karala river now.
এখনকার করলা। চেষ্টা চলছে এই নদীতে বিসর্জনের প্রথা ফিরিয়ে আনার।
রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়

জলপাইগুড়ি: এক সময় জলপাইগুড়িতে দুর্গাপুজোর ভাসান বিখ্যাত ছিল। শহরের সমস্ত প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার আগে করলা নদীতে নৌকোয় করে ঘোরানো হত। রাত বাড়লে নৌকো থেকেই জলের মধ্যে ভাসিয়ে দেওয়া হত প্রতিমা। করলা নদীতে এই ভাসান পর্বকে কেন্দ্র করে বিসর্জনের দিন শহর মেতে উঠত। শুধু শহরই নয়,ভাসান দেখতে ডুয়ার্সের নানা প্রান্ত থেকে মানুষজন আসতেন জলপাইগুড়ি শহরে। এ রকম একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত বিসর্জন প্রথা ফিরিয়ে আনা নিয়ে পুরসভার বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আশাবাদী। তবে বিরোধীদের বক্তব্য, তার আগে করলা নদীর নাব্যতা বাড়ান দরকার।

ষাটের দশকের কথা। তখনও তিস্তা সেতু তৈরি হয়নি। ডুয়ার্স বা কোচবিহারে যেতে গেলে নৌকোয় করে তিস্তা পার হয়ে বার্নেশ ঘাটে যেতে হত। সেখান থেকে বাস ধরে যাওয়া। তিস্তা নদী থেকে এই নৌকোগুলোকে দশমীর দিন সমস্ত পুজো কমিটি নিয়ে আসত। বিকেলে এই নৌকোগুলোর মধ্যে প্রতিমা উঠিয়ে করলা নদীর মধ্যে ঘোরানো হত। ঘোরার পরিধিও সীমাবদ্ধ ছিল। এক দিকে সুনীতিবালা সদর হাইস্কুলের সামনে করলা সেতু থেকে দিনবাজার সেতুর মধ্যে প্রবাহিত করলা নদীর মধ্যেই সমস্ত নৌকো ঘুরত। এইটুকু এলাকার দু’পাশে শহর এবং শহরতলির বাসিন্দারা ভিড় করতেন।

আরও পড়ুন কন্যাসন্তান চেয়ে সাড়ে তিনশো বছর আগে পুজো শুরু করেছিল আদ্রার মিশ্র পরিবার

নৌকোর মধ্যে হ্যাজাক জ্বলত। সেই হ্যাজাকের আলোয় তখনকার তরুণ উদ্যোক্তারা নৌকোর মধ্যেই ধুনুচি নাচে মেতে উঠত। তখন জলপাইগুড়ি শহরের মেয়েরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাসান দেখতে যেত। তার মধ্যে পুজো কমিটির সদস্যদের কারও কারও প্রেমিকাও থাকত। পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভালোবাসার পাত্রীকে দেখে নৌকোর মধ্যে সেই সদস্যের নাচ দ্বিগুণ হয়ে যেত। তখন এক ধরনের শব্দবাজি পাওয়া যেত যা জলের মধ্যেও ফাটত। তা ‘ওয়াটার বোম’ নামে পরিচিত ছিল। জলের মধ্যে সেই শব্দবাজি দেদার ফাটানো হত।

কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা তাদের নিজস্ব নৌকো নিয়ে ঘুরতেন। তার মধ্যে একটি পরিবারের বজরা ছিল। কেউ কেউ বন্ধুবান্ধব নিয়ে নৌকো নিয়ে ঘুরতেন। নদীর মধ্যে পুলিশের নৌকোও থাকত। কোনো রকম বেচাল দেখলে পুলিশের নৌকো ছুটে যেত। রাত ন’টার পর থেকে পুলিশের পক্ষ থেকে সমস্ত পুজো কমিটির কাছে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার অনুরোধ রাখা হত। রাত দশটার পর পুজো কমিটিগুলি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার কাজ শুরু করত।

আরও পড়ুন নীলদুর্গা পুজো হয় একমাত্র কৃষ্ণনগরের চট্টোপাধ্যায় পরিবারে

তিস্তা নদীতে সেতু হওয়ার আগে পর্যন্ত জলপাইগুড়িতে এই ভাসান চলেছিল। তিস্তাসেতু হওয়ার পর তিস্তা নদী পারাপারের জন্য নৌকোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। মাঝিরা অন্য পেশায় চলে গেলেন। নৌকোর অভাবে আস্তে আস্তে করলা নদীতে ভাসান বন্ধ হয়ে গেল। জলপাইগুড়ির এই ভাসানকে ফিরিয়ে আনতে আশাবাদী জলপাইগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান ইন-কাউন্সিল সৈকত চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “এ বছর হবে না। আগামী বছর আমরা জলপাইগুড়ির এই পুরোনো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব।” জলপাইগুড়ি পুরসভার বিরোধী কাউন্সিলার পিনাকি সেনগুপ্ত বলেন, “করলা নদীতে এখন জল কমে গেছে। নদীর নাব্যতা বাড়িয়ে এই উদ্যোগ নিতে হবে।”

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন