ইতিহাস বলছে, এর আগেও নানা কারণে পুরীর রথযাত্রা বন্ধ থেকেছে বহু বার

0

খবরঅনলাইন ডেস্ক: গত বছরের মতো এ বারেও পুরীতে কার্যত প্রতীকী রথযাত্রা হবে জগন্নাথদেবের। কোনো ভক্তসমাগম হবে না। শুধুমাত্র সেবায়েতরা রথযাত্রায় উপস্থিত থাকবেন এবং তাঁদেরও টিকার দু’টো ডোজ নিয়ে রাখতে হবে। করোনা পরিস্থিতির জন্য এই সিদ্ধান্ত ওড়িশা সরকার।

১২ জুলাই রথযাত্রা। তার এক দিন আগে পুরীতে কার্ফু জারি করা হবে। যে ৩ কিমি রাস্তা ধরে রথযাত্রা হয়, তার ধারের সমস্ত হোটেল, লজ এবং নিজেদের বাড়ি থেকেও দেখা যাবে না রথযাত্রা।

Loading videos...

করোনার কারণে এই নিয়ে পর পর দু’ বছর পুরীর রথযাত্রায় বিঘ্ন ঘটল। কিন্তু দু’ বছর ধরে পুরীর রথযাত্রায় যে বিঘ্ন ঘটল তা কি রথযাত্রার ইতিহাসে এই প্রথম?

পুরীর রথযাত্রার ৮০০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এর আগেও বিভিন্ন কারণে বেশ কয়েক বার রথযাত্রা বন্ধ থেকেছে। দু’ বছর ধরে পুরীর রথযাত্রায় তো জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মাসির বাড়ি যাচ্ছেন। কিন্তু এমন অনেক বার হয়েছে যে তাঁদের মাসির বাড়িই যাওয়া হয়নি।

এমনই কয়েকটি ঘটনার খতিয়ান –       

পরিসংখ্যান বলছে, ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রথযাত্রা বন্ধ ছিল ৩২ বার।।

কালাপাহাড়ের কথা

প্রথম ঘটনা ১৫৬৮ সালের। আর তার জেরে টানা ১০ বছর রথযাত্রা বন্ধ ছিল, ১৫৭৭ সাল পর্যন্ত। এমন ঘটনার কারণ ছিল বাংলার সুলতান সুলেমান কিররানির সেনাপতি কালাপাহাড়ের আক্রমণ। এই কালাপাহাড় হলেন আদতে একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ। আসল নাম রাজীবলোচন রায় মতান্তরে কালাচাঁদ রায় বা কালাচাঁদ রায় ভাদুড়ী। তবে জনশ্রুতিতে কালাপাহাড়ের আরও অনেক নামই পাওয়া যায়। যা-ই হোক, তিনি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান ছিলেন, পিতার নাম ছিল নয়ানচাঁদ রায়।

কালাচাঁদ নিয়মিত বিষ্ণুপূজা করতেন। নবাব সুলেমান খান কিররানির কন্যা দুলারি তাঁর প্রেমে পড়লে তিনি তাঁকে ইসলাম ধর্ম অনুসারে বিয়ে করেন। মুসলমান-কন্যা বিয়ে করার জন্য হিন্দুসমাজ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। আর সেই কারণে প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলে উঠে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নাম হয় মহম্মদ ফর্মুলি। পরে তাঁর মায়ের অনুরোধে তিনি প্রায়শ্চিত্ত করে হিন্দুধর্মে ফিরতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো ভাবেই সফল হননি। এমনকি পুরীতে জগন্নাথ মন্দিরেও তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। অবশেষে তিনি প্রবল হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। ১৫৬৮ সালে তিনি পুরীর শ্রীশ্রীজগন্ননাথ ধাম আক্রমণ করেন এবং মন্দির ও বিগ্রহের প্রচুর ক্ষতিসাধন করেন, লুঠপাট করেন। তখন থেকেই তিনি লোকমুখে কালাপাহাড় নামে কুখ্যাত হন। এই ছিল রথযাত্রা বন্ধ থাকার প্রথম ঘটনা।

অন্যান্য ঘটনা

এর পর রথযাত্রা বন্ধ ছিল আরও অনেক বার। বেশ কিছু ক্ষেত্রে কারণ ছিল অস্থির সময়। রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতির অস্থিরতার কারণে খুব অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে বেশ কয়েক বার বন্ধ রাখা হয়েছিল রথযাত্রা। এই বছরগুলি হল ১৬০১, ১৬০৭, ১৬১১, ১৬১৭, ১৬২১, ১৬২২, ১৬৯২-১৭০৪, ১৭৩১, ১৭৩৩, ১৭৩৪, ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দ। 

১৬০১ সালে বাংলার নবাবের কম্যান্ডার মিরজা খুররম হামলা চালান পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে। তখন খুররমের হাত থেকে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি রক্ষা করতে পুরী থেকে ১৩-১৪ কিলোমিটার দূরে কপিলেশ্বরের পঞ্চমুখী গোসানি মন্দিরে বিগ্রহ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে সে বছর রথযাত্রা বন্ধ ছিল।

১৬০৭ সালে ওডিশার মুঘল সুবেদার কোয়াসিম খান হামলা চালান। জগন্নাথ মন্দিরের মূর্তিগুলি তাঁর হাত থেকে বাঁচাতে গোপনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সে সব বিগ্রহ। খুরদার গোপলাজিউ মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় সমস্ত মূর্তি। রথযাত্রা হয় না এই বছরও।

১৬১১ সালে আকবরের সভাসদ টোডরমলের ছেলে কল্যাণমল ওড়িশার সুবেদার হন। তিনি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছেন জানতে পেরেই আগেভাগে মূর্তিগুলি চিলকা হ্রদের মাহিসানসিতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৬১৭ সালে দ্বিতীয় বার জগন্নাথ মন্দিরে হামলা চালান কল্যাণমল। এই বারেও সফল হননি তিনি। আক্রমণের আগেই তিনটি মূর্তি চিলকা হ্রদের গুরুবাইগড়ে সরিয়ে ফেলা হয়। এই দুই বছরই রথযাত্রা বন্ধ ছিল।

১৬২১ ও ১৬২২ সালে বন্ধ ছিল রথযাত্রা। মুসলিম সুবেদার আহমেদ বেগ মন্দিরে হামলা করেন। তখন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি বানাপুরের আন্ধারিয়াগড়ে সরিয়ে ফেলা হয়।

১৬৯২ সালে ওডিশার মুঘল কম্যান্ডার একরাম খান মন্দিরে হামলা করেন। হামলার খবর আগে থেকে পেয়ে খুরদার বিমলা মন্দিরে লুকিয়ে রাখা হয় মূর্তি। পরে চিলকা হ্রদের কাছে গাডাকোকালা গ্রামে সরিয়ে ফেলা হয়। সেখান থেকে আবার বানপুরের বড়া হনতুয়াদা গ্রামে মূর্তিগুলি সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এই ভাবে টানা ১৩ বছর রথযাত্রা হতে পারেনি।

১৭৩১ সালে ওডিশার ডেপুটি গভর্নর মহম্মদ টাকি খান মন্দিরে হামলা চালান। সে বছর চিলকা হ্রদের কঙ্কনাশেখারি কুড়ায় মূর্তিগুলি লুকোনো হয়েছিল। সেখান থেকে মূর্তিগুলি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল খুরদার হরিশ্বর মণ্ডপে। সেখান থেকে গঞ্জাম জেলার চিকিলি গ্রামে। আবার বন্ধ রইল রথযাত্রা।

১৭৩৩ সালে টাকি খান আবার পুরীর মন্দিরে হামলা চালান। প্রথমে হরিশ্বর মণ্ডপ এবং পরে গঞ্জাম জেলার মারদা মন্দিরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল মূর্তি। সেই সময় ১৭৩৩ সাল থেকে ১৭৩৫ সাল পর্যন্ত টানা ৩ বছর বন্ধ থাকে পুরীর রথযাত্রা।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন