শৈবাল বিশ্বাস:

মুখ্য‌মন্ত্রী মমতা ব্য‌ানার্জি চেয়েছিলেন কলকাতার পুরোনো বাড়ির সংস্কারের জন্য‌ একটা উপায় বের হোক। জরাজীর্ণ বাড়িগুলির বাসিন্দারা যেন বাড়ি চাপা পড়ে বেঘোরে মারা না পড়েন। সেই উদ্দেশ্য‌েই শুক্রবার রাজ্য‌ বিধানসভায় কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন আইনের ৪১২ ধারার সঙ্গে ৪১২ এ ধারা সংযুক্ত করে একটি সংশোধনী বিল পেশ করা হল। এই নতুন সংশোধনী বিলটি সর্বসম্মতিতেই পাশ হয়েছে। কংগ্রেস ও বামেরাও বিলটির প্রশংসা করেছেন। কী আছে বিলটিতে?

মোদ্দা কথা হল—

১) পুরোনো জরাজীর্ণ বাড়িগুলির অবিলম্বে সংস্কার করা প্রয়োজন। সেই জন্য‌ গোড়ায় বাড়িওয়ালাকে প্রস্তাব দেওয়া হবে মেরামতি করার জন্য‌। বাড়িওয়ালা রাজি হলে ওই বাড়ির বাসিন্দা ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাকে সাময়িকভাবে বিকল্প বাসস্থানের ব্য‌বস্থা করে দেবে পুরসভা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্য‌ে বাড়ি সারানো হয়ে গেলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ারা নিজের নিজের জায়গায় ফিরে আসতে পারবে।

২) বাড়িওয়ালারা বাড়ি সারাতে অপারগ হলে পুরসভা বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের সাময়িকভাবে অন্য‌ত্র সরে যাওয়ার ব্য‌বস্থা করে সেই বাড়িটি কোনো প্রোমোটার ডেভেলপারের হাতে তুলে দেবে। তিনি বাড়িটি নতুন করে তৈরি করে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের পুরোনো অংশ ফিরিয়ে দেবেন। এই প্রোমোটারকে পুরসভা বাড়তি এফেয়ার বা জায়গা নেওয়ার অনুমতি দেবে। সেই জায়গায় প্রোমোটার দোকান বা ফ্ল্য‌াট করে লাভ করার সুযোগ পাবেন।

কলকাতার ৩ হাজারের মতো জরাজীর্ণ বাড়ি এই প্রক্রিয়ায় অবিলম্বে সারিয়ে ফেলা যায় বলে মনে করেন পুর আধিকারিকরা। ইতিমধ্য‌ে এ ধরনের ১২০০ বাড়ির গায়ে নোটিশও দেওয়া হয়েছে। আগের পুর আইন অনুযায়ী এই বাড়িগুলির গায়ে নোটিশ লাগানো ছাড়া পুরসভার আর কোনো দায়িত্ব থাকত না। বাড়িওয়ালাকে মেরামতিতে বাধ্য‌ করা বা ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাকে বাড়ি থেকে সরে যেতে বাধ্য‌ করার কোনো আইন ছিল না। এ বার কিন্তু আইনের মাধ্য‌মেই পুরসভা বাড়ি সারাই করতে বাধ্য‌ করতে পারে।

পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গোড়ায় স্থির হয়েছিল, শুধু বাড়িওয়ালা নয়, ভাড়াটিয়ারাও প্রয়োজনে বাড়ি সারানোর অধিকার পাবেন। কিন্তু পরে দেখা গেল ভাড়াটিয়া বা ‘অকুপায়ার’দের এই অধিকার দেওয়া হলে আইনি জটিলতা বাড়বে। কারণ মালিকানাসত্ত্ব ছাড়াই বাড়ি সারাতে গেলে নানা আইনি অজুহাতে মামলা হতে পারে। সেই জন্য‌ বাড়ি সারানোর অধিকার শুধুমাত্র বাড়িওয়ালাদেরই দেওয়া হয়েছে। পুরসভা হস্তক্ষেপ করবে পরবর্তী পর্যায়ে।

এই আইন কার্যকর করা অসম্ভব বলে মনে করেন ক্য‌ালকাটা হাউস ওনার্স অ্য‌াসোসিয়েশনের সম্পাদক সুকুমার রক্ষিত। তাঁর বক্তব্য‌, বাড়ি অধিকার করে তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার অধিকার পুরসভার নেই। এই অধিকার রয়েছে কেবলমাত্র সরকারের। সে ক্ষেত্রেও সাময়িক অধিগ্রহণ বলে কোনো কথা হয় না। নতুন অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী কেবলমাত্র পাবলিক কনসার্ন বা জনস্বার্থে কোনো কাজ করার জন্য‌ সরকার জমি অধিগ্রহণ করতে পারে। ব্য‌ক্তি মুনাফার স্বার্থে এ ভাবে জমি বা সম্পত্তি নেওয়া যায় না। ফলে এই আইন উচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে যেতে বাধ্য‌।

তা হলে উপায়?

সুকুমারবাবুর মতে, বাড়ি সারানো অতি উত্তম প্রস্তাব। এর জন্য‌ দু’টি উপায় নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, সহজ সুদে বাড়িওয়ালাদের ঋণের ব্য‌বস্থা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ খরচের পরিমাণ বুঝে সেই টাকা ভাড়ার সঙ্গে আদায় করার ব্য‌বস্থা করা যেতে পারে। সুকুমারবাবুর মতে, বাড়ির জরাজীর্ণ দশার মূল কারণ রেন্ট কন্ট্রোল আইন। বাজারদরে বাড়িভাড়া নির্ণয় করতে দিলে বাড়ির যথাযথ সংস্কার করা সম্ভব হত। তাঁর মন্তব্য‌, “৩০ টাকা ভাড়া নিয়ে তো আর তিন লক্ষ টাকার সংস্কার করা যায় না।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here