শুভদীপ রায় চৌধুরী

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলিতে গড়িয়ার কাছে বোড়ালে দশমহাবিদ্যার তৃতীয় মহাবিদ্যা ষোড়শীর (শ্রীত্রিপুরসুন্দরী) এক প্রাচীন পীঠস্থান রয়েছে। এই মন্দিরের মাহাত্ম্য এবং ঐতিহ্য দু’টোই বহু দিনের।

আদিশক্তি মহামায়া তাঁর দশ রূপ (কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী, কমলা) দেখিয়ে দেবাদিদেব মহাদেবকে মহিমান্বিত করেন। এই দশমহাবিদ্যার তৃতীয় রূপ ষোড়শী দেবীর নামান্তর শ্রীবিদ্যা বা শ্রীত্রিপুরসুন্দরী – এই তন্ত্রোক্ত অভিমত।

বোড়াল গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীত্রিপুরসুন্দরী। এই দেবীর ভৈরব শ্রীশ্রীপঞ্চাননদেব। দেবীর বর্তমান মন্দিরটি বয়সে নবীন হলেও, বোড়াল গ্রামে শ্রীত্রিপুরসুন্দরী যে প্রাচীন কাল থেকেই প্রতিষ্ঠিতা, তার একাধিক প্রমাণ আবিষ্কৃত হয়েছে। সম্ভবত শ্রীত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের প্রথম প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ত্রয়োদশ শতকে। সেন বংশের কোনো রাজা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহালয়ের পক্ষ থেকে ১৯৪০ সালে ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ খনন করা হয়। খনন করে মন্দিরের ভিত্তির কয়েকটি স্তর পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্তরের গঠনশৈলী ও কারুকার্যের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই মন্দিরের গঠনভঙ্গিতে বিভিন্ন যুগের ছাপ রয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন যুগে যাঁরা এই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন তাঁরা তাঁদের রুচি ও স্থাপত্যশিল্পের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেই কাজ করেছিলেন।  

মূল মন্দির।

মন্দিরের স্তূপ এবং পার্শবর্তী স্থান খনন করে নানা রকমের ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খ্রিস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতকের দু’টি অপূর্ব সুন্দর বিষ্ণুমূর্তি, পাথরে খোদাই অঙ্কুশ চিহ্নিত বিষ্ণুর পাদপদ্ম, ত্রয়োদশ শতকের চিত্রিত বিভিন্ন আকৃতির ইট। ইটগুলির উপর খচিত রয়েছে দেবদেবীর মূর্তি, মঙ্গলঘট, আঙুরের স্তবক, পদ্মফুল প্রভৃতি কারুকার্য। স্তূপ খননের সময় প্রাচীন মন্দির-ভিত্তির আশেপাশে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকের পোড়ামাটির বিভিন্ন আকৃতির পাত্র, পুতুল ইত্যাদি পাওয়া যায়।

বর্তমান ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের উত্তর-পশ্চিম দিকে ছিল বিরাট উঁচু মাটির ঢিবি। ১৯৪১ সাল নাগাদ স্থানীয় ইটখোলার পক্ষ থেকে ওই ঢিবি ভেঙে ফেলা হয়। এর ফলে ওখানে তৈরি হয় বড়ো বড়ো পুকুর। এই মাটি কাটার ফলে বিভিন্ন ধরনের বিস্ময়কর সব পুরাবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। বিশিষ্ট পুরাতাত্ত্বিকরা জানিয়েছেন, ওই সব পুরাবস্তুর বয়স খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু করে খ্রিস্টাব্দ সপ্তম-অষ্টম শতক পর্যন্ত। ওই সব পুরাবস্তুর মধ্যে রয়েছে শুঙ্গযুগের পোড়ামাটির ফলক, গুপ্তযুগের পোড়ামাটির অপ্সরামূর্তি, রাক্ষসের মুখ, নারী-পুরুষের মিথুনমূর্তি, ফলকে উৎকীর্ণ জাতক-কাহিনি, মহিষ ও হরিণের শিলীভূত শিং, মাটির মাল্যদান, বড়ো বড়ো পাথরের জালার অংশ, বিভিন্ন প্রকারের মৃৎপাত্র ও প্রস্তরপাত্রের ভগ্নাংশ ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রকারের পাত্রের মধ্যে পিঙ্গল রঙের পাত্রগুলি শুঙ্গ-কুষাণ যুগের, লাল আবরণের পাত্রগুলি গুপ্তযুগের, কালো রঙের পাথরের পাত্রগুলি পাল-সেন যুগের বলে অনুমান।

