চিরঞ্জীব পাল, খেমচি: অসুস্থ শরীর। কথা জড়িয়ে যায়। সাত বছর আগে একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। বাড়িতে একের পর এক সাংবাদিক আসছেন। কথা বলেছেন ক্লান্তিহীন ভাবে। খোকন মজুমদার ওরফে আবদুল হামিদ। যিনি হাতিঘিষায় ১৯৬৭ সালের ২৪মে যে কৃষক বিক্ষোভ হয়েছিল তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শরীর অশক্ত হলেও কিছুক্ষণ কথা বললে বোঝা যায় এখনও ভেতর টগবগ করে ফুটছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলার একদিন পর আবার সেলিব্রাল স্ট্রোক হয় তাঁর। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি। প্রথমে বেড মেলেনি, পরে তাঁকে আইসিইতে স্থানান্তরিত করা হয়। বুধবার তাঁকে দেখতে যান উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব।

নকশালবাড়ির খেমচিতে সিপিআই(এম-এল) জনশক্তির একচিলতে পার্টি অফিসে থাকতেন খোকন মজুমদার। পরে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে, সেই সময় পুলিশের গুলিতে নিহত বাবুলাল বিশ্বকর্মার পরিবার নিজেদের বাড়িতে এনে রাখে। বয়সের হিসাব নেই নিজের কাছে। কিছুদিন আগে এক জাপানি সাংবাদিক হিসাব কষে জানিয়েছেন তাঁর বয়স ৯০।

স্মৃতি হাতাড়াতে কষ্ট হয় তবুও তিনি সাংবাদিকদের কাছে ২৪ এবং ২৫ মের ১৯৬৭-র ঘটনা গড়গড় করে বলে যান।  ঘটনার আগে থেকে বিভিন্ন গ্রামে লাগাতার মিছিল হচ্ছিল। খোকন মজুমদার সহ স্থানীয় নেতারাই কৃষকদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সেই সময় কানু স্যান্যাল বুড়াগঞ্জে ছিলেন। (এ প্রসঙ্গে বলে রাখা যাক, কথিত আছে নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন তৈরি করেছিলেন ‘ফাইভ কে’। কানু, কদম, কেশব, খোকন, খুদন। তাঁদের মধ্যে এখনও খোকনবাবুই জীবিত) পুলিশ গ্রামে গ্রামে ঢুকে গ্রেফতার করতে শুরু করে। ২৪ মে ঝড়ুজোত গ্রামে পুলিশ ঢোকে। রেল লাইনের উপর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। হঠাৎ কারো ছোঁড়া একটি তির এসে পুলিশ অফিসার ওয়াংদির বুকে লাগে। মাটিতে পড়ে যান। ‘‘আমরা কমিটির পক্ষ থেকে বারবার কৃষকদের শান্ত থাকতে বলছিলাম,’’ জানালেন খোকন মজুমদার।

আরও পড়ুন: নকশালবাড়ির স্মৃতি অটুট, ৪ বার বিজেপি-র ডাক ফিরিয়ে দিয়েছেন আদিবাসী নেত্রী শান্তি মুন্ডা

২৫ মে ব্যাঙাইজোতে পুলিশ ক্যাম্প করে। গ্রামের কৃষকেরও ক্যাম্প করে বসে ছিল। গ্রামে পুলিশ ঢুকলে কৃষকের ঘোরাও করে। পুলিশ গুলি চালায়।

এখনও নিয়মিত নানা পত্র-পত্রিকা পড়েন। প্রতিদিন সকালে কাগজ পড়েন। নকশালবাড়ির পথ ভুল কি ঠিক তা নিয়ে যাবতীয় তর্ক-বিতর্ককে জানা-বোঝার চেষ্টা করেন। একটু জিজ্ঞেস করতে বোঝা গেল নকশালবাড়ির তরুণ প্রজন্মের কাছে এর ইতিহাস অজানা। সেটাও জানেন নবতিপর এই মানুষটি। মাঝে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের যুবকর্মীরা আসে। আর আসে কলেজ পড়ুয়ারা। যারা নকশালবাড়ি নিয়ে প্রোজেক্ট করছে। এ সব সত্ত্বেও হতাশ নন খোকন মজুমদার।

সম্প্রদায়িক শক্তির বাড়-বাড়ন্ত নিয়ে খবর রাখেন। খাস নকশালবাড়িতে তার যে ছায়া পড়েছে সে খবরও রাখেন।যে কৃষকরা জমির জন্য লড়াই করেছিল, তার আজ জমি প্রমোটারের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন তাও তাঁর অজানা নয়। তবুও তিনি আশাবাদী।

আরও পড়ুন: আন্দোলন করে দখল করা সেই জমি এখন প্রোমোটারদের গ্রাসে

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here