শ্রয়ণ সেন

সকালে একটু হাঁটতে বেরিয়েছি। বাইরে প্রবল উত্তুরে হাওয়া। বাড়ির কেয়ারটেকার বলে উঠলেন, “ক’দিন ধরেই তো মেলার হাওয়া ছেড়েছে। তাই খুব ঠান্ডা। মেলা যত আসবে, ঠান্ডা আরও বাড়বে।”

অফিস আসছি। বাসে দুই যাত্রীর কথোপকথন,

-“দেখেছেন কী রকম ঠান্ডা পড়েছে?”

-“ঠান্ডা পড়বে না! সাগরমেলা তো চলে এল।”

অন্য বারের থেকে এ বার অনেক বেশি ঠান্ডা পড়েছে। হিমালয় থেকে প্রবল উত্তুরে হাওয়ার হাত ধরে তাপমাত্রা ক্রমশ নিম্নমুখী। কলকাতার তাপমাত্রা থাকছে দশের কোঠায়। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছে দশের নীচে। তবে সাধারণ মানুষ মনে করেন গঙ্গাসাগর মেলার জন্যই শীত এসেছে। এটা আজ বলে নয়, সব সময় পৌষ সংক্রান্তিতে ঠান্ডা পড়লেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সাগরমেলা।

মানুষের স্মৃতি বড়োই দুর্বল! বেশি দূর নয়, ২০১৬ সালের তাপমাত্রার পরিসংখ্যান দেখলেই জানা যাবে পৌষসংক্রান্তির দিন তাপমাত্রা ছিল ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের থেকে এক ডিগ্রি বেশি। এ বার যখন পৌষ সংক্রান্তি এল এবং ঠান্ডা পড়ল, ঘুরে ফিরে সেই সাগরমেলার প্রসঙ্গই টেনে আনা হল।

কিন্তু আদৌ কি শীতের সঙ্গে সাগরমেলা বা ‘সাগরের হাওয়ার’ সম্পর্ক রয়েছে?

না, একেবারেই না। শীত পড়েছে প্রাকৃতিক কারণে। এর সঙ্গে সাগরমেলার কোনো সম্পর্ক নেই। আর সাগরের হাওয়ার সঙ্গে তো আরওই কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ প্রকৃত অর্থে সাগরের হাওয়া বইতে শুরু করলে শীতের দফারফা হয়ে যেত। সাগর থেকে যে হাওয়া বয় সেটা জলীয় বাষ্পে ভরা উষ্ণ দখিনা বাতাস। শীত পড়ে কনেকনে উত্তুরে হাওয়ার দৌলতে। এই উত্তুরে হাওয়াকে সরিয়ে দখিনা হাওয়া বইতে শুরু করলে তাপমাত্রা বাড়ত বই কমত না।

তবে সাগরমেলা যত এগিয়ে আসছে তাপমাত্রা কিছুটা ঊর্ধ্বমুখীই হচ্ছে। গত কয়েক দিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার কলকাতার তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে হয়েছে ১১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও এই তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের থেকে তিন ডিগ্রি কম, এবং গত কয়েক বছরের রেকর্ড ধরলে, এটাও খুব ঠান্ডার তকমাই পাবে। তবে গত কয়েক দিন যা খেল দেখাচ্ছিল তাপমাত্রা, তার থেকে কিছুটা বেশিই।

তবে দমদমের তাপমাত্রা বৃহস্পতিবারও ছিল ন’ডিগ্রির নীচে। সেখানে পারদ এ দিন ছিল ৮.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিঘা এবং ডায়মন্ড হারবারে তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে দশ ডিগ্রির ঘরে ঢুকেছে। শ্রীনিকেতন এবং পানাগড়ে এ দিন তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৬.৭ এবং ৬.৮ ডিগ্রি। বহরমপুর, বাঁকুড়া এবং কৃষ্ণনগরেও তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করছে ৭ থেকে ৯ ডিগ্রির মধ্যে।

উত্তরবঙ্গে কিছুটা বেড়েছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। শিলিগুড়ি এবং জলপাইগুড়িতে এ দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৯ এবং ৮.৮ ডিগ্রি। তুলনায় অনেক বেশি ঠান্ডা ছিল কোচবিহার। সেখানে এ দিন তাপমাত্রা ছিল ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আপাতত যা পূর্বাভাস, তাতে কলকাতা-তথা সমগ্র দক্ষিণবঙ্গে আগামী অন্তত দশ দিন শীতের প্রকোপ বজায় থাকছে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যদিও এক’দু ডিগ্রি বাড়তে পারে। অন্য দিকে উত্তরবঙ্গেও দশ ডিগ্রির আশেপাশেই ঘোরাফেরা করবে তাপমাত্রা। অতএব শীত আপাতত থাকছে। রবিবার মকর সংক্রান্তির দিন শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে পিঠেপুলি উৎসবে মেতে উঠুন রাজ্যবাসী।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here