Connect with us

ধর্মকর্ম

কলকাতার চণ্ডীতলার প্রাচীন চণ্ডীমন্দিরে আজ পালিত হচ্ছে চণ্ডী মহোৎসব

দক্ষিণ কলকাতার চণ্ডীতলা। নিউ আলিপুর পেট্রোল পাম্প থেকে মাত্র দেড় কিমি দূরে এই সুপ্রাচীন মন্দির।

Published

on

চণ্ডীমন্দির, চণ্ডীতলা।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

দক্ষিণ কলকাতার চণ্ডীতলা। নিউ আলিপুর পেট্রোল পাম্প থেকে মাত্র দেড় কিমি দূরে এই সুপ্রাচীন মন্দির। আজ ২০ এপ্রিল এই মন্দিরের বার্ষিক মহোৎসব। প্রতি বছর এই মহোৎসবে কয়েক হাজার ভক্ত প্রসাদ পান। তবে এ বছর সমস্ত করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পালিত হচ্ছে উৎসব।

Loading videos...

কথিত আছে, এই চণ্ডীমন্দিরে এসেছিলেন ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের চাঁদ সওদাগর এবং শ্রীমন্ত সওদাগর। শুধুমাত্র চাঁদ সওদাগরই নন, এসেছিলেন তাঁর পুত্রবধু বেহুলাও, তাঁর মৃত স্বামী লখিন্দরের মৃতদেহ নিয়ে। এই চণ্ডীতলার পাশেই রয়েছে নেতিধোপানির ঘাট। বেশ কয়েকশো বছর আগে এমন ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান ছিল সুন্দরবনের অংশ।

লোকশ্রুতি, রাজা সিংহবাহুর পুত্র বিজয়সিংহ এই নদীপথ ধরেই ৭০০ অনুগামীকে নিয়ে সিংহল (আজকের শ্রীলঙ্কা) যাত্রা করেছিলেন। সুন্দরবনের এই সমস্ত এলাকা সেই সময় ছিল ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ, হিংস্র পশু ও বিষাক্ত পোকামাকড়ে ভর্তি। এর পশ্চিম দিকে একটি খাল যুক্ত হয়েছিল আদি গঙ্গার সঙ্গে। সেই সময়ে এই অঞ্চলের নাম ছিল ‘দ’ মোহিনী। নাবিক ও বণিকদের যাতায়াতের পথ ছিল এটি। সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার আগে এখানেই নোঙর করতেন এঁরা। ‘সাহা’ পদবির বণিকদের আধিপত্য ছিল বলে জায়গাটির নাম হয়ে উঠেছিল ‘পুঞ্জ সাহাপুর’।

কিন্তু যতই সাহাপুর নাম হোক না কেন, এই জায়গাটি ‘চণ্ডীতলা’ নামেই বেশি পরিচিত চিল। জাগ্রত দেবী চণ্ডীর মন্দিরের জন্যই। যে দেবী বণিকদের অভয় দিতেন, আশীর্বাদ করতেন বাণিজ্য সেরে নিরাপদে ফিরে আসার জন্য। সে জন্যই পাড়ি দেওয়ার আগে সকলেই পুজো দিতেন দেবী চণ্ডীকে। সেই সূত্রেই চাঁদ সওদাগর এসেছিলেন এখানে।

৪৭০ বছরেরও আগে ওলন্দাজরা বাণিজ্য করতে আসার আগে, গঙ্গা ছিল আরও ভয়ংকর। দিল্লির বাদশাহর অনুমতি নিয়ে ওলন্দাজরা খিদিরপুর থেকে মেটিয়াবুরুজ এবং বজবজ থেকে হাওড়ার সাঁকরাইল পর্যন্ত খাল কাটেন গঙ্গাকে সরস্বতী নদীর সঙ্গে যোগ করতে। তখন থেকে গঙ্গার মূল ধারা কালীঘাট আর বেহালা দিয়ে বয়ে চলে ‘আদিগঙ্গা’ নামে। ক্রমশ খাল শুকিয়ে যাচ্ছিল, শুকোচ্ছিল ‘দ’ মোহিনী আর ‘আদিগঙ্গা’। ১৭৭৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক অফিসার কর্নেল উইলিয়াম টলি আদিগঙ্গার এক পুরোনো সূত্র জাহাজ আর নৌকা যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ নিজের খরচে খুঁড়তে শুরু করেন। ১৭৭৭ সালে সম্পূর্ণ হয় সেই কাজ – নামকরণ হয় ‘টলি’জ নালা’। এই নালার সাহায্যে বিদ্যাধরী, মাতলা ইত্যাদি নদী যোগ হয়ে যায় কলকাতা বন্দরের সঙ্গে। সব মিলিয়ে কলকাতা আর পূর্বের খালগুলি ১,১২৭ মাইল দীর্ঘ হয় কিন্তু সে দিনও চণ্ডীমন্দিরের গৌরব এবং ঐতিহ্য অটুট ছিল।

মা চণ্ডীর বিগ্রহ, চণ্ডীমন্দির, চণ্ডীতলা।

প্রথম দিকে চণ্ডীমন্দির একটি আটচালা মন্দির থাকলেও পরবর্তীকালে আনুমানিক ১৯৬৯ সালে তা সংস্কার করা হয়। ১৯৭৪ সালে এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তৈরি হল ‘চণ্ডী মন্দির উন্নয়ন পরিষদ’।

