নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: ‘বাঁচিয়ে সবুজ পৃথিবী গড়ুন,/নেই বিকল্প তার/গাছ লাগাবো, গাছ বাঁচাবো,/ করুন অঙ্গীকার’ — সবুজায়ন এবং কর্মসংস্থানকে এক সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে এই স্লোগানকে অভিনব রূপ দিল জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন। ‘বৃক্ষপাট্টা’ দিয়ে প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র মানুষের আয়ের পথ খুলে দিল এই উদ্যোগ।

বৃহস্পতিবারের গোটা দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছিল এই কাজের জন্য। এই এক দিনেই রোপণ করা হল দু’ লক্ষ এক হাজার দু’শো আশিটি চারাগাছ। জেলার ৮০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের ২৫২ কিলোমিটার রাস্তার ধারে এই চারাগাছ রোপণ করা হল। মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

তবে বৃক্ষরোপণ তো জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে হয়েই থাকে। এর অভিনবত্ব এখানেই যে, শুধু দু’ লক্ষাধিক বৃক্ষ রোপণ নয়, তার সঙ্গে অনেক মানুষের আয়ের রাস্তাও করে দেওয়া হয়েছে।

যে গ্রামাঞ্চলে গাছ লাগানো হয়েছে, সেখানকার বাসিন্দাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সেই গাছ রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচর্যার। এর জন্য গাছপিছু মাসে ১০ টাকা করে পাবেন সেই ব্যাক্তি। অর্থাৎ কেউ যদি ১০০টি গাছের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করেন তবে তাঁর মাসিক আয় হবে ১০০০ টাকা। ঠিক হয়েছে এক জনকে ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০টি গাছের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সারা জেলা জুড়ে এ রকম এক হাজার দু’শো আটান্ন জন গ্রামবাসীকে বেছে নেওয়া হয়েছে এই কাজের জন্য। এঁদের দেওয়া হল ‘বৃক্ষপাট্টা’। আগামী তিন বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করবেন তাঁরা। অর্থাৎ এই তিন বছরের জন্য আয়ের একটা বিকল্প পথ খুলে গেল প্রত্যন্ত এলাকার মানুষদের কাছে। সাধারণত দেখা যায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঘটা করে বৃক্ষরোপণ করা হয়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই চারাগাছ সমূলে বিনষ্ট হয়। এই উদ্যোগ নিয়ে জলপাইগুড়ির জেলাশাসক রচনা ভগতের ব্যাখা, যে হেতু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আয় হবে তাই দায়িত্ব নিয়েই সেই কাজ করবেন গ্রামের মানুষ। তবে এই গাছ কাটতে পারবেন না কেউ। যাঁরা ‘বৃক্ষপাট্টা’ পেয়েছেন, গাছের ফলফুলের মালিক তাঁরাই হবেন। যদি ঝড় বা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে গাছ ভেঙে পড়ে, তবে সেই গাছের দাবিদারও হবেন রক্ষণাবেক্ষণকারী সেই ব্যাক্তি।

তবে এখানেই শেষ নয়। এই ‘বনসৃজন’ প্রকল্পে ১৯ হাজার ১২২ জন শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছিল। তাঁরা ১০০ দিনের মজুরিবাবদ অর্থ পেয়েছেন। সরকারি প্রকল্পকে কী ভাবে একই সঙ্গে পরিবেশ-উপযোগী এবং কর্মমুখী করা যায় তার প্রকৃষ্টতম উদাহরণ জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ। জেলাশাসক নিজেই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে প্রকল্পের শুভ সূচনা করেছেন। জলপাইগুড়ি সদর বিডিও তাপসী সাহা-সহ ব্লক স্তরের অন্য আধিকারিকরাও বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতে যান প্রকল্পের সূচনা করতে। জেলাশাসক জানিয়েছেন, ১০০ দিনের কাজের এই প্রকল্পে ৩ লক্ষ ৯৬ হাজার ৫২২টি শ্রমদিবস তৈরি হবে। গাছের চারা কেনা, রক্ষণাবেক্ষণের মজুরি সব মিলিয়ে প্রায় সাত কোটি আটচল্লিশ লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার টাকা খরচ করা হবে।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ব্যাখ্যা করছেন জেলাশাসক রচনা ভগত।

তবে এই পরিকল্পনা যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত, সেই জেলাশাসক রচনা ভগত কিন্তু এর  সম্পূর্ণ কৃতিত্ব নিতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি শুধুমাত্র প্রকল্পটিকে রূপায়িত করেছেন। তবে যাঁদের কর্মসংস্থান হল তাঁরা কিন্তু জেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ দিতে ভোলেননি।

‘বৃক্ষপাট্টা’ পেয়েছেন বাহাদুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সন্তোষ দাস। তিনি জানালেন, গাছ লাগানো পুণ্যের কাজ, তার ওপর আয়ের রাস্তা খুলে যাওয়ায় তার দারিদ্রতাও কিছুটা দূর হবে। উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন পরিবেশপ্রেমীরাও। জলপাইগুড়ি সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের সম্পাদক অধ্যাপক রাজা রাউত জানিয়েছেন, প্রশাসন এই ধরনের উদ্যোগ নিলে সাধারণ মানুষও সবুজায়ন করতে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে আসবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন