civic-police
janyata-mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

মাত্র ১৪১ টাকা ৮৫ পয়সাই কি সংসার চলে?

হয়তো এমনটাই হতে পারত এই নিবন্ধের শিরোনাম। কিন্তু সে চিন্তায় হুড়মুড়িয়ে ঠোক্কর খাচ্ছে মধ্যমগ্রামে সিভিক পুলিশের হাতে মার খেয়ে হেলমেটহীন স্কুটার আরোহীর মৃত্যুর অভিযোগ। তাই আপাতত ওই প্রশ্ন তোলা থাক শিকের কোনো এক খাঁজে। সময় মতো না হয় পেড়ে ফেলা যাবে।

তার আগে বলে নেওয়া যেতে পারে প্রতিবেদকের তরতাজা এক সিভিক-স্মৃতি। ক’দিন আগেই সপরিবারে মুম্বাই থেকে ফিরছিলেন সুবলবাবু। দমদম বিমানবন্দরে নেমে তিনি একটি ভাড়ায় নেওয়া মারুতি ওমনি ভ্যানে  ফিরছিলেন বরানগরের বাড়িতে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে দক্ষিণেশ্বরে নামতেই। নীল জামা পরা সিভিক ভলান্টিয়ার পায়ে পরা চটির আওয়াজ তুলে এগিয়ে এলেন। চালককে বললেন, গাড়ির কাগজ দেখাতে। মারুতিটির বয়স জনিত কারণে রংচটা বুড়ো শারীরিক গঠনই হয়তো লালায়িত করে তুলতে পারে সিভিকবাবুকে। তা চালক কাগজ দেখালেন। সন্তুষ্ট হলেন না তিনি। বললেন, লাইসেন্স। তাও দেখানো হল। তা হলে এবার।

-আচ্ছা, ওই বড়ো বড়ো ব্যাগগুলোতে কী আছে। প্ৰশ্ন করলেন সিভিকবাবু।

-শীতের জিনিসপত্র, জানালেন আরোহী।

-না, এটা তো কমার্শিয়াল গাড়ি নয়। এতে মালপত্তর বইতে পারবেন না। গাড়ি সাইট করুন, সার্চ করব-নির্দেশ দিলেন সিভিকবাবু।

আরোহী-চালক বনাম সিভিকবাবু বিতণ্ডা চড়তে শুরু করতেই দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মী চলে এলেন। সামান্য় কিছু শুনেই হুমকি দিলেন তিনি- লাইসেন্স কেড়ে রেখে দেব। কোর্ট থেকে ছাড়িয়ে নিস।

মানে বাপ-তুল্য চালক নিমেষে তুই ‘বনে’ গেলেন ওই পুলিশকর্মীর কাছে।

ভয়ে থতমত সুবলবাবু আর লাইসেন্স হারানোর আতঙ্কে থরহরিকম্প চালক। মোবাইল বের করে গাড়ির মালিককে ফোন করলেন তিনি।

গাড়ির মালিক নেহাতই এক ছোটো মাপের ব্যবসায়ী, তাঁর পায়ের চটি সিভিকবাবুর থেকেও ক্ষয়মান। তবে শাসক দলের চেনা মুখ। তিনি সাইকেল থেকে নেমে বললেন, এয়ার পোর্টে এত চেকিংয়ে কিছু ধরা পড়ল না আর আপনি বলছেন লাগেজ চেক করবেন । দেখুন এখনও ট্য়াগ লাগানো আছে।

ততক্ষণে সেখানে হাজির পুলিশ কর্মীর ‘বস’। তিনি কয়েকটা যুক্তি দেওয়ার পরই গাড়ির মালিক বললেন, ঠিক আছে দাদা, এই লাগেজগুলো আপনি রেখে দিন। আমি থানা থেকে এগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে আসব।

না, আর কথা বাড়াতে হল না। উসখুসে কিছু বাক্য নির্গত করে ছেড়ে দেওয়া হল গাড়িটিকে, লাগেজ সমেত।
থানার কথা বলতেই এমন কাণ্ড ঘটল কেন? এই কেস থানা পর্যন্ত গড়ালে যে কোনো যুক্তিই খাড়া করা যাবে না। তার মানে রাস্তার মোড়ে খাড়া এই সব সিভিকবাবু আর তাঁদের বস-রা যা ঘটিয়ে চলছেন সে সব নেহাতই টাকা কামানোর জলবৎ তরলং ধান্দা ছাড়া আর কিছু নয়।

এবার আসা যাক, ১৪১ টাকা ৮৫ পয়সায়।
পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তি বলেছে, সিভিক ভলান্টিয়ার পদের জন্য আবেদন করতে হলে নিম্নলিখিত যোগ্যতামান থাকা আবশ্য়ক-
১। যে অঞ্চলের জন্য আবেদন করছেন সেই থানা এলাকার বাসিন্দা হতে হবে।
২। ন্যূনতম বয়স ২০ এবং সর্বোচ্চ বয়স ৬০ বছর হতে হবে।
৩। ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণী পাশ।
৪। ক্রীড়া দক্ষতা বা এনসিসি, বয় স্কাউট, এনএসএস গাইড, সিভিক ডিফেন্স ভলান্টিয়ার্স-এ অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থাকলে বাড়তি গুরুত্ব।
৫। কোনো থানাতেই প্রার্থীর নামে ফৌজদারি মামলা থাকলে চলবে না।
৬। শারীরিক বা মানসিক ভাবে সুস্থ হতে হবে।

যে রাজ্যে বছরে রেকর্ড সংখ্যক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী জলের তোড়ে নির্গত হচ্ছে, সেই রাজ্যে এই সাধারণ যোগ্যতামানের প্রার্থী যে থইথই করবে তা বলাই বাহুল্য। তবে কর্মসংস্থান বা বেকারত্ব সমস্যার মতো ভাবগম্ভীর বিষয় নিয়ে আলোচনা পাড়লে রাজনীতি ঢুকে পড়তে পারে। ঢুকে পড়তে পারে কী ভাবে এলাকার প্রভাবশালী নেতা তাঁর ঘনিষ্টজনদের সিভিক ভলান্টিয়ারে বেমালুম নিয়োগ করে চলেছেন, সে সব কথাও। ফলে ইচ্ছে না করলেও এড়িয়ে চলাই ভালো। কিন্তু ওই লিখিত যোগ্যতামান দেওয়ালে টাঙানো থাকলেও সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগের পর তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এখনও নেই কোনো নিয়ম-কানুনের গেরো। শুধু এটুকুই সত্য- কাজ করো, বদলে রোজ পাও ওই ১৪১ টাকা ৮৫ পয়সা। কাজটা কী?

শিরোনামেই স্পষ্ট- স্রেফ তোলাবাজি, অন্তত পাবলিকে তাই বলে। কী ভাবে চলবে ওই তোলাবাজি। না তার কোনো বাঁধাধরা পরিসর নেই। যেখানে পারো, যে ভাবে পারো তোলাবাজি করো, তোলাবাজিতে মদত দাও। শুধু তোলাবাজি-ধর্মকে মসৃণ পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যবহার করো পুলিশের নাম। সিভিক ভলান্টিয়ার শব্দবন্ধকে গায়েব করে গায়ে লেবেল লাগিয়ে নাও সিভিক পুলিশের। তা হলেই কেল্লাফতে। আর বিপদে পড়লে স্মরণ নাও সেই খঁকি উর্দিধারীর, যিনি গাড়ির হর্ন শুনতে পেলেই তোমাকে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ইশারা করেন।

পাঠক মাফ করবেন, রাজ্যের প্রায় দেড় লক্ষ সিভিক পুলিশ যখন স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছেন, তখন এই ধরনের এক বগ্গা প্রতিবেদনের কোনো দরকার ছিল না বলেই মনে হয়। কিন্তু মধ্য়মগ্রামের ওই ৫০ বছরের হেলমেটহীন মাথাওয়ালা মানুষটারও যে দুই নাবালক মেয়েকে পিতৃহীন করে চলে যাওয়ার কোনো দরকার ছিল না!

বি. দ্র. ৭০০ সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করছে কলকাতা পুলিশ । আবেদন জমা করার শেষ তারিখ-২৫ জানুয়ারি, ২০১৮।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন