saibal-biswasশৈবাল বিশ্বাস :

চলতি মাস থেকেই সল্টলেক সেক্টর ফাইভে ইউনিট এরিয়া ভিত্তিক পুরকর ব্য‌বস্থা চালু হচ্ছে। অর্থাৎ সল্টলেক শিল্পতালুক নবদিগন্ত বা সেক্টর ফাইভে এ বার থেকে ভাড়ার ওপর বাড়ির বার্ষিক মূল্য‌ায়ন স্থির হবে না। নবদিগন্ত কতৃর্পক্ষ তার পরিবর্তে বেস ইউনিট এরিয়া ভ্য‌ালু বা বিইউএভি পদ্ধতিতে বাড়ির বার্ষিক মূল্য‌ায়ন করবে। তারই ভিত্তিতে বাড়ির ত্রৈমাসিক কর নির্ধারিত হবে। নবদিগন্ত-র সভাপতি পদে রয়েছেন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম স্বয়ং। মন্ত্রীর আগ্রহেই এই ব্য‌বস্থা চালু হল এবং তার থেকেই অনুমান করা হচ্ছে এ বার থেকে কলকাতা-সহ রাজ্য‌ের সমস্ত পুরসভাতেই এই ইউনিট এরিয়া ভিত্তিক করব্য‌বস্থা চালু হতে চলেছে।

ইউনিট এরিয়া ভিত্তিক করব্য‌বস্থায় শহর বা পুরসভাকে বিভিন্ন ব্লকে ভাগ করা হয়ে থাকে। ধরা যাক, নবদিগন্ত শিল্পতালুকে বড়ো রাস্তার ওপর বাড়িগুলি পড়ছে এ ব্লকে। আবার গলির একেবারে শেষ প্রান্তের পিছনের দিকের বাড়িগুলিকে ধরা হয়েছে সি ব্লক বা ডি ব্লকে। এ ব্লক-ভুক্ত বাড়িগুলির স্থানমাহাত্ম্য অনুযায়ী প্রতি বর্গফুটে বার্ষিক মূল্য‌ায়ন ধার্য করা হবে সর্বোচ্চ হারে। আবার সি বা ডি ব্লকভুক্ত বাড়িগুলির বর্গফুটে বার্ষিক মূল্য‌ায়ন ধার্য করা হবে সর্বনিম্ন হারে। তার ওপরই নির্ধারিত হবে পুরকর। বলা বাহুল্য‌, এ ব্লকের চেয়ে সি বা ডি ব্লকের বাড়িগুলির ক্ষেত্রে করহার হবে অনেকটাই কম। আগে কিন্তু প্রত্য‌েককে প্রাপ্ত ভাড়ার সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ হারে পুরকর দিতে হত।

কলকাতার ক্ষেত্রেও মেয়র শোভন চট্টোপাধ্য‌ায় দীর্ঘদিন ধরে ইউনিট এরিয়া ভিত্তিক কর চালু করতে চাইছেন। কিন্তু কলকাতার মানুষ এই করব্য‌বস্থা মেনে নিতে প্রস্তুত নন। পুরকর্তৃপক্ষ  সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিল। হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারে এ ব্য‌াপারে একটি নাগরিকসভাও ডাকা হয়েছিল। কিন্তু দলমত নির্বিশেষে নাগরিকদের একাংশ সেখানে মেয়রের প্রতি বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁদের বক্তব্য‌, কলকাতায় ইউনিট এরিয়া ভিত্তিক করব্য‌বস্থা চালু হলে উত্তর বা মধ্য‌ কলকাতার সাধারণ গরিব বা নিম্ন মধ্য‌বিত্ত নাগরিকের পুরকরের পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যাবে। সংযুক্ত এলাকা অর্থাৎ বেহালা বা যাদবপুরের ক্ষেত্রে কিন্তু করহার তেমন বাড়বে না বরং কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। উত্তর ও মধ্য‌ কলকাতা বা পুরোনো দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর, বালিগঞ্জের মতো এলাকার বার্ষিক মূল্য‌ায়ন এই পদ্ধতিতে করলে কর অনেকটাই বেড়ে যাবে। এই নিয়ে কলকাতায় গণবিক্ষোভ শুরু হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্য‌েই নাগরিকদের একাংশ বলতে শুরু করেছেন, এ ভাবে ইউনিট এরিয়া ভিত্তিক কর চালু করলে নিম্ন মধ্য‌বিত্ত বাড়িওয়ালারা বাড়ি প্রোমোটারদের হাতে ছেড়ে অন্য‌ত্র উঠে যেতে বাধ্য‌ হবেন। তবু এই পদ্ধতিতে কর আদায়ে পুরসভা বদ্ধপরিকর। তাদের যুক্তি, বর্তমানে কলকাতার ৬ লক্ষ ১৫ হাজার করদাতা মোট ৬০০ কোটি টাকা সম্পত্তিকর দেন। কিন্তু ইউনিট এরিয়া ভিত্তিক করব্য‌াবস্থা চালু হলে আদায় হবে ৮০০-৮৫০ কোটি টাকা। ইতিমধ্য‌ে পটনা, দিল্লি, বেঙ্গালুরু ও আমদাবাদে এই ধরনের ব্য‌বস্থা চলু হয়েছে। কাজেই কলকাতায় চালু করতে অসুবিধা কোথায়? অন্য‌ দিকে আইনজীবীদের একাংশ যুক্তি দিচ্ছেন, বেঙ্গালুরুর বা আমদাবাদের বেশির ভাগ এলাকাই অপেক্ষাকৃত নতুন। কলকাতায় কিন্তু তা নয়। ৩০০ বছরেরও প্রাচীন এই শহরের বেশির ভাগ এলাকাই বহু প্রাচীন। সেখানে যাঁরা বসবাস করেন তাঁদের বেশির ভাগই নিম্নমধ্য‌বিত্ত বা গরিব মানুষ। কলকাতার এই আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্যকে অন্য‌ শহরের সঙ্গে তুলনায় গুলিয়ে ফেললে চলবে না।

পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম সাংবাদিকদের বলেছেন, কলকাতায় ইউনিট এরিয়া ভিত্তিক কর চালু করার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবেই মুখ্য‌মন্ত্রীর বিবেচনাধীন। মুখ্য‌মন্ত্রীর সবুজ সঙ্কেত পাওয়া গেলে তবেই পুরসভা এ ব্য‌াপারে এগোবে। মেয়রও জানিয়েছেন, এ ব্য‌াপারে হিসাবনিকাশ চলছে, সরকারের সঙ্গে কথা বলেই চূড়ান্ত ঘোষণা করা হবে।

পুরসভা সূত্রে জানা গেছে, কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডকে বিভিন্ন অঞ্চলের জমির মূল্য‌ এবং পরিকাঠামোগত সুযোগ সুবিধার ওপর নির্ভর করে এ  থেকে জি — এই সাতটি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। একটি শ্রেণিভুক্ত ব্লকের সব সম্পত্তির বর্গফুট প্রতি প্রাথমিক বার্ষিক মূল্য‌ায়ন বা বিইউএভি একই হবে। ক্রমানুসারে এ থেকে জি ব্লক অনুযায়ী তা কমতে থাকবে। এ ব্লকের মধ্য‌ে যেমন শহরের প্রাণকেন্দ্র পার্ক স্ট্রিটের বাড়ি থাকতে পারে তেমনই থাকতে পারে শ্য‌ামবাজার মোড়ের কাছের বাড়িও। তুলনামূলক ভাবে নতুন এলাকা যেমন সেলিমপুর বা বেহালা যতই অভিজাত হোক না কেন, তা ঢুকবে সি থেকে জি-র মধ্য‌ে। এ ভাবে কর নির্ধারণ করার ফলে একই এলাকার গলির ভিতরের বাড়ি আর রাস্তার ওপরের বাড়ির মধ্য‌ে করহারের পার্থক্য‌ থাকতেই পারে বলে পুরকর্তারা জানিয়েছেন। আইনজীবীদের বক্তব্য‌, সরকার আয় বাড়ানোর জন্য‌ এটা চালু করতেই পারে, কিন্তু আইনি জটিলতা গড়াবে অনেক দূর পর্যন্ত।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here