নেপাল থেকে এসে শিলিগুড়ির হাসপাতালে মারা গেলেন কেএলও জঙ্গি ভারতী, স্বামী জীবন সিংহ কোথায়, ধন্দে পুলিশ

0
2337

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : রবিবার রাতে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগের সামনে এসে দাঁড়ায় নেপালের নম্বরপ্লেট লাগানো একটি অ্যাম্বুলেন্স। এক অসুস্থ মহিলাকে নামিয়ে আনা হয়। সঙ্গে দুই নাবালিকা। ব্রততী দাস নাম দিয়ে তাঁকে ভর্তি করানো হয় এখানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় তাঁর। ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য তাঁর দুই নাবালিকার কাছে মৃত মহিলার পরিচয়পত্র চাইতেই শুরু হয় সমস্যা। তাদের কথায় অসংগতি মেলায় খবর যায় মাটিগাড়া থানায়। পুলিশ এসে ওই দুই নাবালিকাকে কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করতেই বেরিয়ে আসে চমকে ওঠা সত্য।

মৃত মহিলা ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ ভারতী দাস। কেএলও-র সুপ্রিমো জীবন সিংহের স্ত্রী। ওই দুই নাবালিকা জীবন সিংহ-ভারতী দাসের মেয়ে তিথি ও প্রীতি।

এই খবর পৌঁছোতেই শোরগোল পড়ে যায় পুলিশমহলে। ছুটে আসেন শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের কর্তারা। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশের খাতায় পলাতক মোস্ট ওয়ান্টেড হিসেবে নাম রয়েছে জীবন সিংহ-ভারতী দাস, এই দুই জঙ্গি দম্পতির।

১৯৯৩ সালে কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (কেএলও) জন্ম। তার পর থেকেই এর সভাপতি ছিলেন জীবন সিংহ। অসমের ১১টি জেলা এবং উত্তরবঙ্গকে নিয়ে আলাদা কামতাপুর রাজ্যের দাবিতে সশস্ত্র জঙ্গি আন্দোলন শুরু করে কেএলও। প্রচুর মানুষ খুন হন তাঁদের হাতে। এর পর ২০০৩ সালে ভুটানের সাহায্য নিয়ে এঁদের দমন করতে যৌথ অভিযান চালায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পুলিশ। ভুটানের জঙ্গলে চলে  অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট। সেই সময় ৪৫ জন কেএলও জঙ্গি ধরা পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন চিফ ইন কম্যান্ডার জীবন সিংহ। তাঁকে ধরতে কেএলও নেত্রী ও জীবন সিংহের বান্ধবী ভারতী দাসকে ‘টোপ’ বানিয়ে বাংলাদেশে পাঠায় পুলিশ। কিন্তু সেখানে জীবন সিংহকে বিয়ে করে পুলিশের ছক ভেস্তে দেন ভারতী। বাংলাদেশেই তাঁদের দুই মেয়ের জন্ম হয়। এর পরে রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে বাংলাদেশ থেকেও পালিয়ে যেত বাধ্য হন তাঁরা। আশ্রয় নেন মায়ানমারের জঙ্গলে। ২০০৬ সালে জলপাইগুড়ির বেলাকোবায় প্যাসেঞ্জার ট্রেনে বোমা বিস্ফোরণের চক্রী হিসেবেও নাম উঠে এসেছিল ভারতী দাসের।

জীবন সিংহ। আসল নাম তমির দাস।

২০১৫ সালের জুন মাসে মায়ানমারে এক সেনা অভিযানে জীবন সিংহের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর ছড়ায়। কিন্তু তার পর ২০১৬ সালে ফের নতুন করে আন্দোলনের ডাক দিয়ে জীবন সিংহের সই করা চিঠি এবং জীবন সিংহের উপস্থিতিতে শহিদ দিবস পালনের একটি ছবি ঘিরে ফের প্রকাশ্যে আসে এই কেএলও নেতার বেঁচে থাকার খবর। যদিও অনেক করেও তাঁর টিকির নাগাল পায়নি এ রাজ্যের পুলিশ বা গোয়েন্দারা। তাঁদের ধারণা ছিল জীবন সিংহ স্ত্রীকে নিয়ে মায়ানমারেই আছেন। কিন্তু রবিবার নেপালের অ্যাম্বুলেন্সে করে ভারতী সিংহকে নিয়ে আসার ঘটনায় সেই ধারণা ভ্রান্ত কি না সেই প্রশ্ন উঠছে। এখন পুলিশের একটাই প্রশ্ন জীবন সিংহ কি নেপালে?  নাকি নেপাল-সীমান্ত সংলগ্ন উত্তরবঙ্গের কোনো এলাকায় গা ঢাকা দিয়ে আছেন?

সংগঠন তৈরির পর পরই একবার মাত্র আলিপুরদুয়ার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন জীবন সিংহ। তার পর জামিন পেয়ে উধাও হয়ে যান। তার পর থেকে আর তাঁর দেখা মেলেনি। সেই সময়কার ছবিই আছে পুলিশের কাছে। কিন্তু এত বছর পরে তাঁকে সেই ছবির সাহায্য নিয়ে চেনা সম্ভব কি না তা নিয়ে ধন্দে রয়েছেন পুলিশকর্তারা। তাই তাঁর দুই নাবালিকা মেয়ে তিথি ও প্রীতিকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন তাঁরা। কিন্তু সূত্র কিছু মেলেনি। সোমবার বৌদির দেহ নিতে আসেন জীবন সিংহের বোন সুমিত্রা সিংহ। তিনিও এক সময় জঙ্গিনেত্রী ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, ২০০৯-এর পর থেকে আর তাঁর দাদার সঙ্গে দেখা হয়নি, সঠিক কোনো খবরও জানেন না। রবিবার রাতে ভারতী দাসের ভর্তি হওয়ার সময় থেকে সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে নেপালের অ্যাম্বুলেন্সের চালককেও। ময়নাতদন্তের পর ভারতী দাসের দেহ সুমিত্রার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়ও নজরদারি চালানো  হবে। যদি স্ত্রীকে শেষ দেখা দেখতে এসে ‘জালে’ পড়েন এই মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি নেতা।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here