নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : ধর্মঘট, জাতীয় সড়ক অবরোধ, পুলিশের লাঠিচার্জ। জয়েন্ট ফোরামের ডাকা চা শিল্পে ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে এই ছিল জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং এর চিত্র। মঙ্গলবার আর শান্ত রইল না আন্দোলন।

ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সোমবার এবং মঙ্গলবার চা শিল্পে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল ২৪টি শ্রমিক সংগঠনের যৌথ মঞ্চ বা জয়েন্ট ফোরাম। পাশাপাশি মঙ্গলবার উত্তরের চা বলয়ে ১২ ঘণ্টা ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। গতকাল চা শিল্প ধর্মঘটে তেমন কোনো সমস্যা না হলেও মঙ্গলবার এই সাধারণ ধর্মঘটকে ঘিরেই ছড়াল অশান্তি। আন্দোলনকারীদের ওপর চলল পুলিশের লাঠি। সোমবারের মতো মঙ্গলবারও জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ারের অধিকাংশ চা-বাগানে কাজ হয়নি। সামান্য কিছু বাগানে আংশিক কাজকর্ম হয়েছে।

জলপাইগুড়ি বা আলিপুরদুয়ারের মতো শহরাঞ্চলে সাধারণ ধর্মঘটের প্রভাব ছিল সামান্যই। বেসরকারি যানবাহন সে ভাবে চলাচল না করলেও সরকারি বাস ছিল পর্যাপ্ত। সরকারি দফতর, স্কুল-কলেজ, বাজার সবই ছিল খোলা। যদিও চা বাগিচা অধ্যুষিত এলাকার দোকানবাজার ছিল সবই বন্ধ। অন্য দিকে শিলিগুড়ি বা দার্জিলিং-এ বন্‌ধের প্রভাব সর্বাত্মক ছিল বলে দাবি জানিয়েছে জয়েন্ট ফোরাম নেতৃত্ব।

মঙ্গলবার দুপুরে জলপাইগুড়ির গোশালা মোড়, সোনগাছি চা বাগানের মোড়-সহ বেশ কয়েক জায়গায় রাস্তা অবরোধ করেন বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকরা। গোশালা মোড়ে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করে রেখেছিলেন করলাভ্যালি ও ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানের কয়েকশো শ্রমিক। জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় তৈরি হয় ব্যাপক যানজট। অবরোধ উঠিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয় পুলিশের তরফে। তাতেও কাজ না হওয়ায় জোর করে হটিয়ে দেওয়া হয় অবরোধকারীদের। জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতির নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ করে পুলিশ ও র‍্যাফ। পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি জানিয়েছেন, মদ খেয়ে কিছু মানুষ আন্দোলনের নামে পুলিশের ওপর মারমুখী হওয়াতেই লাঠিচার্জ করতে হয়েছে, যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আন্দোলনকারীরা।

করলাভ্যালি চা বাগানের শ্রমিক নেতা রাজু সাহানির অভিযোগ, বিনা প্ররোচনায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর লাঠি চালিয়েছে পুলিশ। আক্রমণের হাত থেকে বাদ যায়নি মহিলারাও। পরে সেখান থেকে ৩০ জনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার দাবিতে কতোয়ালি থানার সামনে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন বন্‌ধ সমর্থনকারীরা। সেখানেও পুলিশ মৃদু লাঠি চালায় বলে অভিযোগ, যাতে আহত হন সিপিএম-এর জেলা সম্পাদক সলিল আচার্য, প্রাক্তন সাংসদ জিতেন দাস। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বুধবার প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়েছে জয়েন্ট ফোরাম। ফোরামের অন্যতম মুখপাত্র জিয়াউল আলম জানিয়েছেন, বুধবার জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং দার্জিলিং-এর সমস্ত থানা ঘেরাও করা হবে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে। গ্রেফতার হওয়া আন্দোলনকারীরা পরে জলপাইগুড়ি আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান।

এই উত্তাপ থেকে বাদ যায়নি পাহাড়ও। মঙ্গলবারের সাধারণ ধর্মঘটকে সমর্থন জানিয়ে রাস্তায় নেমেছিল মোর্চা। মোর্চা সমর্থকদের হাতে বেশ কিছু পর্যটক হেনস্থা হন বলে অভিযোগ। দার্জিলিং-এর চকবাজারে পুলিশের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন মোর্চা সমর্থকরা। সেখানেও লাঠিচার্জ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে র‍্যাফ ও পুলিশ।

আগেই এই ধর্মঘটের বিরোধিতা করে তা থেকে সরে আসার আবেদন জানিয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জয়েন্ট ফোরাম নেতৃত্বের অভিযোগ, রাজ্য সরকারের এই মনোভাব বুঝেই আন্দোলনকারীদের ওপর মারমুখী হয়েছে পুলিশ।

তবে এই দু’দিনের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আদতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবি কতটা পূরণ হবে তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। জয়েন্ট ফোরামের অন্যতম নেতা মণিকুমার ডার্নালের দাবি, বারবার আলোচনার নামে প্রহসন হচ্ছে। তাই রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় ছিল না। অন্য দিকে বাগানমালিকদের সংগঠন ইন্ডিয়ান টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর উত্তরবঙ্গ শাখার উপদেষ্টা অমিতাংশু চক্রবর্তীর দাবি, আলোচনার টেবিলেই এর সমাধান সম্ভব। এই ভাবে ধর্মঘট-আন্দোলনের ফলে চা শিল্পেরই ক্ষতি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে চলতি মাসেই ফের একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডেকেছে রাজ্য শ্রম দফতর। সেই বৈঠক থেকে কোনো সমাধান সূত্র বের হয় কিনা এখন তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন উত্তরের এই প্রধান শিল্প চা বাগিচার সঙ্গে যুক্ত প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ শ্রমিক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন