কুমোরটুলিতে কর্মব্যস্ত মালা পাল 

smitaস্মিতা দাস

২০১৬-এর রিও অলিম্পিক। ভারতের তিনকন্যা – সিন্ধু, সাক্ষী, রূপা দেখাল মেয়েদের ক্ষমতা আর ইচ্ছাশক্তি। বলতে গেলে আজ আর কোনো কিছুতেই পিছিয়ে নেই দুর্গা, সীতার জাত। চাইলে কিনা করতে পারেন তাঁরা। গবেষণা থেকে মহাকাশ যাত্রা, পর্বতারোহণ থেকে মাটির কাজ সব, সব কিছুতেই তাঁদের দারুণ দক্ষতা। দৃপ্ত পদচারণা। অপালা, লোপামুদ্রা থেকে লক্ষ্মীবাই, সুনীতা চাওলা। এঁরা সবাই আজ ইতিহাস হলেও এঁদের কর্মকাণ্ড সবই বাস্তব। তার প্রমাণ আগেও ছিল, আজও রয়েছে ভূরি ভূরি। হয়ত কেউ এসেছেন সকলের সামনে, আবার কেউ রয়ে গেছেন ইতিহাসের আড়ালে। মেয়েদের এতো সাফল্য সত্ত্বেও তাঁরা রয়েছেন বঞ্চনার অন্ধকারে। আজও মেয়েদের মরে যেতে হয় অঙ্কুরেই।

যাক সে সব কথা। সে তো ভিন্ন প্রসঙ্গ। যে কথা বলতে গিয়ে এত গৌরচন্দ্রিকা, সেদিন গিয়েছিলাম কুমোরটুলি পাড়ায়। দেখলাম সেখানেও ছবিটা অনেকটা একই। পাল বংশে এখন কেবল রাজা নয়, রানিরাও রীতিমতো দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছেন। তাঁদের কেউ জিতেছেন স্টেট-ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, কেউ বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পৌরোহিত্যের জন্য ডাক পাচ্ছেন প্রায় দিন, আবার কাউকে নিয়ে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্র।

কেউ প্রয়োজনের তাগিদে, কেউ রক্তে, বিবাহ-বন্ধনে পেয়েছেন প্রতিমা তৈরির মন্ত্র। শামিল হয়েছেন এই সুন্দর ব্রতে। 

ভেবেছিলাম পুজোর মুখে, একদম মহালয়ার আগের দিন দারুণ ব্যস্ত সবাই। হয়তো কেউ সময়ই দিতে পারবেন না। কিন্তু না। কিছু জানতে চাওয়া মাত্রই তাঁরা উজাড় করে ঢেলে দিলেন নিজেকে। তা সে দুঃখের গাথাই হোক বা সাফল্য – একান্ত আলাপনে অন্তর মহল থেকে অন্দর মহল খুলে দিলেন জবা পাল, সন্ধ্যা পাল, কাকলি পাল, চায়না পাল, মালা পালসহ অনেকেই।

এঁদের বেশিরভাগ তৈরি করছেন সাবেক প্রতিমা। হিসেব করে দেখলে দেখা যাবে, সারা কুমোরটুলি থেকে যত ঠাকুর প্রতি বছর পুজোর উদ্দেশ্যে রওনা হয় তার একটা বড়ো অংশই তৈরি হয় এই মহিলা শিল্পীদের ছাতার তলায়।

কুমোরটুলির খ্যাতনামা মালা পাল। বিদেশের বাজারেও পাড়ি জমিয়েছে তাঁর মাটি মাখা হাতে তৈরি ছোটো দুর্গা। দুবাই থেকে শুরু করে আরও বহু দেশে পৌঁছে গেছে তাঁর সৃষ্টি। স্টেট অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড আরও অনেক সম্মানে উপচে পড়ছে তাঁর ডালা। এমনকি ২৭ মিনিটের তথ্যচিত্রও তৈরি হয়েছে তাঁকে নিয়ে। কাজের মধ্যে তাঁর সংসার, সংসারের মধ্যেই তাঁর কাজ – মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।  

chaina-pal
চায়না পাল

চায়না পাল জানালেন, প্রতি বছর বহু জায়গায় বিশেষ অতিথি হিসেবে যেতেই হয় তাঁকে। ফলের পুজোর শুরুটা বেশ ব্যস্তই থাকেন। তবে সারা বছর নানা প্রতিমা বানানোর চাপটাও কম নয়। বললেন, প্রতিমা তৈরির হেন কাজ নেই যা তিনি পারেন না। ছোটো থেকেই দেখছেন বাবাকে। পরে জীবনের কঠিন সময়ে সেই দেখে শেখা কাজটাই কাজে লেগে গেল। বদলে দিল তাঁর জীবন। 

kakoli-pal
কাকলি পাল

কাকলি পালের দু’টি কন্যা। স্বামী মারা যাওয়ার পর কন্যাদের নিয়ে আতান্তরে পড়েন। অবলম্বন করেন প্রতিমা গড়ার কাজকেই। তারপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। বড়ো মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ধুমধাম করেই। ছোটোটি এখনও স্কুলে। জানালেন আগের থেকে ঠাকুরের বায়না অনেক বেশি পান। বড়ো মেয়ের ইচ্ছা, বাবা-মায়ের এই কাজ বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। সে-ও শিখেছে মায়ের কাছ থেকে।

sondhya-pal
সন্ধ্যা পাল

তবে সন্ধ্যা আর জবা পালের অবস্থা আলোকিত পৃথিবীর অপর প্রান্তের মতো। সারা বছর সংসার আর নিজের ভরণপোষণ করতে হাত পৌঁছে যায় এ যুগের শাইলকের কাছে। অবলম্বন করতে হয় অন্য মরশুমী কাজ কারবার। দারিদ্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভেসে গেল তাঁদের গাল-গলা। তবে চোখ মুছে দু’জনেই বললেন, “হার মানব না, যুদ্ধ চালিয়ে যাব। এই কাজ না দিক সম্মান, নাই দিক অর্থ। তবু ভালোবেসে এই কাজ করে যাব, যতদিন ক্ষমতা থাকবে।”   

joba-pal
জবা পাল

কুমোরটুলি পাড়ায় এছাড়াও আছেন সুচন্দ্রিমা পাল, মীনাক্ষী পালের মতো তাবড় শিল্পীরা। যাঁরা নিজে হাতে ঠাকুর গড়ছেন, বা তঁদের তত্ত্বাবধানেও তৈরি হচ্ছে  অনেক ঠাকুর।

কী জানি, অতীতের প্রতিভাময়ী নারীদের মতো হয়তো আগামী ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে এঁদের কারও নাম। রইলাম প্রতীক্ষায়।  

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন