নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : ওজন ১৭ কুন্টাইল ৭৫ কেজি। নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছে ট্রাক। না, কোনো বিশালাকায় সামুদ্রিক তিমি বা জায়েন্ট অক্টোপাসের ওজন নয়। এ টাকার থুড়ি ‘পয়সা’র ওজন। মোট ১০ লক্ষ টাকা। আনা হল একটি ট্রাকে চাপিয়ে। চা-বাগানের শ্রমিকদের মজুরি দিতে।

কিন্তু ১০ লক্ষ টাকার ওজন এত?  যা আনতে ট্রাকে লাগে!

আসলে টাকাগুলো যে ‘কয়েনে’। ১, ২ ,৫ ও ১০ টাকার কয়েন। নোট বাতিলের গেরোয় চা-বাগানের মজুরি দেওয়া হল এই কয়েনে।

জলপাইগুড়ির শিকারপুর চা-বাগান। শ্রমিক, অফিস স্টাফ মিলিয়ে ১৯৫১ জন। মোট মাইনে দিতে হয় ৩১ লক্ষ ৬১ হাজার ৭৮৪ টাকা। এই মজুরির টাকা তুলতে বাগানের ম্যানেজার সুশান্ত বাগচী সোমবার ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার শিলিগুড়ি শাখায় যান। সকাল থেকে বসে থাকার পর তাঁকে জানানো হয় টাকা দেওয়া হবে, তবে ১৫ লক্ষ টাকা কয়েনে নিতে হবে।

এত কয়েন কীভাবে বাগানে পৌঁছে দেবেন, ভাবতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে যান সুশান্তবাবু। অনেক অনুরোধ-উপরোধের পর ৫ লক্ষ টাকা কমাতে রাজি হয় ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। ১০ লক্ষ টাকার কয়েন নিতেই হবে, ব্যাঙ্কে বড়ো নোটের আকাল, সাফ জবাব ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের। বাধ্য হয়ে তা মেনে নেন বাগান ম্যানেজার। 

এর পর আর এক গেরো। কিছু কয়েন প্যাকেটবন্দি থাকলেও ১, ২ টাকার কয়েনগুলি ছিল ‘লুজ’। অগত্যা সেগুলি গুনে নিতে হবে। কী আর করবেন। বড়বাবু ফণীন্দ্রনাথ দাস এবং নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাঙ্কের মেঝেতেই কয়েন গুনতে বসে পড়েন ম্যানেজার সাহেবও। অবশেষে সন্ধে গড়িয়ে ১৪৪ বস্তা ভর্তি কয়েন লরিতে চাপিয়ে বাগানে ফেরা। এ বার সমস্যা তৈরি হয় রাখার জায়গা নিয়ে। বড়ো নোট রাখার জন্য বাগানের অফিসঘরে সিন্দুক রয়েছে। কিন্তু ১৭৭৫ কিলোগ্রাম কয়েন কোথায় রাখবেন? শেষে ম্যানেজার সাহেবের বাংলোর ড্রয়িং রুমে জায়াগা হল ১৪৪টি বস্তার।

মঙ্গলবার বিকেলে কাজ শেষ করে মজুরি নিতে গিয়ে কয়েনের পাহাড় দেখে প্রথমে হাসির রোল ওঠে শ্রমিকদের মধ্যে। কিন্তু একটু পরেই চিন্তার ভাঁজ অনেকের মুখে। মজুরির অর্ধেক কয়েনে নিতে হবে। কিন্তু নিয়ে যাবেন কী ভাবে? পকেটে তো ছিঁড়ে পড়বে! অতঃপর বাজারের থলে আনতে বাড়ি ছোটেন তাঁরা। যে পয়সা দিয়ে বাজারের ব্যাগ ভর্তি করার কথা, সেই পয়সাই বাজারের ব্যাগে ভরে বাড়ি ফেরেন শ্রমিকেরা।

এ বারের মতো ল্যাঠা চুকলেও বাগানের বড়বাবু ফণীন্দ্রনাথ দাসের একটাই ভাবনা, ১৫ দিন পর আবার মজুরির টাকা আনতে যেতে হবে। সে দিনও কি….? 

নাহ, তত দিনে হয়ত নোট সমস্যা মিটে যাবে। রক্তচাপ কমাতে নিজেই নিজের মনকে প্রবোধ দেন বড়বাবু।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here