কথা হচ্ছিল এই পরিষদের সভাপতি তারক সিং মহাশয়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন, প্রতি বছর বাসন্তী নবরাত্রির সময় অষ্টমীর দিন এক বিশেষ মহোৎসব পালিত হয়। সে দিন অন্নকূট উৎসবও হয়। তিনি জানান, মন্দিরপ্রাঙ্গণে চণ্ডীমন্দির ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি নতুন মন্দির নির্মাণ হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে শীতলামন্দির, হনুমানজির মন্দির, শ্যামের মন্দির ইত্যাদি।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই পুজো শুরু হয়েছে মন্দিরে। দেবীকে রাজবেশে সাজানো হয়েছে, পরানো হয়েছে নানা স্বর্ণালংকার। দুপুরে অন্নভোগ নিবেদন করা হবে। এখানে নিরামিষ ভোগই নিবেদন করা হয়। ভোগে থাকে সাদাভাত, পোলাও, শুক্তনি, পাঁচ রকমের ভাজা, নানা তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। এ ছাড়া হোম এবং কুমারীপুজোও হবে।

মন্দির পরিষদের আরও এক অন্যতম সদস্যা জানালেন যে, পুজোর পর প্রায় হাজার তিনেক ভক্তকে মায়ের প্রসাদ বিতরণ করা হয়। কথায় কথায় জানা গেল এ বছর ভক্তদের প্রসাদ বিতরণের জন্য সাড়ে সাতশো কিলো চালের পোলাও তৈরি হচ্ছে। এর পর সন্ধ্যাবেলায় দেবীকে নানান রকমের ফল নিবেদন করা হবে। এ ভাবেই চণ্ডী মহোৎসব পালিত হচ্ছে চণ্ডীতলার চণ্ডীমন্দিরে।

আরও পড়ুন: অন্নপূর্ণাপুজো: কোভিড বিধি মেনেই পুজো হচ্ছে সাবর্ণ পরিবারে

ধর্মকর্ম

Religious Places in Bengal: কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির বোড়ালে ত্রিপুরসুন্দরী মন্দির

সম্ভবত শ্রীত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের প্রথম প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ত্রয়োদশ শতকে। সেন বংশের কোনো রাজা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

Published

on

শ্রীত্রিপুরসুন্দরী মন্দির।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলিতে গড়িয়ার কাছে বোড়ালে দশমহাবিদ্যার তৃতীয় মহাবিদ্যা ষোড়শীর (শ্রীত্রিপুরসুন্দরী) এক প্রাচীন পীঠস্থান রয়েছে। এই মন্দিরের মাহাত্ম্য এবং ঐতিহ্য দু’টোই বহু দিনের।

Loading videos...

আদিশক্তি মহামায়া তাঁর দশ রূপ (কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী, কমলা) দেখিয়ে দেবাদিদেব মহাদেবকে মহিমান্বিত করেন। এই দশমহাবিদ্যার তৃতীয় রূপ ষোড়শী দেবীর নামান্তর শ্রীবিদ্যা বা শ্রীত্রিপুরসুন্দরী – এই তন্ত্রোক্ত অভিমত।

বোড়াল গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীত্রিপুরসুন্দরী। এই দেবীর ভৈরব শ্রীশ্রীপঞ্চাননদেব। দেবীর বর্তমান মন্দিরটি বয়সে নবীন হলেও, বোড়াল গ্রামে শ্রীত্রিপুরসুন্দরী যে প্রাচীন কাল থেকেই প্রতিষ্ঠিতা, তার একাধিক প্রমাণ আবিষ্কৃত হয়েছে। সম্ভবত শ্রীত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের প্রথম প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ত্রয়োদশ শতকে। সেন বংশের কোনো রাজা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহালয়ের পক্ষ থেকে ১৯৪০ সালে ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ খনন করা হয়। খনন করে মন্দিরের ভিত্তির কয়েকটি স্তর পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্তরের গঠনশৈলী ও কারুকার্যের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই মন্দিরের গঠনভঙ্গিতে বিভিন্ন যুগের ছাপ রয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন যুগে যাঁরা এই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন তাঁরা তাঁদের রুচি ও স্থাপত্যশিল্পের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেই কাজ করেছিলেন।  

মূল মন্দির।

মন্দিরের স্তূপ এবং পার্শবর্তী স্থান খনন করে নানা রকমের ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খ্রিস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতকের দু’টি অপূর্ব সুন্দর বিষ্ণুমূর্তি, পাথরে খোদাই অঙ্কুশ চিহ্নিত বিষ্ণুর পাদপদ্ম, ত্রয়োদশ শতকের চিত্রিত বিভিন্ন আকৃতির ইট। ইটগুলির উপর খচিত রয়েছে দেবদেবীর মূর্তি, মঙ্গলঘট, আঙুরের স্তবক, পদ্মফুল প্রভৃতি কারুকার্য। স্তূপ খননের সময় প্রাচীন মন্দির-ভিত্তির আশেপাশে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকের পোড়ামাটির বিভিন্ন আকৃতির পাত্র, পুতুল ইত্যাদি পাওয়া যায়।

বর্তমান ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের উত্তর-পশ্চিম দিকে ছিল বিরাট উঁচু মাটির ঢিবি। ১৯৪১ সাল নাগাদ স্থানীয় ইটখোলার পক্ষ থেকে ওই ঢিবি ভেঙে ফেলা হয়। এর ফলে ওখানে তৈরি হয় বড়ো বড়ো পুকুর। এই মাটি কাটার ফলে বিভিন্ন ধরনের বিস্ময়কর সব পুরাবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। বিশিষ্ট পুরাতাত্ত্বিকরা জানিয়েছেন, ওই সব পুরাবস্তুর বয়স খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু করে খ্রিস্টাব্দ সপ্তম-অষ্টম শতক পর্যন্ত। ওই সব পুরাবস্তুর মধ্যে রয়েছে শুঙ্গযুগের পোড়ামাটির ফলক, গুপ্তযুগের পোড়ামাটির অপ্সরামূর্তি, রাক্ষসের মুখ, নারী-পুরুষের মিথুনমূর্তি, ফলকে উৎকীর্ণ জাতক-কাহিনি, মহিষ ও হরিণের শিলীভূত শিং, মাটির মাল্যদান, বড়ো বড়ো পাথরের জালার অংশ, বিভিন্ন প্রকারের মৃৎপাত্র ও প্রস্তরপাত্রের ভগ্নাংশ ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রকারের পাত্রের মধ্যে পিঙ্গল রঙের পাত্রগুলি শুঙ্গ-কুষাণ যুগের, লাল আবরণের পাত্রগুলি গুপ্তযুগের, কালো রঙের পাথরের পাত্রগুলি পাল-সেন যুগের বলে অনুমান।

ত্রিপুরসুন্দরী বিগ্রহ।

১৯৫৪ সালে সেনদিঘি সংস্কারের সময় দিঘির পশ্চিম দিকে মাটির তলা থেকে লাল বেলেপাথরের একটি অপূর্ব তারামূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকের। ওই তারামূর্তিটি ত্রিপুরসুন্দরী মঠে রক্ষিত আছে। এ ছাড়াও বোড়াল গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় খননকার্য চালিয়ে আরও যে সব বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া গেছে, তাতে এই অঞ্চলের সুপ্রাচীনত্ব প্রমাণিত হয়। এই সেনদিঘিরই পশ্চিম দিকে ত্রিপুরসুন্দরীর ভৈরব নামে খ্যাত লৌকিক দেবতা পঞ্চানন্দের মন্দির।             

এক সময়ে বোড়ালের মন্দির-সীমানার পূর্ব দিকে আদিগঙ্গা প্রবাহিত ছিল। কথায় বলে, ‘গঙ্গার পশ্চিম কূল বারাণসী সমতুল’। এই দেবীর মন্দিরও আদিগঙ্গার  পশ্চিম দিকে অবস্থিত। সেই সময়ে এই দেবীমন্দির থেকে কিছুটা দূরেই ছিল বন্দর। ছোটো জাহাজ, নৌকা বন্দরে আসত। দেশ-দেশান্তর থেকে বহু তীর্থযাত্রী নৌকাযোগে আসত তীর্থস্থান দর্শন করতে। পাল ও সেন রাজাদের সময় বা বলা যেতে পারে তারও আগে সওদাগররা নৌকাযোগে আদিগঙ্গার এই প্রবাহপথ ধরে গড়িয়া, বোড়াল প্রভৃতি অঞ্চল অতিক্রম করে তমলুকের প্রধান বন্দরে যেতেন। সেই সময় তাঁরা এই ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরে পুজো দিতেন ও রাত্রিবাস করতেন। তাঁরাই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন এবং এই দেবীপীঠের উন্নতি সাধন করেছিলেন।

অতীতে ত্রিপুরসুন্দরী মন্দির নানা কারণে জনশূন্য হয়ে পড়ে। পরে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে জগদীশ ঘোষ (পূর্ববঙ্গের ধনাঢ্য জমিদার) নৌকাযোগে তীর্থভ্রমণ বেরিয়ে এই পীঠস্থানে আসেন এবং দেবীর নির্দেশেই তিনি মন্দির সংস্কার করে বোড়াল গ্রামেই বসবাস শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে জগদীশ ঘোষ দিল্লির সম্রাটের অধীন সুবেদারের কাছ থেকে বোড়াল গ্রামের পত্তনি নিয়ে এখানে বসতি স্থাপন করেন। তিনি গ্রামে ব্রাহ্মণ, কুলীন কায়স্থ, ধোপা, নাপিত, কুম্ভকার, মালাকার প্রভৃতিদের ভূসম্পত্তি দান করে তাঁদের বসবাসের ব্যবস্থা করেন। জগদীশ ঘোষ জঙ্গলাকীর্ণ ইটের স্তূপ খনন করে ধ্বংসপ্রাপ্ত ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরটির সংস্কার করেন এবং সেখানে পূজাপাঠের ব্যবস্থা করেন।

মন্দিরের প্রবেশফটক।

তারাপীঠের মতো বোড়ালের এই পীঠেও বহু সাধক এসে মায়ের সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে এই দেবীপীঠের কাছেই এক বিস্তৃত কেয়াবন ছিল। বহু সাধক সেই বনের মধ্যে নির্জনে ছোটো ছোটো কুটীর তৈরি করে তপস্যা করতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাধক শ্রীমৎ স্বামী শিবচৈতন্য গিরি। সাম্প্রতিক কালে দেবীর সাধনা করে শ্রীমৎ স্বামী হরানন্দ সরস্বতী ও জগদগুরু শঙ্করাচার্য্য ১১০৮ শ্রীমৎ স্বরূপানন্দ গিরিও সিদ্ধ হয়েছেন।

প্রসঙ্গত, জগদীশ ঘোষ মহাশয়ের সঙ্গে বড়িশার প্রতাপশালী সাবর্ণ রায় চৌধুরী জমিদারগণের ও ভূকৈলাশ রাজবংশের সুসম্পর্ক ছিল। তিনি বড়িশা ও বোড়াল গ্রামের সঙ্গে একান্ত ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করেন এবং তাঁদেরও দেবীর সেবাকার্যে অনুপ্রাণিত করেন। এর পরবর্তীকালে ঘোষ বংশীয় জমিদার হীরালাল ঘোষ বিদেশ থেকে বোড়ালে ফিরে দেবীর মন্দিরের সংস্কার করেন। তিনি গ্রামের কয়েক জন ব্যক্তিকে নিয়ে সেবায়েতমণ্ডলী তৈরি করেন। সেবায়েতগণের মধ্যে সত্যনারায়ণ ভট্টাচার্য, ভূতনাথ মুখোপাধ্যায়, বসন্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রকুমার মিত্র প্রভৃতিরা ছিলেন।

হীরালাল ঘোষ বার্ধক্যের কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ফরতাবাদ ও অন্যান্য স্থানের সম্পত্তিগুলি দেখাশোনার অভাবে বেদখল হতে শুরু করে। সেই সময় আইনের বলে ১৩৪১ বঙ্গাব্দে এক সাধারণ সভায় ৭ জন ব্যক্তিকে নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এই কমিটি মন্দিরের বহু উন্নতিমূলক কাজ করে। বিশেষ করে প্রায় চার হাজার টাকা ব্যয়ে দেবীর অষ্টধাতুর মূর্তি তৈরি করা হয়। এই মূর্তি তৈরি করেন কলকাতার বিখ্যাত জি পাল মহাশয়। বিগ্রহটির ওজন ছয় মণ পঁচিশ সের, কেবলমাত্র দেবীর ওজন প্রায় দুই মণ। এই মূর্তি নির্মাণে সাহায্য করেছিলেন কলকাতার বিখ্যাত ছাতুবাবু লাটুবাবুর সুযোগ্য বংশধর নীরজেন্দ্র নাথ দেব। নবনির্মিত বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয় ২৩ মাঘ ১৩৪১ বঙ্গাব্দ (৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) শুক্লা তৃতীয়ার দিন। বিভিন্ন স্থান থেকে তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ এসে পূজাপাঠ করেন এবং পাঁচজন বেদপাঠী ব্রাহ্মণ সারা দিন বেদপাঠ করেন।

ত্রিপুরসুন্দরী মন্দির চত্বর।

১৯৪৯ সালে কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেটদের পরামর্শে ট্রাস্টি বোর্ডের পরিবর্তে প্রতি বছর পরিবর্তন সাপেক্ষে কমিটি নিয়োগ করার প্রথা চালু হয়। দেবীর নতুন নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করা হয়। নয় চূড়াবিশিষ্ট মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৫২ ফুট। মন্দিরের সম্পূর্ণ নকশা করেন মার্টিন অ্যান্ড বার্ন কোং-এর ইঞ্জিনিয়ার ঢাকুরিয়া নিবাসী সরোজ কুমার চট্টোপাধ্যায়। মন্দির সংলগ্ন নাটমন্দিরটি বেশ বড়ো। মূল মন্দিরের পূর্ব দিকে রয়েছে নারায়ণ ও শিবমন্দির।  

এখন দেবীপীঠের চার দিকে দেওয়াল দেওয়া হয়েছে এবং একটি তীর্থযাত্রী নিবাস তৈরি করা হয়েছে। পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেবীর নিত্য সেবাপূজার জন্য তহবিল তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে একটি সংগ্রহশালা তৈরি করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শন সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে এবং বিশেষ বিশেষ নিদর্শনগুলি আশুতোষ মিউজিয়ামে রাখা আছে।

কথা হচ্ছিল ত্রিপুরসুন্দরী সেবা সমিতির সদস্য স্বপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন, আপাতত শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে মন্দিরে ভক্তদের পুজো নেওয়া হচ্ছে। ভক্তরা মূল মন্দিরের বাইরে থেকে পুজো দিচ্ছেন। স্যনিটাইজারের ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। কিন্তু যে ভাবে কোভিড বাড়ছে তাতে আরও কড়া বিধিনিষেধ চালু করা হবে কিনা তা মন্দির কমিটি বৈঠক করে ঠিক করবেন।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মন্দির খোলা থাকে সকাল ৬টা থেকে দুপুরে ভোগ নিবেদনের আগে পর্যন্ত। বিকাল ৫টায় মন্দির আবার খোলে, আরতির পর ৭টায় বন্ধ হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র:

১। শ্রীশ্রীত্রিপুরাসুন্দরী দেবীপীঠের প্রাচীন ইতিহাস এবং দেবী মাহাত্ম্য – ত্রিপুরাসুন্দরী সেবা সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত

২। বৃহত্তর গড়িয়ার ইতিবৃত্ত – সুধাংশু মুখোপাধ্যায় – শিশুমেলা, কলকাতা ৭০০০৪৭

Continue Reading

ধর্মকর্ম

আজ থেকে বলদেবের রাসযাত্রা বেলেঘাটা মিত্রবাড়িতে, এ বছর সীমাবদ্ধ পরিবারের মধ্যেই

মিত্রদের ঠাকুরবাড়ি রাজা পীতাম্বর মিত্রের প্রতিষ্ঠিত। এই ঠাকুরবাড়ি আজ এক প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থান।

Published

on

বলদেব ও রেবতীরানির বিগ্রহ।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

অতীতের শুঁড়া, আজকের বেলেঘাটা, কলকাতার পূর্বপ্রান্তে। এই বেলেঘাটাতেই রয়েছে রাসবাগান। এই রাসবাগানই মিত্রদের ঠাকুরবাড়ি, যেখানে রাস হয়ে আসছে অন্তত সোয়া ২০০ বছর ধরে, পীতাম্বর মিত্রের আমল থেকে। এই রাস শ্রীকৃষ্ণের নয়, এই রাস বলদেবের। এই মিত্র বংশেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন এশিয়াটিক সোসাইটির কর্ণধার এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমসাময়িক তথা বাংলায় বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাসচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র। এখন এই রাসবাগান মিত্রবাড়ি যে রাস্তায় সেই রাস্তা রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র রোড নামে পরিচিত।

Loading videos...

