a high protein mushroom
কাড়ানি ছাতু।
মৃণাল মাহাত

মন ভালো নেই ছাতু পাইকারদের। মন ভালো নেই খাদ্যরসিকদের। মন ভালো নেই জঙ্গললাগোয়া গ্রামবাসীদের। কী করেই বা মন ভালো থাকবে?

এ বছর যে কাড়ানি ছাতুর দেখা মেলেনি সে ভাবে। সারা বছর জঙ্গলমহলের মানুষ অপেক্ষা করে থাকে কাড়ানি ছাতুর অপেক্ষায়। মূলত বর্ষার শেষ থেকে শরতের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ছাতু জঙ্গলে দেখা যায়। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকেই এই ছাতু জঙ্গলে সে ভাবে দেখা যাচ্ছে না। এ বছর তো অর্ধেকেও ওঠেনি বলে বিক্রেতাদের মত। সবজিবিক্রেতা কালোসোনা দেবসিংহ, অনিল মাহাতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,  এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় আমদানি খুব কম।তাঁরা বলেন, “প্রতি বছর আমরা ছয় সাত কুইন্টাল করে সাপ্লাই দিই শহরে।এ বছরে দু’ কুইন্টালও হয়নি।”
‘কাড়ানি ছাতু’ আসলে কী? বনাধিকারিক বিনয় মাহাত বলেন, কাড়ানি এক ধরনের উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ মাশরুম। স্থানীয় ভাষায় যা কাড়ানি ছাতু নামে পরিচিত। মূলত পশ্চিমাঞ্চলের ল্যাটেরাইট মৃত্তিকাসমৃদ্ধ জঙ্গলে বর্ষার সময় এই ছাতু জন্মায়। খুবই সুস্বাদু হওয়ায় এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। নানা রকম লোভনীয় পদ তৈরি করা যায় এই ছাতু দিয়ে।
এক দশক আগেও কাড়ানি মূলত স্থানীয় গ্রামীণ বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু গত সাত-আট বছর ধরে পাইকারদের মাধ্যমে বড়ো শহরগুলিতে পৌঁছে যাওয়ায় গ্রামবাসীরা ভালো দাম পাচ্ছেন। মূলত জঙ্গলসংলগ্ন গ্রামবাসীরাই জঙ্গল থেকে ছাতু সংগ্রহ করেন। পরে পাইকারদের মারফত মেদিনীপুর, জামশেদপুর, খড়গপুর, ঘাটাল, আসানসোলে ছড়িয়ে পড়ে। কাড়ানি ছাতু ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি ধরে শহরগুলিতে বিক্রি হয় বলে গ্রামবাসীরা জানান।
বিশিষ্ট কুড়মী সমাজকর্মী প্রদীপ মাহাত বলেন, এখানকার প্রায় সব জঙ্গল এলাকাতেই এই ছাতু পাওয়া যায়। বর্ষা-শরতের মরশুমে জমির কাজের বাইরে জঙ্গল থেকে ছাতু সংগ্রহ করে কিছু বাড়তি আয় করে থাকে এখানকার আদিবাসী জনজাতি। বাড়ির মহিলা এবং কিশোরীরা মূলত ছাতু সংগ্রহের কাজ করে থাকে। তবে ইদানীং ছেলেরাও এই কাজ করছে।
কিন্তু এ বছর শালজঙ্গলে সে ভাবে ছাতুর দেখা মেলেনি। কারণ কী? তরুণ পরিবেশপ্রেমী শিক্ষক রাকেশ সিংহদেব বলেন, “ছত্রাক বা ছাতু মৃত এবং পচা জীবদেহ বা দেহাংশের উপর জন্মায়। গ্রীষ্মকালে জঙ্গলে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এ সবের পাশাপাশি ছাতুর রেণু বা স্পোরগুলিও পুড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে জঙ্গলের মাটিতে আগের মতো আর ছাতু হচ্ছে না।” অনেকে আবার দূষণের তত্ত্বও খাড়া করছেন। তাঁদের বক্তব্য, নির্বিচারে অরণ্যনিধন, গ্রামাঞ্চলে প্রচুর মোবাইল টাওয়ার নির্মাণ এর কারণ হতে পারে।
মানুষের অবিবেচনার কারণে তা হলে কি শেষ হয়ে যাবে কাড়ানি ছাতুর বংশবিস্তার? এই আশঙ্কাই করছেন পরিবেশপ্রেমীরা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন