নেবেন।

বিজ্ঞপ্তি থেকে স্পষ্ট কোথাও নির্বাচনের মাধ্য‌মে কোনও কমিটি তৈরিতে সরকারের আগ্রহ নেই। সরকার চাইছে একেবারে নিচুস্তর থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমস্ত কমিটি মেম্বারকে তারাই মনোনীত করবে। কিন্তু আগে এই নিয়ম ছিল না। টাউন বা সাব ডিভিশনাল লাইব্রেরির ক্ষেত্রে সরকার শুধুমাত্র একজন প্রতিনিধি পাঠিয়েই সন্তুষ্ট থাকত।

গ্রামীণ গ্রন্থাগার বা প্রাইমারি ইউনিট লাইব্রেরির ক্ষেত্রে লোকাল লাইব্রেরি অথরিটি বা এলএলএ সভাপতি মনোনীত করবেন। সম্পাদকও হবেন এলএলএ কর্তৃক্ত মনোনীত, গ্রন্থাগারিক হবেন যুগ্ম সম্পাদক। কমিটিতে থাকবেন বিডিও বা পুরসভার চেয়ারম্য‌ান মনোনীত একজন, পঞ্চায়েত সমিতি বা গ্রাম পঞ্চায়েতের একজন, একজন আজীবন সদস্য‌, সভাপতি এবং গ্রন্থাগারিক কর্তৃক্ত মনোনীত তিনজন সদস্য‌।

এই বিজ্ঞপ্তি থেকে স্পষ্ট কোথাও নির্বাচনের মাধ্য‌মে কোনও কমিটি তৈরিতে সরকারের আগ্রহ নেই। সরকার চাইছে একেবারে নিচুস্তর থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমস্ত কমিটি মেম্বারকে তারাই মনোনীত করবে। কিন্তু আগে এই নিয়ম ছিল না। টাউন বা সাব ডিভিশনাল লাইব্রেরির ক্ষেত্রে সরকার শুধুমাত্র একজন প্রতিনিধি পাঠিয়েই সন্তুষ্ট থাকত। পুরসভা বা পঞ্চায়েত সমিতি একজনকে মনোনয়ন দিত। বাকিরা সদস্য‌ সংখ্য‌ার অনুপাতে সদস্য‌দের মধ্য‌ে থেকে নির্বাচিত হতেন। নির্বাচিত কমিটি মেম্বাররা আবার নিজেদের মধ্য‌ে থেকে সম্পাদক,সভাপতি বেছে নিতেন। এবার গোটা প্রক্রিয়ায় সদস্য‌দের কার্যত কোনও ভূমিকাই রইল না।

এক সুপ্রাচীন গ্রন্থাগারের কর্মকর্তা জানালেন,‘স্থানীয় মানুষের আবেগকে বুড়ো আঙুল দেখালে সরকারেরই মুখ পুড়বে।আমরা কিছুতেই সরকারকে বাড়ির দখল নিয়ে শপিং মল করতে দেব না।’

রাজ্য‌ে গ্রন্থাগার আছে তিন ধরনের। একটি হল সরকারি গ্রন্থাগার-বেশ কয়েকটি জেলা গ্রন্থাগার পুরোপুরি সরকারি গ্রন্থাগারের পর্যায়ে পড়ে অর্থাৎ এই গ্রন্থাগারগুলির ভবন,কর্মী সবই সরকারি। দ্বিতীয় ধরনের গ্রন্থাগার হল সরকার পোষিত বা স্পন্সর্ড। বহু মহকুমা গ্রন্থাগার বা টাউন লাইব্রেরি এই শ্রেণিতে পড়ে। কলকাতার সুপ্রাচীন বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরি,আজাদ হিন্দ লাইব্রেরি এই পর্যায়ে পড়ে। এই গ্রন্থাগারগুলির কিছু কর্মী সরকারি, সরকার এদের বুক গ্রান্ট এবং কন্টিজেন্সির টাকা দেয়। কিন্তু ম্য‌ানেজিং কমিটি তৈরি হয় সদস্য‌দের ভিতর থেকে। তৃতীয় ধরনের গ্রন্থাগার হল এইডেড লাইব্রেরি বা সাহায্য‌প্রাপ্ত গ্রন্থাগার। এরা পুরোপুরি স্থানীয় ব্য‌ক্তিদের দ্বারা পরিচালিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্কহীন গ্রন্থাগার। যাদের অল্প কিছু টাকা বুক গ্রান্ট সরকার দেয়, বাকি সব কিছুই নিজেদের জোগাড় করতে হয়। বঙ্গীয় সাহিত্য‌ পরিষদ এই ধরনের সাহায্য‌প্রাপ্ত গ্রন্থাগারের পর্যায়ে পড়ে। সরকার পোষিত গ্রন্থাগারের সবকিছু কিন্তু মোটেই সরকারি নয়। যেমন বহু গ্রন্থাগারের নিজেদের বাড়ি আছে। সেই বাড়ি নিজস্ব তহবিলের পয়সায় কেনা। প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কোন আইনে বেসরকারি সংস্থার মালিকানাধীন এইসব সম্পত্তির দখল নেবে? গ্রন্থাগার আইনে তো সম্পত্তির দখলদারি নিয়ে কিছু বলা নেই। বহু সম্পত্তি ট্রাস্টের হাতে রয়েছে আবার কিছু সম্পত্তি দলিল রেজিস্ট্রি করার সময় স্পষ্টতই বলা হয়েছে,নির্বাচিত কমিটি সম্পত্তি দেখভালের জন্য‌ দায়বদ্ধ থাকবে। এক সুপ্রাচীন গ্রন্থাগারের কর্মকর্তা জানালেন,‘স্থানীয় মানুষের আবেগকে বুড়ো আঙুল দেখালে সরকারেরই মুখ পুড়বে।আমরা কিছুতেই সরকারকে বাড়ির দখল নিয়ে শপিং মল করতে দেব না।’

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here