নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: থানায় মহিলা ব্যারাকের বিছানায় বসে কাঁদছিলেন এক তরুণী। মাথায় ঘোমটা। শাড়িতে রক্তের দাগ তখনও টাটকা। এই তরুণীর বিরুদ্ধে  অভিযোগ, শাশুড়িকে খুনের চেষ্টার। জলপাইগুড়ির প্রত্যন্ত এলাকা বড়ুয়াপাড়ার ঘটনা। অত্যন্ত গুরুতর জখম অবস্থায় ওই প্রৌঢ়া জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

শাশুড়ি-বৌমার কলহ সংসারে নতুন কিছু নয়। কিন্তু কী এমন ঘটল, যার জন্য সদ্যবিবাহিতা এক তরুণী হাতে অস্ত্র তুলে নিলেন? নিজের শাশুড়িকে মেরে ফেলার চেষ্টা করলেন? এই প্রশ্নই কিন্তু ঘুরপাক খাচ্ছে এখন সকলের মনে।

বেরুবাড়ির  সচ্ছল কৃষক দম্পতির মেয়ে সোমা। গত বছর হলদিবাড়ি কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। সেই সময়ই বড়ুয়াপাড়ার পুণ্য বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচয় হয় সোমার। গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া পুণ্য লোহার শাটার তৈরির মিস্ত্রি। তাঁর বাবা শ্রীবাস বিশ্বাস রাজমিস্ত্রির সাহায্যকারী। মা ভাগ্যদেবী সাধারণ গৃহবধূ।

পরিচয়ের কিছু দিনের মধ্যেই সম্পর্ক গভীর হয় দু’জনের। কিন্তু বিয়েতে বাধ সাধে দুই বাড়িই। তাদের অমতেই দু’জনে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। গত অক্টোবর মাসে বিয়েও করেন। নিমরাজি শ্বশুর-শাশুড়ি বাধ্য হয়েই পুত্রবধূকে ঘরে নিয়ে আসেন। কিন্তু এর পরেই অপছন্দের পুত্রবধূর সঙ্গে শুরু হয় শাশুড়ির কলহ।

জখম শাশুড়ি ভাগ্য বিশ্বাস।

বুধবার সোমা অভিযোগ জানিয়েছেন, স্বামী বাড়িতে না থাকলেই শুরু হয়ে যেত মানসিক অত্যাচার। গায়ের রঙ চাপা বলে ‘কালো মেয়ে’-এর গঞ্জনা নিত্যদিন শুনতে হত কলেজপড়ুয়া তরুণীকে। সেই সঙ্গে ছিল বাপের বাড়ি থেকে পণ দেওয়ার জন্য চাপ। শাশুড়ির আপত্তিতে বন্ধ হয়ে যায় কলেজে যাওয়াও।

স্বামী কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর বুধবার সকালেও বিছানায় শুয়েই শুরু হয় শাশুড়ির নিত্যদিনের গঞ্জনা। সীমার নিজের কথায়, “আর সহ্য হয়নি। তাই হাতের কাছে থাকা দা দিয়েই ওই মুখ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলাম, যাতে আর খারাপ কথা বলতে না পারে।”

কিন্তু আপাতশান্ত তরুণী স্ত্রীর এই রূপ বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না তাঁর স্বামীও। তিনি জানিয়েছেন, বিয়ের পর কলেজ যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছুটা মুষড়ে পড়েছিল সোমা। এ ছাড়া ছোটোখাটো সাংসারিক কথাকাটাকাটি হলেও গঞ্জনা দেওয়া বা পণ নিয়ে চাপ দেওয়ার মতো ঘটনা কখনোই ঘটেনি। একই কথা বলছেন জখম ভাগ্যদেবীর স্বামী শ্রীবাস বিশ্বাস। তাঁদের স্বল্পভাষী মেয়েটি এ রকম ঘটনা যে ঘটাতে পারে তা এখনও  বিশ্বাসই করে উঠতে পারছেন না সোমার মা-বাবাও।

স্বামী পুণ্য বিশ্বাস (নীল গেঞ্জি) ও শ্বশুর শ্রীবাস বিশ্বাস (চেক শার্ট)।

মাত্র ন’ মাস আগে বিয়ে হয়ে আসা বউমার কীর্তিতে পাড়া প্রতিবেশীরাও হতবাক। শাশুড়িকে জখম করার পর বাড়ি ছেড়ে পালানোর সময় প্রতিবেশীরাই সোমাকে আটক করে। তারাই খবর দেয় পুলিশে। কোতোয়ালি থানার পুলিশ গিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। পুলিশের জেরার মুখে কিন্তু সোমা এক বারও অস্বীকার করেননি ঘটনার কথা। কিন্তু এক বারও খোঁজ করেননি অতগুলো আঘাতের পর তাঁর শাশুড়ি আদৌ বেঁচে আছেন কি না। এমনকি যাঁর হাত ধরার জন্য সব স্বপ্ন ত্যাগ করেছিলেন, সেই স্বামীর কথাও জানতে চাননি এক বারও।

মনোবিদরা কিন্তু ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কলেজপড়ুয়া শিক্ষিত সোমা আবেগের বশে স্বল্পশিক্ষিত পুণ্যকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলেন, তিনি ভুল করে ফেলেছেন। জলপাইগুড়ির প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আশিস সরকারের বক্তব্য, আর্থ-সামাজিক পরিবেশের পার্থক্য হতাশা জাগিয়ে তুলেছিল তরুণীর মনে। স্বল্পশিক্ষিত এক যুবককে আবেগতাড়িত হয়ে বিয়ে করা যে ভুল হয়েছিল, তা হয়ত মনে গেঁথে বসেছিল। তার ওপর গ্রাম্য প্রৌঢ়া শাশুড়ির ‘কালো মেয়ের’ গঞ্জনা। এই হতাশা আর রাগের বহিঃপ্রকাশই আজকের ঘটনা। সোমার এই মুহূর্তে মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসক আশিস সরকার।

বৃহস্পতিবার সোমাকে জলপাইগুড়ি আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে। শাশুড়িকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে তাঁর বিচার চলবে। কিন্তু আবেগতাড়িত মন যে ‘ভুল’ করেছে তার বিচার কি আর সম্ভব?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন