আজ অনাড়ম্বর ভাবেই পালিত হচ্ছে পানিহাটির চিঁড়াদই উৎসব

    আরও পড়ুন

    শুভদীপ রায় চৌধুরী

    বাংলার এমন কিছু সংস্কৃতি বা পরম্পরা রয়েছে যা আমরা মোটামুটি ভাবে অনেকেই মেনে চলি। যেমন সরস্বতী পুজোয় আর দুর্গাষ্টমীর দিন অঞ্জলি দেওয়া কিংবা কালীপুজোর দিন সারা দিন উপবাস করে পুজোর কাজ করা। ঠিক তেমনই প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীতে ভক্তরা ভিড় করেন পানিহাটিতে, সঙ্গে একটি পাত্রে চিঁড়ে আর দই নিয়ে। তাঁদের বিশ্বাস, সেই প্রসাদ গ্রহণ করেন স্বয়ং মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব ও প্রভু নিত্যানন্দ। তবে এ বছর এই তিথি এক মাস পিছিয়ে আষাঢ় মাসে পড়েছে। আজ ২৩ জুন বুধবার সেই তিথি। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে এ বছর অনাড়ম্বর ভাবেই পালিত হচ্ছে এই চিঁড়াদই মহোৎসব। ভক্তসমাগম নেই বললেই চলে।

    Loading videos...

    প্রসঙ্গত এই উৎসব নিয়ে আলোচনার আগে পানিহাটি অঞ্চল নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ‘পানিহাটি’ নামটি বহু প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়। যেমন কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’, বিপ্রদাস পিপলাইয়ের ‘মনসামঙ্গল’, জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ ইত্যাদি। শ্রীচৈতন্য আর নিত্যানন্দের পদধূলিধন্য এই পানিহাটি। তবে শুধু মহাপ্রভু আর নিত্যানন্দই নন, পানিহাটির মাটিতে পা রেখেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এবং পরবর্তী কালে মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ।

    পানিহাটির নাম ও খ্যাতি

    - Advertisement -

    কিন্তু এই অঞ্চলের নাম ‘পানিহাটি’ কেন, তা নিয়ে বিস্তর তর্ক রয়েছে ঐতিহাসিক মহলে। কেউ কেউ মনে করেন যে এই অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে বিখ্যাত ছিল বলে এই জায়গার নাম ছিল ‘পণ্যহট্ট’। সেই ‘পণ্যহট্ট’ কালক্রমে হয়ে যায় ‘পানিহাটি’। আবার অনেকের মতে যশোরের ‘পেনেটি’ ধানের সরবরাহ এখান থেকেই করা হত বলে জায়গার নাম ছিল ‘পেনেটি’, সেখান থেকে ‘পানিহাটি’। তবে পানিহাটি চৈতন্যদেবের বহু আগে থেকেই প্রসিদ্ধ ছিল শৈব ও শাক্ত সাধকদের ভজনপীঠ হিসাবে।

    পানিহাটি শ্রীচৈতন্য মন্দির।

    এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধির আরও একটি কারণ হল পঞ্চচূড়া বিশিষ্ট রাসমঞ্চ ও রাধাগোবিন্দ মন্দির। এই মন্দির-সহ রাসমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশধর গৌরীচরণ রায় চৌধুরী। এ ছাড়াও এই পানিহাটিতেই জন্মেছিলেন হাংরি আন্দোলনের শ্রষ্ঠা সমীর রায় চৌধুরী এবং তাঁর ঠাকুরদা লক্ষ্মীনারায়ণ রায় চৌধুরী (ভারতবর্ষের প্রথম ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার)। এ ছাড়াও পানিহাটিতে রয়েছে কাঠিয়াবাবার আশ্রম, ঘোলাবাজার মসজিদ, বালক ব্রহ্মচারীর আশ্রম, বেগম রোকেয়ার সমাধি ইত্যাদি।

    দণ্ডমহোৎসব

    তবে আজ পানিহাটির নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার সব চেয়ে বড়ো কারণ হল, এখানকার বিখ্যাত চিঁড়াদই উৎসব বা দণ্ডমহোৎসব। ৫০০ বছরেরও বেশি আগে শুরু হওয়া এই উৎসব আজও সমান ভাবে অটুট রয়েছে। ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য পুরীধামে যাওয়ার আগে পানিহাটিতে এসেছিলেন। মহাপ্রভুর পদার্পণের দু’ বছর পরে পানিহাটির মাটিতে পা রাখেন নিত্যানন্দ। শুরু হয় দণ্ডমহোৎসব।

    তবে এই দণ্ডমহোৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও এক জনের নাম, তিনি হলেন সপ্তগ্রামের জমিদার রঘুনাথ গোস্বামী। রঘুনাথের শিক্ষাগুরু ছিলেন আচার্য বলরাম দাস। এই বলরাম দাস হলেন হরিদাস ঠাকুরের প্রিয় শিষ্য। হরিদাস মাঝেমাঝেই আসতেন বলরামের গৃহে আর শোনাতেন মহাপ্রভুর কথা। রঘুনাথের সুযোগ হয়েছিল সেই কথা শোনার। হরি-কথা শুনে থাকতে না পেরে রঘুনাথ ছুটে গেলেন অদ্বৈতাচার্যের বাড়িতে মহাপ্রভুকে দেখতে। অদ্বৈতপ্রভুর গৃহে প্রথম সাক্ষাৎ পেলেন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের। লুটিয়ে পড়লেন তাঁর পায়ে। আর প্রভু তাঁকে উঠিয়ে আলিঙ্গন করলেন। মহাপ্রভুর আদেশেই রঘুনাথ নিজের ঘরে ফিরলেন, তবে তাঁর মনে যেন পড়ে রইল প্রভুর কাছে।

    চিঁড়াদই

    এর পর রঘুনাথ ভাবলেন প্রভু নিত্যানন্দের কৃপা না হলে গৌরদর্শন সম্ভব নয়। তখন ঠিক করলেন প্রভু নিত্যানন্দকে দর্শন করবেন। তাই রঘুনাথ তখন পিতামাতাকে বললেন, তিনি পানিহাটি যাবেন নামগান করতে। পানিহাটি তখন নিত্যানন্দের প্রভাবে আনন্দময়, ঘরে ঘরে শঙ্খধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে হচ্ছে হরিকীর্তন। রঘুনাথ দেখলেন গঙ্গার পাড়ে অশ্বত্থতলায় আলো করে বসে আছেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু। গিয়েই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন তাঁকে। দীর্ঘকাল প্রভুর দর্শনে আসতে না পারায় দণ্ড চাইলেন। নিত্যানন্দও দণ্ড দিলেন। কেমন সেই দণ্ড?

    রঘুনাথের দণ্ড

    রঘুনাথকে বললেন নিত্যানন্দ – “…নিকট না আইস চোরা ভাগ দূরে দূরে।/আজ লাগি পাইয়াছি দণ্ডিব তোমারে।।/ দধিচিড়া ভক্ষণ করাহ মোর গণে।/ শুনিয়া আনন্দ হইল রঘুনাথ মনে।…মহোৎসব নাম শুনি ব্রাহ্মণ সজ্জন।/আসিতে লাগিলা লোক অসংখ্য গণন।”

    অর্থাৎ প্রভুর সেবকদের চিঁড়েদই খাওয়ানোর দণ্ড পেলেন রঘুনাথ। সেই কথা শুনে রঘুনাথের তো আনন্দের শেষ নেই। চারদিকে খবর পাঠালেন চিঁড়েদই আনতে আর রঘুনাথ অর্থ দিয়ে সমস্ত দ্রব্য কিনতে লাগলেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে খবর পৌঁছে গেল, ছুটে এলেন ব্রাহ্মণরাও।  

    নিত্যানন্দ সপার্ষদ বসলেন চিঁড়েদই খেতে। নীচে বসলেন অভ্যাগত পণ্ডিত ভট্টাচার্যরা। আর যাঁরা গঙ্গার পাড়ে বসার জায়গা পাননি তাঁরা গঙ্গায় নেমে প্রসাদ সংগ্রহ করছেন। এ যেন এক মিলন উৎসবে পরিণত হল।

    রঘুনাথের দণ্ড।

    পানিহাটি শ্রীচৈতন্যের অন্তরঙ্গ পার্ষদ রাঘব পণ্ডিতের শ্রীপাট। সেই রাঘব পণ্ডিতকে নিত্যানন্দ বললেন, তাঁর ঘরে প্রসাদ হবে রাত্রে। এখন রঘুনাথের উৎসব চলবে। রাঘব পণ্ডিতকেও চিঁড়েদই প্রসাদ গ্রহণ করতে বললেন নিত্যানন্দ। সব শেষে নিত্যানন্দ ধ্যানে বসলেন আর গৌরসুন্দর সমস্ত কিছু জানতে পেরে উপস্থিত হলেন সেই স্থানে। প্রভু আসতেই হাজার হাজার ভক্ত হরিধ্বনি দিতে শুরু করলেন। সমস্ত উৎসব শেষ হলে নিত্যানন্দ রঘুনাথের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন যে এ বার গৌরসুন্দরের কৃপা পাবেন তিনি।

    এই ভক্তির উৎসব আজও পানিহাটিতে নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়। তবে উৎসব কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এ বার ভক্তসমাগম হবে না করোনার কারণে। সকালে মঙ্গলারতি দিয়ে উৎসব শুরু হয়েছে। তার পর প্রভুকে চিঁড়াদই নিবেদন করা হবে। তবে প্রতি বছর যে কীর্তনের মাধ্যমে সেই লীলা স্মরণ করা হয় সেই প্রথা এ বার বন্ধ থাকছে।

    আরও পড়ুন: শ্রীপাট খড়দহে শ্যামসুন্দরের দোল এক অন্য ঐতিহ্য বহন করে

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

    - Advertisement -

    আপডেট খবর