নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুক্তা খাতুন। সংবর্ধনা নিচ্ছেন ‘কন্যাশ্রী’। মুখে উজ্বল হাসি। যদিও তার হাসিমুখ দেখে বোঝার উপায় নেই, মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকতে কতটা কষ্ট হচ্ছে। কারণ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাটুকুও নেই তার। মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে জলপাইগুড়ির জেলা পরিষদের সভাধিপতি নূরজাহান বেগমের কাছ থেকে পুরস্কার নিল সে। তার পর মায়ের কোলে চেপে ফিরে গেল অনুষ্ঠানমঞ্চে তার নির্দিষ্ট আসনে। গোটা হলঘর ঘিরে তখন হাততালির বন্যা। উপস্থিত অনেকে বললেন, এরাই আসল কন্যাশ্রী, এদের জন্যই সফল কন্যাশ্রী প্রকল্প।

ধূপগুড়ির পশ্চিম মাগুরমারির বাসিন্দা কৃষক দম্পতি মকবুল হোসেন-জামিলা খাতুন। তাঁদের  বড়ো মেয়ে মুক্তা। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। ৮০ শতাংশ প্রতিবন্ধকতা তার। একা চলাচল করার ক্ষমতাটুকুও নেই। হাত নাড়াতেও অসুবিধে হয়। জড়িয়ে যায় কথাও। কিন্তু এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দমিয়ে রাখা যায়নি তার এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেকে। মাধ্যমিক (২৪৭) এবং উচ্চমাধ্যমিকে (২৪৮) ভালো নম্বর নিয়ে নিয়ে পাশ করে এখন সে ধূপগুড়ি গার্লস কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কিন্তু তাকে যে পড়াশোনা করাতে পারবেন এক সময় এই আশাটুকুও ছেড়ে দিয়েছিলেন তার বাবা-মা।

নিজের সামান্য জমিতে চাষ করে যা আয় হয় সেইটুকুই সম্বল মকবুল হোসেনের। তা দিয়ে চার মেয়ে এক ছেলে-সহ সাত জনের সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হত। তার ওপর বড়ো মেয়ে মুক্তা শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় এক সময় তার ভবিষ্যৎ ভেবে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। পড়াশোনা তো দূর অস্ত। তার চিকিৎসার খরচ জোগাতেই হিমসিম। কিন্তু মেয়ের অদম্য জেদ দেখে তিনিও সাহস পান। চেয়েচিন্তে মেয়ের স্কুল খরচ জোগাড় করেন।

এর পরেই আসে মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প কন্যাশ্রী। এইটুকুই বোধহয় দরকার ছিল মুক্তার। কন্যাশ্রী প্রকল্পের বৃত্তি নিয়ে পুরো উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করে মুক্তা। মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ান মা-বাবা-বোনেরা। তার পক্ষে হেঁটে স্কুলে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই কোনো দিন বাবা, কোনো দিন মা, কোনো দিন বা বোন, সাইকেলে চাপিয়ে স্কুলে দিয়ে আসত তাকে। আবার স্কুল শেষে নিয়ে আসা। মুক্তার স্কুল ডাউকিমারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা অর্চিতা সরকার জানিয়েছেন, সমস্ত যন্ত্রণা চেপে রেখে, এক অদ্যম আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছে মুক্তা। পায়ের মতো হাতেও সমস্যা। তাই রাইটারের সাহায্য নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে এখন সে ধূপগুড়ি গার্লস কলেজের ছাত্রী।

মেয়েদের আত্মনির্ভর করতে তুলতে কন্যাশ্রীর, সবুজসাথীর মতো প্রকল্পের ভাবনা এসেছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায়। আজ মুক্তার চলার কঠিন পথটা কিছুটা হলেও সহজ করে দিয়েছে এই কন্যাশ্রী। এইখানেই সার্থকতা এই প্রকল্পের। মুক্তা এবং কন্যাশ্রী যেন একে অপরের পরিপূরক। কন্যাশ্রীর জন্য যেমন মুক্তা এগিয়ে যেতে পেরেছে, তেমনি সাফল্য উজ্বল হয়েছে কন্যাশ্রীরও।

তাই মুক্তা খাতুনের লড়াইকে কুর্নিশ জানাতে ভোলেনি রাজ্য সরকার এবং জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন। শুক্রবার জলপাইগুড়ির সরজেন্দ্রদেব রায়কত কলা কেন্দ্রে কন্যাশ্রী দিবসের মঞ্চে তাকে বিশেষভাবে সংবর্ধনা জানানো হয়। সভাধিপতি নূরজাহান বেগম তার হাতে তুলে দেন একটি ট্যাব, ট্রফি, শংসাপত্র এবং অন্যান্য উপহার। মঞ্চে তখন ছিলেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব, জলপাইগুড়ির সাংসদ বিজয়চন্দ্র বর্মণ-সহ অনেকেই। তাঁদের প্রতিক্রিয়া বলে দিচ্ছিল, কন্যাশ্রী মুক্তা ‘মুখ’ হয়ে উঠল মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পের।

অনুষ্ঠানের শেষে গৌতম দেব জানিয়েছেন, মুক্তাকে সরকারি ভাবে আর কী সাহায্য করা যায় তা তিনি দেখবেন। প্রয়োজনে তিনি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে তার পাশে দাঁড়াবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী।

এ দিকে সংবর্ধনা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মুক্তার মুখ থেকে তখন হাসির মুক্তো ঝড়ছে। সেই হাসি নিয়ে যাওয়ার পথে জানিয়ে গেল তার স্বপ্ন। উচ্চশিক্ষা শেষ করে একটি ভালো সরকারি চাকরি। নিজের জন্য নয়, যারা তার চলার কঠিন পথে প্রতিপদে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেই বাবা-মা-ভাইবোনেদের মুখেও যাতে হাসির মুক্ত ফুটিয়ে তুলতে পারেন সেই জন্য।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন