খবর অনলাইন : প্রায় চার দশকে এই প্রথম জল সংকটে রালেগন সিদ্ধি।

মহারাষ্ট্রে জলসংকটের ছবিটা এতই তীব্র যে তার থেকে রেহাই পেল না অন্না হাজারের মডেল গ্রাম রালেগন সিদ্ধি। আহমেদনগর জেলার এই গ্রাম বৃষ্টির জন্য হাহাকার করে না। যেটুকু বৃষ্টির জল তারা পায় তার সবটাই ধরে রাখে সেই পদ্ধতিতে, যে পদ্ধতি অন্না তাদের শিখিয়েছিলেন প্রায় চার দশক আগে। জল সংরক্ষণের সেই পদ্ধতি আজ মডেল হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সেই রালেগন সিদ্ধি আজ জলসংকটে খরার কবলে স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষের দৌরাত্ম্যে। যার ফলে আজ সেই গ্রামে জল নিয়ে ঢুকছে ট্যাংকার, যে দৃশ্য কল্পনাও করতে পারেন না গ্রামবাসীরা।

আহমেদনগর জেলার এই গ্রাম মহারাষ্ট্রের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে অবস্থিত। বৃষ্টি প্রায় হয় না বললেই চলে। তিন দিকে পাহাড়, উঁচুনিচু রুখাশুখা জমি, মাটির গুণগত মান খুব খারাপ, পানীয় জলের খুব অভাব। জেলার অন্যান্য জায়গা বছরে বৃষ্টি পায় ৪৫০ মিমি থেকে ৬৫০ মিমি। রালেগন সিদ্ধির কপাল আরও খারাপ। গড়ে বছরে ৩৫ দিন বৃষ্টি পায় তারা। এই অবস্থায় এগিয়ে এলেন গ্রামেরই সন্তান অন্না হজারে। ১৯৭৫ সালে শুরু হল জল সংরক্ষণ প্রকল্প। পাঁচ বছরের মধ্যেই রালেগন হয়ে উঠল মডেল গ্রাম। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা ধরে রাখার জন্য গ্রামবাসীরা পাহাড়ের ঢাল বরাবর নালা কাটল, যাতে পাহাড় দিয়ে গড়িয়ে আসা জল সেই নালায় পড়ে। তার পর জল আটকে রাখার জন্য বাঁধ তৈরি করল গ্রামের মানুষ। কুয়ো খোঁড়া হল। বিভিন্ন জায়গায় জমানো জল পাঠানো হতে লাগল একটা বড়ো জলাশয়ে। তার পর সেখানকার জল পাম্প করে পাহাড়ের মাথায় নিয়ে গিয়ে ছোট ছোট জলধারায় বইয়ে দেওয়া হল পাহাড়ের গা বেয়ে। আবার সেই স্রোত আগলাতেও দেওয়া হল বাঁধ। এ ভাবেই জল সংরক্ষণ করা শুরু হল। এই জলই কাজে লাগে সেচে, পান করা আর দৈনন্দিন সাংসারিক কাজে। আর এ ভাবেই গ্রামে মাটির নীচে জলস্তরকে ধরে রাখা হয়।

হঠাৎ বৃষ্টি নামলে খুশির বন্যা বয়ে যায় গোটা গ্রামে। এই তো গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রবল বৃষ্টিতে ভেসে গেল রালেগন সিদ্ধি। এই মওকা কিন্তু একেবারেই হাতছাড়া করেনি গ্রাম। বৃষ্টির প্রতিটি বিন্দু তারা ধরে রেখেছে। সে দিনের কথা বলতে বলতে আনন্দে চোখে জল এসে গেল ৭৫ বছরের সুমনভাই পাঠারের। অনেক খরা দেখেছেন এই বৃদ্ধা। এক কলসি জল আনার জন্য খর রোদ মাথায় নিয়ে রোজ ৫ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হত। সে দিন অনেক দূরে ফেলে এসেছে রালেগন। ১৯৭৫ সালে এই গ্রামে সেচসেবিত জমি যেখানে ছিল মাত্র ৫০ একর, আজ সেখানে দেড় হাজার একর। চাষিরা ধান, কলাই, মটরশুঁটি, ছোলা, আম, পেঁয়াজ, নানা ধরনের সবজি ফলান। চারিদিকের বিস্তীর্ণ ফুটিফাটা অঞ্চলের মাঝে এই রালেগন সিদ্ধি যেন এক মরূদ্যান।

এ হেন মরূদ্যানে নজর পড়েছে স্বার্থান্বেষী মানুষদের। বোরওয়েলের উৎপাত শুরু হয়েছে এই গ্রামে। যেখানকার মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে গ্রামে ভূ-জলের সম্ভারটিকে সযত্নে রক্ষা করছেন সেখানে ৩০০ বোরওয়েল বসিয়ে ফেলা হয়েছে। কী ভাবে এই কাজ হয়েছে, ভেবে পাচ্ছেন না হতাশ অন্না। সেই বোরওয়েলের সাহায্যে অবিরাম জল টেনে গ্রামে ভূ-জলের সঞ্চয় নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। ফলে রালেগনে এখন খরার দশা। অন্না বলেন, “প্রকৃতি আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা করে, কিন্তু মানুষের মতো কখনও ঠকায় না।” ব্যক্তিগত স্বার্থ মেটাতে রালেগনেরই মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ঠকিয়েছে নিজেদের গ্রামকে।

ইতিমধ্যে চারটি গ্রামসভার আয়োজন করেছে রালেগন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, গ্রাম যাতে সারা বছর জল পায়, তার জন্য সমস্ত বোরওয়েল নষ্ট করে ফেলা হবে। অন্না জানিয়েছেন, “কী ভাবে এই বোরওয়েল বসল আমরা তা খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি। ভূগর্ভে সংরক্ষিত জল বার করে নেওয়ার জন্য গ্রামের কিছু মানুষ ৩০০ বোরওয়েল ব্যবহার করেছেন। আমরা এই বোরওয়েল  নিষিদ্ধ করে দিয়েছি। আমাদের গ্রামে জলের ট্যাংকার ঢুকছে। গ্রামবাসীরা অপমানিত বোধ করছেন।” যেমন সিদ্ধান্ত, তেমন কাজ। ১১০টি বোরওয়েল সিমেন্ট দিয়ে সিল করে দেওয়া হচ্ছে। গ্রামবাসীদের অন্না কথা দিয়েছেন, আগামী বছরের মধ্যে সমস্ত বোরওয়েল সিল করে দেওয়া হবে। গ্রামে কোনও জলকষ্ট থাকবে না।

দেশে আজকের এই করুণ জলচিত্রের অন্যতম কারণ বিচারবিবেচনা না করে মাটি থেকে যথেচ্ছ জল তুলে নেওয়া। এ ভাবে জল তুলে নিলে কী পরিণাম হতে পারে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল রালেগন সিদ্ধি। অন্নার লড়াইয়ের জন্যই হয়তো তাঁর গ্রামে স্বাভাবিক জলছবিটি ফিরে আসবে। কিন্তু অন্যত্র ?


একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন