নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : ‘জেলে ঘানি টানা’ এই প্রবাদ বহু পুরোনো। নতুন ভাবে ফিরে আসছে সেই ‘ঘানি’। তবে এ বার আর শাস্তি হিসেবে নয়, বন্দি আবাসিকদের উন্নতিকল্পে এই ব্যবস্থা! উদ্দেশ্য  তেল তৈরি।  তা-ও বন্দিদের হাতে। উত্তরবঙ্গে প্রথম জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে বন্দি আবাসিকরা উৎপাদন করবেন সরষের তেল।

দীর্ঘদিন ধরেই জেলগুলিকে আক্ষরিক অর্থে সংশোধনাগার করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্য কারা দফতর। নানা ধরনের হাতের কাজ শেখানো, পড়াশোনার ব্যাবস্থা, সংশোধনাগারের পরিবেশের উন্নতির মাধ্যমে বন্দিজীবনে সুস্থ ভাবে বাঁচার অধিকার দেওয়া হচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার। সংশোধনাগারের ভেতরেই বসানো হয়েছে বৈদ্যুতিক ঘানি মেশিন। প্রায় তিন বিঘা জমি জুড়ে হয়েছে সরষে চাষ। শুধু এই সংশোধনাগারেই নয়, কোচবিহার, রায়গঞ্জ, ইসলামপুর-এর মতো অন্য সংশোধনাগারগুলিতেও চাষ হচ্ছে সরষে। উৎপাদিত সমস্ত সরষে নিয়ে আসা হবে জলপাইগুড়িতে, যা দিয়ে বৈদ্যুতিক ঘানি মেশিনে উৎপাদন হবে শুদ্ধ সরষের তেল। প্রয়োজনে খোলাবাজার থেকেও সরষে কেনা হবে। তবে উৎপাদিত তেল কিন্ত খোলা বাজারে বিক্রি করা হবে না। তা ব্যবহার হবে সংশোধনাগারের আবাসিকদের জন্যই।

উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি সার্কেলে মোট ১৩টি সংশোধনাগার রয়েছে। আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, দার্জিলিং জেলার সংশোধনাগারগুলি এই সার্কেলে পড়ে। সব মিলিয়ে বন্দির সংখ্যা ছয় হাজারের কাছাকাছি। প্রতি দিন গড়ে ৬০ লিটার তেলের প্রয়োজন। মাসে পরিমাণটা গিয়ে দাঁড়ায় ১৮০০লিটার। এর সবটাই কেনা হয় খোলাবাজার থেকে।

কারা দফতর সূত্রে খবর, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য দু’টো। প্রথমত, সংশোধনাগারে বন্দি আবাসিকরা যাতে শুদ্ধ তেল ব্যবহার করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, খোলাবাজারের থেকে অনেক কম খরচে এই তেল পাওয়া যাবে। এর ফলে কারা দফতরেরও ব্যয়সংকোচ হবে অনেকটাই।

এই মুহূর্তে ১৪৬১ জন আবাসিক বন্দি রয়েছেন জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে। গড়ে মাসে প্রায় ৪০০ লিটার তেল প্রয়োজন এখানে। সেই চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত তেল পাঠিয়ে দেওয়া হবে জলপাইগুড়ি সার্কেলের অন্যান্য সংশোধনাগারে।

বুধবার জলপাইগুড়ি সংশোধনাগার পরিদর্শনে আসেন রাজ্যের কারামন্ত্রী উজ্বল বিশ্বাস এবং ডিজি-কারা অরুণ কুমার গুপ্তা। তাঁরা এই বৈদ্যুতিক ঘানি মেশিনটি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কারামন্ত্রী জানিয়েছেন, সংশোধনাগারের বন্দি আবাসিকদেরই এই কাজে লাগানো হচ্ছে। জমিতে সরষে চাষ থেকে শুরু করে ঘানি থেকে তেল উৎপাদন সবটাই আবাসিকরা করবেন। জেলের সুপার থাকবেন তদারকির দায়িত্বে। যাঁরা কাজে নিযুক্ত হবেন তাঁরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পারিশ্রমিকও পাবেন বলে জানিয়েছেন কারামন্ত্রী উজ্বল বিশ্বাস।

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন সংশোধনাগারের জেল সুপার শুভব্রত চট্টোপাধ্যায়  এবং জেলার রাজীব রঞ্জন। জেলার রাজীব রঞ্জন জানিয়েছেন, চলতি মাসেই শুরু হয়ে যাবে তেল উৎপাদনের কাজ। এর মধ্যেই বিভিন্ন সংশোধনাগারে উৎপাদিত সরষে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। রয়েছে এই সংশোধনাগারের উৎপাদিত সরষেও। আবাসিকদের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে কর্মীদেরও।

তবে সব চেয়ে বেশি উৎসাহী সংশোধনাগারের আবাসিকরা। তার যতটা না শুদ্ধ তেলের জন্য, তার থেকেও বেশি উৎসাহ নতুন কিছু একটা করার জন্য। তাঁদের অধীর অপেক্ষা, কবে ঘুরবে চাকা, পড়বে তেল। শুদ্ধ সরষের তেল, যাতে থাকবে ঝাঁজ, স্বাদ, গন্ধ এবং বিশুদ্ধতা। সংশোধনাগারের আবাসিকদের মতোই। যাঁরা বন্দিজীবন কাটিয়ে নিজেদের শুদ্ধ করে নিচ্ছেন আগামীর জন্য।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন