শৈবাল বিশ্বাস :

কলকাতা পুর এলাকায় পুরোনো সম্পত্তিকর মূল্য‌ায়ন ব্য‌বস্থা তুলে দিয়ে নতুন মূল্য‌ায়ন ও করব্য‌বস্থা চালুর লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার রাজ্য‌ বিধানসভায় কলকাতা পুরসভা সংশোধনী বিল ২০১৬ পেশ করল রাজ্য‌ সরকার। বিলটি ধ্বনিভোটে গৃহীত হওয়ায় আগামী ১ এপ্রিল থেকে নতুন করব্য‌বস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্য‌ায়। কলকাতায় ইউনিট এরিয়াভিত্তিক কর চালু করার প্রস্তাবটি বাম আমলে গৃহীত হওয়ায় বামপন্থী বিধায়কদের তরফে তেমন কোনো আপত্তি আসেনি। বিজেপিশাসিত গুজরাতের আমদাবাদ এবং কংগ্রেসশাসিত কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতেও এই ব্য‌বস্থা কার্যকর রয়েছে। ফলে প্রায় বিনা বাধায় বিলটি পাশ করিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে পুর দফতর।

বিলটিতে বলা হয়েছে, এ বার থেকে কলকাতাকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে এলাকাভিত্তিক আলাদা পুরকর নেওয়া হবে। সেই কর স্থির করা হবে বর্গফুটের ভিত্তিতে। এলাকাভিত্তিক সম্পত্তির মূল্য‌ায়নের ভিতরও আবার নানা ভাগ থাকছে। যেমন রাস্তার ওপর বাড়ি হলে এক রকম, আবার গলির ভিতর বাড়ি হলে আর এক রকম। শ্য‌ামবাজার মোড়ে পাঁচতলা বাড়ির মূল্য‌ায়ন হবে এক রকম, আবার ওই এলাকাতেই গলির ভিতর বাড়ির মূল্য‌ায়ন হবে অন্য‌ রকম। স্বভাবতই বাড়ির অবস্থানের ওপর নির্ভর করে বর্ধিত কর দিতে হবে। কী ভাবে এই করব্য‌বস্থা চালু করা যায়, সে ব্য‌াপারে কলকাতা পুরসভা জরুরি ভিত্তিতে বিধি তৈরির কাজ শুরু করেছে।

পুরসভা সূত্রে জানা গেছে, কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডকে বিভিন্ন অঞ্চলের জমির মূল্য‌ এবং পরিকাঠামোগত সুযোগ সুবিধার ওপর নির্ভর করে এ থেকে জি – এই সাতটি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। একটি শ্রেণিভুক্ত ব্লকের সব সম্পত্তির বর্গফুট প্রতি প্রাথমিক বার্ষিক মূল্য‌ায়ন বা বিইউএভি একই হবে। ক্রমানুসারে এ থেকে জি ব্লক অনুযায়ী তা কমতে থাকবে। এ ব্লকের মধ্য‌ে যেমন শহরের প্রাণকেন্দ্র পার্ক স্ট্রিটের বাড়ি থাকতে পারে তেমনই থাকতে পারে শ্য‌ামবাজার মোড়ের কাছের বাড়িও। তুলনামূলক ভাবে নতুন এলাকা যেমন সেলিমপুর বা বেহালা যতই অভিজাত হোক না কেন, তা ঢুকবে সি থেকে জি-এর মধ্য‌ে। এ ভাবে কর নির্ধারণ করার ফলে একই এলাকার গলির ভিতরের বাড়ি আর রাস্তার ওপরের বাড়ির মধ্য‌ে কর হারের পার্থক্য‌ থাকতেই পারে বলে পুরকর্তারা জানিয়েছেন। আইনজীবীদের বক্তব্য‌, সরকার আয় বাড়ানোর জন্য‌ এটা চালু করতেই পারে, কিন্তু আইনি জটিলতা গড়াবে অনেক দূর পর্যন্ত।

আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, নতুন ফ্ল্য‌াটগুলির কর বাড়বে কিনা তা নিয়ে। মেয়র শোভন চট্টোপাধ্য‌ায় এ দিন বলেছেন, এই নিয়ে আশঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। ইউনিট এরিয়াভিত্তিক মূল্য‌ায়ন ও কর চালু হলে বহু ফ্ল্য‌াটের করভার কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তা ছাড়া এই কর চালু হলে কলকাতার মোট পুরকর আদায়। এর পরিমাণও অনেকটা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বার্ষিক করের পরিমাণ বেড়ে ৬০০-৬৫০ কোটি টাকায় পৌঁছোতে পারে বলে মেয়রের ধারণা।

ইউনিট এরিয়াভিত্তিক করব্য‌বস্থা মেনে নিতে একেবারেই রাজি নন কলকাতার বাড়িওয়ালা সংগঠনগুলি। ক্য‌ালকাটা হাউসওনার্স অ্য‌াসোসিয়েশনের সম্পাদক সুকুমার রক্ষিতের বক্তব্য‌, কলকাতার পুরোনো বাড়িওয়ালাদের ঘাড়ে অসম্ভব বেশি ট্য‌াক্স বসাতে চাইছে পুরসভা। মেয়রের নিজের নির্বাচনী এলাকাকে ফেলা হয়েছে সব চেয়ে পিছিয়ে পড়া জি ব্লকে। কিন্তু পুরোনো কলকাতার অধিকাংশ বাড়িই থাকছে এ, বি ব্লকে। ফলে তাঁদের বাড়ি যাতে প্রোমোটাররা বা পয়সাওয়ালা কিছু লোক দখল করে নিতে পারে তার ব্য‌বস্থা হচ্ছে। হয়তো দেখা যাবে পুরোনো কলকাতার নিম্ন মধ্য‌বিত্ত বা গরিব বাড়িওয়ালাকে শহর ছাড়া হতে হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here