মিত্রদের ঠাকুরবাড়ি রাজা পীতাম্বর মিত্রের প্রতিষ্ঠিত। এই ঠাকুরবাড়ি আজ এক প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থান। প্রতি বছরের মতন এ বছরও এই ঠাকুরবাড়িতে বলদেবের রাসযাত্রা পালিত হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে রাসযাত্রা, চলবে তিন দিন। তবে এ বছর করোনা ভাইরাসের কারণে উৎসবকে পরিবারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বাইরের কোনো ভক্ত এ বছর প্রবেশ করতে পারবেন না বলেই জানা যাচ্ছে পরিবার সূত্রে।

ঠাকুরদালানে ব্যাস্ত বাড়ির কুলবধূরা। রাসযাত্রার আগের দিন।

কথা হচ্ছিল রাজা পীতাম্বর মিত্রের অষ্টম বংশধর দ্বৈপায়ন মিত্রের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এ বছর ঠাকুর রাসমঞ্চে যাবেন না, তাই বাড়ির অন্দরে ঠাকুরদালানেই তৈরি হয়েছে অস্থায়ী রাসমঞ্চ। বাড়ির কুলবধূরাও চূড়ান্ত ব্যস্ত পুজোর জন্য। তাঁদের কথায়, মন্দিরে আলপনা দেওয়া থেকে শুরু করে নৈবেদ্য সাজানো সবটাই তাঁরা করেন। এ বছর করোনার কারণে সমস্ত শারীরিক দূরত্ববিধি মেনেই তাঁরা পুজোর জোগাড় করেছেন।

মিত্রবাড়ির প্রাণপুরুষ পীতাম্বর মিত্র ছিলেন দিল্লি দরবারে অবধ-এর (অযোধ্যা) নবাবের উকিল। দিল্লির বাদশাহ তাঁকে ৩০০০ অশ্বারোহী সৈন্যের মনসবদারি, দোয়াবের অন্তর্গত কোড়া প্রদেশ জায়গির ও রাজাবাহাদুর খেতাব দেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে কাশীর চৈত সিংহের বিদ্রোহের সময় পীতাম্বর সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজের সৈন্যসামন্ত নিয়ে ইংরেজের পক্ষে লড়াইয়ে মাতলেন। চৈত সিংহ পরাজিত, রামনগর দুর্গ জয় হল। দুর্গ থেকে পাওয়া গেল চারটে সিন্দুক। না, সোনাদানা নয়, তা থেকে মিলল অন্য মণিমাণিক্য – ফারসি ও সংস্কৃত পুথি। সেই পুথি ও অযোধ্যার নবাবের কাছে পাওনা ৯ লক্ষ টাকা নিয়ে ১৭৮৭ সালে কলকাতায় ফিরে আসেন পীতাম্বর।

সেই সময় কলকাতায় মিত্রদের বসত ছিল মেছুয়াবাজারে। কলকাতায় ফিরে রাজা পীতাম্বর মিত্র রাজমুকুট ত্যাগ করে সমস্ত সম্পত্তি দেবতার পায়ে সমর্পণ করে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিরিবিলিতে ধর্মচর্চা করার জন্য মেছুয়াবাজারের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে শুঁড়ার বাগানবাড়িতে বাস করতে থাকেন।

ঠাকুরবাড়ি ঢোকার মুখে পুরোনো ফলক।

পীতাম্বর মিত্র এক সময় বৃন্দাবনে যান। সেখানে থাকাকালীন তিনি এক দিন স্বপ্নে নিমকাঠ ভেসে আসতে দেখেন। নিমকাঠ দিয়ে কৃষ্ণ এবং শ্রীরাধার যুগল বিগ্রহ বানাবেন বলে স্থির করেন। কিন্তু তিনি যত বার ওই বিগ্রহ বানাতে যান তত বারই বলরাম এবং রেবতীরানির দারুবিগ্রহ তৈরি হয়ে যায়। তাই তিনি স্থির করেন যে তিনি বলদেব এবং রেবতীরানির বিগ্রহই প্রতিষ্ঠা করবেন। সেই বিগ্রহ নিয়ে পীতাম্বর মিত্র বৃন্দাবনেই প্রথম রাসযাত্রা পালন করেন। পীতাম্বরের সেই বাড়ি আজও রয়েছে বৃন্দাবনে।

তার পর পীতাম্বর সেই দারুবিগ্রহ নিয়ে আসেন কলকাতার ঠাকুরবাড়িতে এবং তখন থেকেই এই বিগ্রহের সেবা হচ্ছে বেলেঘাটার মিত্রবাড়িতে। বেলেঘাট অঞ্চলের এই সাবেকি বাড়ির চার দিক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, যার কেন্দ্রে রয়েছে বলদেব ও রেবতীরানির ঠাকুরবাড়ি। এ ছাড়াও বিরাট মাঠ, খিড়কি পুকুর, রাসমঞ্চ, বাগানও রয়েছে। প্রসঙ্গত, এই ঠাকুরবাড়ির মন্দিরের কোনো চূড়া নেই। কারণ সেই সময় কালাপাহাড় হিন্দু মন্দির ধ্বংস করছিলেন। তাই তিনি যাতে এই মন্দিরের খোঁজ না পান সেই কারণেই এই মন্দিরে চূড়া তৈরি করা হয়নি।

