didhitiদীধিতি ঘোষ

গুয়াতেমালার সাহিত্যে যাঁর অবদান কখনও ভোলার নয়, সেই মিগেল আঙ্গেল আস্তুরিয়াসকে কলকাতার পাঠকের কাছে আরও সঠিক ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন সে দেশের রাষ্ট্রদূত খিওবান্নি কাস্তিয়ো। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ যতটা বাংলার কাছে প্রিয়, ঠিক ততটাই আস্তুরিয়াস প্রিয় গুয়াতেমালার মানুষের কাছে। এ বারের কলকাতা বইমেলায় তাঁকে ঠিক পরিচিত করানো গেল না বলে মার্জনা চাইলেন রাষ্ট্রদূত। জানিয়ে দিলেন, আর কখনও এই ভুল হবে না।

কলকাতা বইমেলায় এ বার আসতে পারেনি গুয়াতেমালা। অথচ মধ্য আমেরিকার এই ছোট্টো দেশটির রয়েছে এক সুদৃঢ় সাহিত্যিক ঐতিহ্য, যা অনেকেরই অজানা। সেই প্রেক্ষাপটেই  বইমেলায় কোস্তা রিকা প্যাভিলিয়নে আয়োজন করা হয়েছিল সাহিত্য-সমৃদ্ধ এক কথোপকনের আসর।

খিওবান্নি কাস্তিয়ো বলেন, মায়া সভ্যতা ও সাহিত্যচর্চার এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটেছে গুয়াতেমালায়। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার অনেক আগে থেকেই এই সভ্যতায় রয়েছে বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার, যা বহু বছর বাদে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গাগুলো চিনতে শুরু করে। বিজ্ঞান, শিল্প, নির্মাণকৌশল, জ্যোতির্বিদ্যা, কৃষিবিদ্যা ইত্যাদি নানাবিধ চর্চায় সম্পূর্ণ এ দেশের প্রথম সাহিত্যকীর্তি ‘পোপোল বুহ’, কিচে ভাষায় যার অর্থ ‘উপদেশ-গ্রন্থ। এই গ্রন্থটিকে অনেক সময় মায়ানদের ‘বাইবেল’ বলা হয়ে থাকে।

–গুয়াতেমালা শব্দটির অর্থ ‘সবুজে সজ্জিত দেশ’। এই নামকরণের পিছনে কি কোনো বিশেষ কারণ আছে?

নিশ্চয়ই। গুয়াতেমালা এমন একটি দেশ, যেখানে গাছপালা রক্ষায় নিয়মিত উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেশ কিছু জায়গায় সরকারি ভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া শুধু গাছপালাই নয়, জীবজন্তু সংরক্ষণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

–গুয়াতেমালার একমাত্র নোবেলজয়ী সাহিত্যিক মিগেল আঙ্গেলা কাস্তুরিয়াস সম্পর্কে কিছু বলুন।

১৯৬৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পান আস্তুরিয়াস। সেই সময়ের ‘বুম জেনারেশনের’ এক অনন্য অংশ। তাঁর লেখায় লাতিন আমেরিকার ‘মডার্নিজমের বীজ ব্যপ্ত রয়েছে। আস্তুরিয়াস নোবেল পান তাঁর উপন্যাস ‘এল সেনর প্রেসিদেন্তে’-র জন্য। তাতে গুয়াতেমালার এক সময়ের প্রেসিডেন্ট মানুয়েল এসত্রাদা কাবরেরার একনায়কতন্ত্র ও তখনকার সমাজের ছবি ফুটে ওঠে। তবে হ্যাঁ, আস্তুরিয়াসের সব লেখাই যে সহজে মেনে নেওয়া হয়েছে তা নয়। রাজনৈতিক কারণে তাঁর অনেক অতুলনীয় রচনা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গিয়েছে। বলা বাহুল্য ১৯৭১-এ নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদার সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এঁরা একে অপরকে সাহায্য করেছেন। মজার কথা, এঁদের চেহারার মধ্যে অদ্ভুত সাদৃশ্য অনেক সময়ে এঁদের প্রাণ বাঁচানোর সহায়ক হয়েছে। পরে ‘কোমিয়েন্দো এন উনগ্রিয়া’ নামে একটি রসনাগ্রন্থ দু’ জনে মিলে প্রকাশ করেন, কারণ দু’ জনেই ছিলেন খাদ্যরসিক।

‘লা ত্রিলোজিয়া বানানেরা’ (দ্য বানানা ট্রিলজি) আস্তুরিয়াসের এক অনন্য রচনা। এটি তিনটি নভেলের সমন্বয় – ‘বিয়েন্তো ফুয়েরতে’ (১৯৫০), ‘এল পাপা ভেরদে’ (১৯৫৪) এবং লস এখোস দে  লস এনতেররাদোস (১৯৬০)। এই সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি লেনিন পিস প্রাইজ পান ১৯৬৫ সালে।

কাস্তিয়োর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এখনও মায়া সভ্যতার ২৩টি ভাষা ব্যবহৃত হয় গুয়াতেমালায়। এই স্বদেশীয় গোষ্ঠীগুলির জন্য কি কোনো বিশেষ ব্যবস্থা আছে তাঁদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য।

কাস্তিয়ো জানালেন, দেশে এমন কিছু আইনজীবী আছেন যাঁরা মায়া ভাষায় পারদর্শী। তাঁরা যে কোনো মামলা মোকদ্দমায় এঁদের পাশে দাঁড়ান। তা ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে এঁদের জন্য নানা ধরনের ভেষজ ও আয়ুর্বেদিক ওষুধপত্র পাওয়া যায়।

ভারত ও গুয়াতেমালার মধ্যে কোনো খুঁজে পাচ্ছেন কি, এই প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বললেন, প্রাচীনকালে হিন্দুদের মতো মায়া সভ্যতাতেও চন্দ্র, সূর্য, পবন ইত্যাদির দেবতার আরাধনা করা হত। এর মধ্যে তিন বিশিষ্ট দেবতা হলেন সৃষ্টির দেবতা, প্রতিষ্ঠার দেবতা এবং শিক্ষার দেবতা। তা ছাড়া বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই যেমন ভারতের মূল সুর, গুয়াতেমালাতেও তাই।

ছবি : শৌর্য মেউর  

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন