খবর অনলাইন : প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বলে কথা। তা পূরণের জন্য যদি গৌরী সেনের কাছ থেকে টাকা ধার নিতে হয় তো নিতে হবে!

দেশের প্রায় পঁচিশ শতাংশ অংশ এখন তীব্র জলকষ্টে ভুগছে। দেনার দায় চাষিদের আত্মহত্যা তো লেগেই আছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। দেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ গরিব। কিন্তু প্রশ্ন যখন ভারতের সাথে ইয়োরোপ-আমেরিকা-জাপানের পাল্লা দেওয়া, তখন এই মানুষদের কথা আর কে মনে রাখে! তখন এক মাত্র বুলেট ট্রেন, সেমি-বুলেট ট্রেনই হয় উন্নয়নের মাপকাঠি। হোক না তার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ! কিছু দিন আগেই চালু হয়েছে দিল্লি আর আগ্রার মধ্যে সেমি-বুলেট ট্রেন গতিমান এক্সপ্রেস। এ বার বুলেট ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে চলেছে মোদী সরকার।

আগে থেকেই ঠিক আছে, প্রথম বুলেট ট্রেন চালানো হবে মুম্বই আর আমদাবাদের মধ্যে। মোট ৫০৮ কিমি দূরত্বের মধ্যে ২১ কিমি যাবে মুম্বইয়ের কাছে ঠানে ক্রিকের তলা দিয়ে। এর জন্য টানেলও বানানো হবে জলের তলায়। আর বাকি দূরত্বের জন্য তৈরি করা হবে এলিভেটেড করিডোর। ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ৩৫০ কিমি। এই পুরো প্রকল্পে প্রাথমিক ভাবে খরচ ধরা হয়েছে ৯৭৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮১ শতাংশ টাকা অর্থাৎ ৭৯১২৩ কোটি টাকা জাপানের কাছ থেকে ঋণ হিসাবে নেওয়া হবে ৫০ বছরের মেয়াদে। ঋণ শোধ করার জন্য ১৫ বছরের ছাড় আছে। আর সুদ দিতে হবে ০.১ শতাংশ হারে। জাপানের সঙ্গে ঋণ চুক্তি অনুযায়ী সিগন্যালিং ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যে সব সরঞ্জাম লাগবে তা এবং ট্রেন সে দেশ থেকে আমদানি করতে হবে।

বুলেট ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা যাতে দ্রুত বাস্তবায়িত করা যায় তার জন্য নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অরবিন্দ পানাগরিয়ার নেতৃত্বে একটি যৌথ কমিটি গড়া হয়েছে। এই কমিটিতে আরও যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা হলেন কেন্দ্রের শিল্পনীতি ও উন্নয়ন দফতর, অর্থনৈতিক বিষয়ক দফতর ও বিদেশ মন্ত্রকের সচিবরা এবং রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান। বুলেট ট্রেন নিয়ে কথা বলতে এঁরা গত ফেব্রুয়ারিতে এক প্রস্ত জাপান ঘুরে এসেছেন। আরও আলোচনার জন্য আবার যাবেন সামনের মাসে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ২০১৮-তেই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যাবে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্পের কাজ দ্রুত চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ৫০০ কোটি টাকার পেড-আপ ক্যাপিটাল দিয়ে ইতিমধ্যেই ন্যাশনাল হাই স্পিড রেল কর্পোরেশন নামে একটি কোম্পানি খুলেছে রেল। এতে রেলের ৫০ শতাংশ শেয়ার আছে। মহারাষ্ট্র ও গুজরাতের আছে ২৫ শতাংশ করে।

এই প্রকল্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্মান জড়িত। সুতরাং সব কাজ ফেলে, তা সে যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, এর কাজ যে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যায়। কাদের জন্য এত হাজার কোটি ধার করে এই প্রকল্প রূপায়িত হচ্ছে ? ভারতের কত শতাংশ মানুষ এতে উপকৃত হবেন ? মনে রাখা উচিত, দেশে জলসংকট কিন্তু স্থায়ী আকার ধারণ করছে এবং তা দেশের সেই সব প্রান্তেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে আপাতদৃষ্টে এখন জলসংকট নেই। এই জলসংকটের জন্য কিন্তু বৃষ্টির খামখেয়ালিপনাকে দুষে কোনও লাভ নেই। আমাদেরই অবিমৃশ্যকারিতার জন্যই আজ এই অবস্থা। ভবিষ্যতে কী হতে পারে চিন্তা না করে লাগামছাড়া ভাবে মাটি থেকে জল টেনে চলেছি। নদীর স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ করে, বাঁধ দিয়ে তার প্রবাহ আটকে দিয়েছি। চোখের সামনে নদীগুলো শুকিয়ে মাঠ হয়ে গিয়েছে, আমরা হাত গুটিয়ে বসে থেকেছি। দিনের পর দিন হাজার হাজার জলাশয় বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে, আমরা প্রতিবাদ করিনি। আজও বিকল্প শক্তি সন্ধানে তৎপর না হয়ে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে চলেছি, যা ঠান্ডা করতে রোজ লক্ষ লক্ষ গ্যালন জল লাগে। বৃষ্টির জল গড়িয়ে চলে যায়, তা ধরে রাখতে কাজের কাজ কিছুই করিনি। শুধু রেনওয়াটার হারভেস্টিং নিয়ে বড়ো বড়ো কথা বলেছি।

জলসমস্যা সমাধানে অচিরেই দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভারত এক গভীর সংকটে পড়বে। এটা কি আমাদের রাজনীতির মাথারা আর প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বুঝছেন না, নাকি বুঝতে চাইছেন না ? এমন দিন হয়তো এক দিন আসবে, যে দিন হাতে গোনা দু-চারটে লোক বুলেট ট্রেনে চড়ে দু’ ঘণ্টায় মুম্বই থেকে আমদাবাদ পাড়ি দেবে আর কোটি কোটি ভারতবাসী (শুধু গরিবগুর্বো মানুষজনই নয়, নিম্নবিত্ত- মধ্যবিত্তরাও) হা জল হা জল করে বুক চাপড়াবে।


মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here