ঠাকুরবাড়িতে জগন্নাথ বিগ্রহ।

প্রতি বছর রাসযাত্রার সময় পীতাম্বর মিত্র বৃন্দাবন থেকে কলকাতায় আসতেন এবং উৎসব শেষ হলে আবার ফিরে যেতেন বৃন্দাবনে। মৃত্যুর পর সেখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

পীতাম্বর মিত্রের পর এই বংশের আরও এক সুসন্তান হলেন তাঁর পৌত্র জন্মেজয় মিত্রের পুত্র রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র, পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি আলাদা করে ‘রাজা’ উপাধি পেয়েছিলেন। মিত্রবাড়ির আরও এক সুসন্তান হলেন ডঃ পঞ্চানন মিত্র, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত অ্যানথ্রোপোলজি বিভাগের প্রথম প্রধান ছিলেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে মিত্রবাড়ির বিগ্রহের কোনো দিন নবকলেবর হয়নি। শুধুমাত্র প্রতি বছর অঙ্গরাগ হয়। দোলযাত্রার পর অঙ্গরাগ শুরু হয়, অঙ্গরাগের পর বিগ্রহের অভিষেক হয়।

ঠাকুরবাড়িতে গোপালের দারুবিগ্রহ।

বলদেবের রাসযাত্রাকে কেন্দ্র করে রাসবাড়ি সংলগ্ন অঞ্চলে মেলা বসে। তবে করোনার জন্য সেই মেলা এ বার আর বসছে না। কথায় কথায় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেল, এই মেলা কলকাতার সব থেকে পুরোনো মেলা বলেই পরিচিত। এই মেলার আগে অতীতে এখানে রথযাত্রায় মেলা বসত কিন্তু যে হেতু রথযাত্রার সঙ্গে মিত্রবাড়ির কোনো যোগসূত্র নেই তাই রথযাত্রার সেই মেলা এখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে অন্যত্র চলে যায়।

আজ শুরু হয়েছে বলদেবের রাসযাত্রা। সকালে মঙ্গলারতির পর বাল্যভোগ। তাতে থাকছে নানা রকমের ফল, মিষ্টির নৈবেদ্য। তার পর দুপুরে অন্নভোগ নিবেদন করা হবে। ভোগে থাকবে সাদাভাত, পোলাও, নানা রকমের ভাজা, তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি।

প্রতি বছর পরিবারের সদস্যরা এক সঙ্গে ভোগ খেলেও এ বছর সেই ব্যবস্থা নেই বলেই জানালেন তাঁরা। ঠাকুরবাড়িতে যাঁরা ভোগ রান্না করতে এসেছেন তাঁরাও বংশপরম্পরায় আসছেন। দ্বৈপায়নবাবুর কথায়, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক এবং অবশ্যই স্যনিটাইজার সঙ্গে রাখতে হবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বছর এই ভাবে উৎসব পালিত হলেও আগামী বছর ধুমধাম করেই বলদেবের রাসযাত্রা পালন করা হবে বলেই বিশ্বাস রাখেন মিত্রবাড়ির সদস্যরা।

তথ্যসূত্র:

১। কলিকাতা দর্পণ, দ্বিতীয় পর্ব, রাধারমণ মিত্র; ২। কলকাতার রাজকাহিনী, পূর্ণেন্দু পত্রী।

আরও পড়ুন: অন্নপূর্ণাপুজো: ১৭৫ বছরে পা দিল খিদিরপুরের দাসবাড়ির পুজো

Continue Reading

ধর্মকর্ম

আজ বাসন্তীপূজার দশমী যে পূজা শুরু করেছিলেন মহারাজা সুরথ

মহারাজা সুরথ কেন দেবীর পুজো করেছিলেন তার বিস্তারিত বর্ণনা শ্রীশ্রীচণ্ডীতে রয়েছে।

Published

on

শুভদীপ রায় চৌধুরী

ভারতবর্ষের শক্তিসাধনা সুপ্রাচীন কাল থেকেই হয়ে আসছে। প্রতিমাপুজো যখন প্রচলিত হয়নি তখন বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে এবং পরবর্তী কালে বৃক্ষ, স্তূপ এবং প্রস্তর প্রভৃতি জড় পদার্থে চৈতন্যাত্মক শক্তির প্রকাশ কল্পনা করে পুজো করা হত। বৈদিক যুগে অগ্নিকে দেবতাদের মুখ হিসাবে কল্পনা করে বিভিন্ন দ্রব্যাহুতির মাধ্যমে দেবতাদের পুজো করা হত। পরবর্তী কালে যখন মূর্তিপূজার সূচনা হয় তখন থেকে মহাশক্তির ভিন্ন ভিন্ন রূপকে দেবদেবী রূপে কল্পনা করে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়।

Loading videos...

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে শক্তিরূপা দেবীপূজার প্রচলন হয় বেদ-পরবর্তী পৌরাণিক যুগে। বৈদিক যুগের দেবতাদের মধ্যে অনেক পুরুষদেবতাই পরবর্তী পৌরাণিক যুগে দেবমণ্ডলীতে স্থান পাননি। বেদের ক্ষেত্রে যেমন কোনো রচনাকার নেই ঠিক তেমনই তন্ত্রশাস্ত্রেও কোনো রচনাকার নেই বললেই চলে। কারণ তন্ত্রশাস্ত্রের প্রবক্তা দেবাদিদেব মহাদেব এবং শ্রোতা হলেন জগন্মাতা পার্বতী। এই দুর্গাই মহামায়া রূপে সমগ্র জগৎকে ধারণ করে রেখেছেন – তিনি নিত্যা এবং ত্রিগুণাত্মকা। বেদে দুর্গা নামটির উল্লেখ না পাওয়া গেলেও পরবর্তী পৌরাণিক যুগে উল্লেখ রয়েছে। মহাভারতের বিভিন্ন স্থানে দুর্গার নাম এবং তাঁর স্তোত্র পাওয়া যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণে বলা হয়েছে, সৃষ্টির আদিতে শ্রীকৃষ্ণ গোলকের রাসমণ্ডলে দেবীর পূজা করেছিলেন এবং পরবর্তী কালে মধুকৈটভের ভয়ে ব্রহ্মা দেবীর পুজো করেছিলেন। ত্রিপুরাসুরের জন্য মহাদেব অতিষ্ঠ হয়ে দেবীর পুজো করেছিলেন এবং ঋষি দুর্বাসার শাপে দেবরাজ ইন্দ্র পুনর্বার শ্রীলাভের জন্য দেবীর পুজো করেছিলেন। এর পর মেধস মুনির শিষ্য মহারাজা সুরথ মৃন্ময়ী প্রতিমায় দেবীর পুজো করেন।

দুর্গাপুজো মূলত দুই ঋতুতে অনুষ্ঠিত হয়, একটি শরৎ এবং একটি বসন্ত। বসন্তকালে যে পুজো হয় তার নাম বাসন্তীপূজা এবং শরৎকালে যে পুজো হয় তার নাম শারদীয়া। উত্তরায়ণ হল দেবগণের দিনের বেলা এবং দক্ষিণায়ন হল রাত্রি। দক্ষিণায়নে দেবগণ যে হেতু ঘুমিয়ে থাকেন তাই শারদীয়ায় বোধনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাসন্তীপূজায় তার প্রয়োজন নেই।

দশভূজা মা দুর্গার বাসন্তী রূপ।

মহারাজা সুরথ এই বসন্তকালেই দেবীর আরাধনা করেছিলেন। তার পরবর্তী কালে রাবণকে বধ করার জন্য শ্রীরামচন্দ্র দেবীর আরাধনা করেন –

“পূজিতা সুরথেনাদৌ দুর্গা দুর্গতিনাশিনী।/ তৎপশ্চাদ্রামচন্দ্রেণ রাবণস্য বধাথিনা।।”

ভবিষ্যপুরাণে উল্লেখ রয়েছে, যে দেশে দেবীর পুজো হয় সেই দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না, কারোর দুঃখপ্রাপ্তি হয় না বা অকালমৃত্যুও হয় না। তবে মহারাজা সুরথ কেন দেবীর পুজো করেছিলেন তার বিস্তারিত বর্ণনা শ্রীশ্রীচণ্ডীতে রয়েছে।

মহর্ষি মার্কেণ্ডেয় তাঁর শিষ্য ক্রৌষ্টুকি ভাণ্ডরীকে বলছেন, চৈত্রের বংশে সুরথ নামে এক মহারাজা যিনি পৃথিবীর অধিপতি হয়েছিলেন, তিনিই মহামায়াকে বন্দনাকে বর লাভ করেছিলেন এবং দেবীর আশীর্বাদেই তিনি হয়ে উঠলেন সূর্যতনয় সাবর্ণি (অষ্টম মনু)-

“সাবর্ণিঃ সূর্যতনয়ো যো মনুঃ কথ্যতেহষ্টমঃ।/ নিশাময় তদুৎপত্তিং বিস্তরাদ্ গদতো মম।।/ মহামায়ানুভাবেন যথা মন্বন্তরাধিপঃ।/স বভূব মহাভাগঃ সাবর্ণিস্তনয়ো রবেঃ।।/স্বারোচিষেহন্তরে পূর্বং চৈত্রবংশসমুদ্ভবঃ।/সুরথো নাম রাজাহভূৎ সমস্ত ক্ষিতিমণ্ডলে।।…”(শ্রীশ্রীচণ্ডী/প্রথম অধ্যায়)

সেই মহারাজা সুরথ নিজের প্রজাদের সন্তান স্নেহে পালন করতেন। সেই সময় শত্রুরা রাজা সুরথের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি সেই যুদ্ধে পরাজিত হন। সেই সুযোগে অমাত্যগণ তাঁর রত্নভাণ্ডার-সহ সমস্ত কিছু দখল করেন। মহারাজা সুরথ সর্বস্ব হারিয়ে গভীর অরণ্যে যাত্রা করেন এবং সেখানেই মেধস মুনির আশ্রম দেখতে পান। মেধস মুনি তাঁকে বলেন, এই সবই মহামায়ার মায়া। যিনি জগত সৃষ্টি করেছেন, তিনি প্রসন্ন হলে মানুষকে মুক্তির বর তিনিই দেবেন।

এই মহামায়াই জগতের সৃষ্টিতে সৃষ্টিশক্তিরূপা, পালনে স্থিতিশক্তিরূপা এবং প্রলয়কালে তিনিই সংহারশক্তিরূপা। তিনিই খড়গধারিণী, ত্রিশূলধারিণী, গদাধারিণী, আবার তিনিই ধনুর্ধারিণী। মেধস মুনির কাছে মহারাজা সুরথ এবং সমাধি দেবীর সমস্ত লীলা শুনলেন এবং তার পর নদীতীরে গিয়ে দেবীসূক্তপাঠ করলেন এবং তাঁর ধ্যান করলেন। তার পর তাঁরা দুর্গাদেবীর মৃন্ময়ী বিগ্রহ নির্মাণ করে পুষ্প, ধূপ, দীপ এবং পশুবলি দিয়ে দেবীর চরণে নিবেদন করলেন। দেবী এই পূজায় সন্তুষ্ট হয়ে মহারাজা সুরথকে বর প্রদান করলেন যে মৃত্যুর পর তিনি পুনরায় জন্মগ্রহণ করবেন সূর্যদেবের তৎপত্নী সবর্ণার গর্ভে এবং পৃথিবীতে অষ্টম মনু সাবর্ণি নামে পরিচিত হবেন-

“মৃতশ্চ ভূয়ঃ সংপ্রাপ্য জন্ম দেবাদ্ বিবস্বতঃ।/ সাবর্ণিকা নাম মনুর্ভবান্ ভুবি ভবিষ্যতি।।” (শ্রীশ্রীচণ্ডী/ত্রয়োদশ অধ্যায়)

বসন্তকালে মহারাজা সুরথ যে পূজা করেছিলেন তা-ই বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত। পরবর্তী কালে বঙ্গদেশের বহু বাড়িতে দেবীর দুর্গার এই বসন্তকালের আরাধনা শুরু হয়।

সেই বাসন্তীদুর্গাপূজার আজ দশমী তিথি। মা দুর্গাকে আজ বিদায়ের পালা। আবার প্রতীক্ষা শারদীয় দুর্গাপূজার জন্য।

আরও পড়ুন: অন্নপূর্ণাপুজো: ১৭৫ বছরে পা দিল খিদিরপুরের দাসবাড়ির পুজো

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
রাজ্য14 mins ago

Covid Crisis: রাজ্যকে সাহায্য করুক কেন্দ্র, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি দিলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী

দেশ56 mins ago

Covid Crisis: জলে গুলে খেতে হবে, করোনারোধী ওষুধে ছাড়পত্র দিল ডিজিসিআই

Coronavirus Delhi
দেশ1 hour ago

Coronavirus Second Wave: ১২ দিনে ১২ শতাংশ কমল সংক্রমণের হার, স্বস্তি ফিরছে দিল্লিতে

দেশ2 hours ago

Vaccination Drive: শীঘ্রই চতুর্থ কোভিড-টিকা পেয়ে যেতে পারে ভারত

দঃ ২৪ পরগনা2 hours ago

সুন্দরবনের পিঁপড়েখালি সেতু ভেঙে গুরুতর জখম ১

দেশ2 hours ago

শেষ সাত দিনে ১৮০টি জেলায় নতুন করে কোভিড আক্রান্ত নেই, জানালেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী

প্রবন্ধ2 hours ago

নরেন্দ্র মোদী আবার কবে বাংলায় আসবেন?

দেশ2 hours ago

হাসপাতালে ভরতির জন্য রোগীর কোভিড পজিটিভ রিপোর্টের দরকার নেই, নতুন নির্দেশিকা

রাজ্য3 days ago

কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুনর্গণনার দাবিতে আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি শুভেন্দু অধিকারীর

sourav ganguly
ক্রিকেট2 days ago

Covid Crisis in IPL: জৈব সুরক্ষা বলয়ে কোনো ফাঁক ছিল বলে মনে করেন না সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

দেশ2 days ago

Corona Update: দু’তিনটে রাজ্যে সংক্রমণবৃদ্ধির জের, ভারতের দৈনিক সংক্রমণ ভেঙে দিল অতীতের রেকর্ড

রাজ্য2 days ago

Post-Poll Violence: ইন্ডিয়া টুডে-র সাংবাদিকের ছবি পোস্ট করে হিংসায় মৃত হিসেবে বর্ণনা বিজেপির

রাজ্য3 days ago

Bengal Corona Update: দৈনিক সংক্রমণ ১৮ হাজারের গণ্ডি পেরোলেও কমল সংক্রমণের হার, পর পর ৪ দিন সুস্থতার হারে বৃদ্ধি

রাজ্য2 days ago

সুখবর! রাজ্য সরকারি কর্মীরা পাচ্ছেন অ্যাড-হক বোনাস

পরিবেশ3 days ago

২০ বছরে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ২৫ বার আগুন, পুড়ে গেছে প্রায় ৮১ একর বনভূমি

রাজ্য1 day ago

‘যা বলার পরে ডেকে বলব’, জল্পনা বাড়ালেন মুকুল রায়

ভিডিও

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 months ago

বাজেট কম? তা হলে ৮ হাজার টাকার নীচে এই ৫টি স্মার্টফোন দেখতে পারেন

আট হাজার টাকার মধ্যেই দেখে নিতে পারেন দুর্দান্ত কিছু ফিচারের স্মার্টফোনগুলি।

কেনাকাটা3 months ago

সরস্বতী পুজোর পোশাক, ছোটোদের জন্য কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সরস্বতী পুজোয় প্রায় সব ছোটো ছেলেমেয়েই হলুদ লাল ও অন্যান্য রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠে। তাই ছোটোদের জন্য...

কেনাকাটা3 months ago

সরস্বতী পুজো স্পেশাল হলুদ শাড়ির নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই সরস্বতী পুজো। এই দিন বয়স নির্বিশেষে সবাই হলুদ রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই হলুদ রঙের...

কেনাকাটা3 months ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা4 months ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা4 months ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা4 months ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা4 months ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা4 months ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা4 months ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

নজরে