ত্রিপুরসুন্দরী বিগ্রহ।

১৯৫৪ সালে সেনদিঘি সংস্কারের সময় দিঘির পশ্চিম দিকে মাটির তলা থেকে লাল বেলেপাথরের একটি অপূর্ব তারামূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকের। ওই তারামূর্তিটি ত্রিপুরসুন্দরী মঠে রক্ষিত আছে। এ ছাড়াও বোড়াল গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় খননকার্য চালিয়ে আরও যে সব বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া গেছে, তাতে এই অঞ্চলের সুপ্রাচীনত্ব প্রমাণিত হয়। এই সেনদিঘিরই পশ্চিম দিকে ত্রিপুরসুন্দরীর ভৈরব নামে খ্যাত লৌকিক দেবতা পঞ্চানন্দের মন্দির।             

এক সময়ে বোড়ালের মন্দির-সীমানার পূর্ব দিকে আদিগঙ্গা প্রবাহিত ছিল। কথায় বলে, ‘গঙ্গার পশ্চিম কূল বারাণসী সমতুল’। এই দেবীর মন্দিরও আদিগঙ্গার  পশ্চিম দিকে অবস্থিত। সেই সময়ে এই দেবীমন্দির থেকে কিছুটা দূরেই ছিল বন্দর। ছোটো জাহাজ, নৌকা বন্দরে আসত। দেশ-দেশান্তর থেকে বহু তীর্থযাত্রী নৌকাযোগে আসত তীর্থস্থান দর্শন করতে। পাল ও সেন রাজাদের সময় বা বলা যেতে পারে তারও আগে সওদাগররা নৌকাযোগে আদিগঙ্গার এই প্রবাহপথ ধরে গড়িয়া, বোড়াল প্রভৃতি অঞ্চল অতিক্রম করে তমলুকের প্রধান বন্দরে যেতেন। সেই সময় তাঁরা এই ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরে পুজো দিতেন ও রাত্রিবাস করতেন। তাঁরাই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন এবং এই দেবীপীঠের উন্নতি সাধন করেছিলেন।

অতীতে ত্রিপুরসুন্দরী মন্দির নানা কারণে জনশূন্য হয়ে পড়ে। পরে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে জগদীশ ঘোষ (পূর্ববঙ্গের ধনাঢ্য জমিদার) নৌকাযোগে তীর্থভ্রমণ বেরিয়ে এই পীঠস্থানে আসেন এবং দেবীর নির্দেশেই তিনি মন্দির সংস্কার করে বোড়াল গ্রামেই বসবাস শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে জগদীশ ঘোষ দিল্লির সম্রাটের অধীন সুবেদারের কাছ থেকে বোড়াল গ্রামের পত্তনি নিয়ে এখানে বসতি স্থাপন করেন। তিনি গ্রামে ব্রাহ্মণ, কুলীন কায়স্থ, ধোপা, নাপিত, কুম্ভকার, মালাকার প্রভৃতিদের ভূসম্পত্তি দান করে তাঁদের বসবাসের ব্যবস্থা করেন। জগদীশ ঘোষ জঙ্গলাকীর্ণ ইটের স্তূপ খনন করে ধ্বংসপ্রাপ্ত ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরটির সংস্কার করেন এবং সেখানে পূজাপাঠের ব্যবস্থা করেন।

মন্দিরের প্রবেশফটক।

তারাপীঠের মতো বোড়ালের এই পীঠেও বহু সাধক এসে মায়ের সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে এই দেবীপীঠের কাছেই এক বিস্তৃত কেয়াবন ছিল। বহু সাধক সেই বনের মধ্যে নির্জনে ছোটো ছোটো কুটীর তৈরি করে তপস্যা করতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাধক শ্রীমৎ স্বামী শিবচৈতন্য গিরি। সাম্প্রতিক কালে দেবীর সাধনা করে শ্রীমৎ স্বামী হরানন্দ সরস্বতী ও জগদগুরু শঙ্করাচার্য্য ১১০৮ শ্রীমৎ স্বরূপানন্দ গিরিও সিদ্ধ হয়েছেন।

প্রসঙ্গত, জগদীশ ঘোষ মহাশয়ের সঙ্গে বড়িশার প্রতাপশালী সাবর্ণ রায় চৌধুরী জমিদারগণের ও ভূকৈলাশ রাজবংশের সুসম্পর্ক ছিল। তিনি বড়িশা ও বোড়াল গ্রামের সঙ্গে একান্ত ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করেন এবং তাঁদেরও দেবীর সেবাকার্যে অনুপ্রাণিত করেন। এর পরবর্তীকালে ঘোষ বংশীয় জমিদার হীরালাল ঘোষ বিদেশ থেকে বোড়ালে ফিরে দেবীর মন্দিরের সংস্কার করেন। তিনি গ্রামের কয়েক জন ব্যক্তিকে নিয়ে সেবায়েতমণ্ডলী তৈরি করেন। সেবায়েতগণের মধ্যে সত্যনারায়ণ ভট্টাচার্য, ভূতনাথ মুখোপাধ্যায়, বসন্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রকুমার মিত্র প্রভৃতিরা ছিলেন।

হীরালাল ঘোষ বার্ধক্যের কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ফরতাবাদ ও অন্যান্য স্থানের সম্পত্তিগুলি দেখাশোনার অভাবে বেদখল হতে শুরু করে। সেই সময় আইনের বলে ১৩৪১ বঙ্গাব্দে এক সাধারণ সভায় ৭ জন ব্যক্তিকে নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এই কমিটি মন্দিরের বহু উন্নতিমূলক কাজ করে। বিশেষ করে প্রায় চার হাজার টাকা ব্যয়ে দেবীর অষ্টধাতুর মূর্তি তৈরি করা হয়। এই মূর্তি তৈরি করেন কলকাতার বিখ্যাত জি পাল মহাশয়। বিগ্রহটির ওজন ছয় মণ পঁচিশ সের, কেবলমাত্র দেবীর ওজন প্রায় দুই মণ। এই মূর্তি নির্মাণে সাহায্য করেছিলেন কলকাতার বিখ্যাত ছাতুবাবু লাটুবাবুর সুযোগ্য বংশধর নীরজেন্দ্র নাথ দেব। নবনির্মিত বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয় ২৩ মাঘ ১৩৪১ বঙ্গাব্দ (৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) শুক্লা তৃতীয়ার দিন। বিভিন্ন স্থান থেকে তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ এসে পূজাপাঠ করেন এবং পাঁচজন বেদপাঠী ব্রাহ্মণ সারা দিন বেদপাঠ করেন।

ত্রিপুরসুন্দরী মন্দির চত্বর।

১৯৪৯ সালে কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেটদের পরামর্শে ট্রাস্টি বোর্ডের পরিবর্তে প্রতি বছর পরিবর্তন সাপেক্ষে কমিটি নিয়োগ করার প্রথা চালু হয়। দেবীর নতুন নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করা হয়। নয় চূড়াবিশিষ্ট মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৫২ ফুট। মন্দিরের সম্পূর্ণ নকশা করেন মার্টিন অ্যান্ড বার্ন কোং-এর ইঞ্জিনিয়ার ঢাকুরিয়া নিবাসী সরোজ কুমার চট্টোপাধ্যায়। মন্দির সংলগ্ন নাটমন্দিরটি বেশ বড়ো। মূল মন্দিরের পূর্ব দিকে রয়েছে নারায়ণ ও শিবমন্দির।  

এখন দেবীপীঠের চার দিকে দেওয়াল দেওয়া হয়েছে এবং একটি তীর্থযাত্রী নিবাস তৈরি করা হয়েছে। পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেবীর নিত্য সেবাপূজার জন্য তহবিল তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে একটি সংগ্রহশালা তৈরি করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শন সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে এবং বিশেষ বিশেষ নিদর্শনগুলি আশুতোষ মিউজিয়ামে রাখা আছে।

কথা হচ্ছিল ত্রিপুরসুন্দরী সেবা সমিতির সদস্য স্বপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানালেন, আপাতত শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে মন্দিরে ভক্তদের পুজো নেওয়া হচ্ছে। ভক্তরা মূল মন্দিরের বাইরে থেকে পুজো দিচ্ছেন। স্যনিটাইজারের ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। কিন্তু যে ভাবে কোভিড বাড়ছে তাতে আরও কড়া বিধিনিষেধ চালু করা হবে কিনা তা মন্দির কমিটি বৈঠক করে ঠিক করবেন।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মন্দির খোলা থাকে সকাল ৬টা থেকে দুপুরে ভোগ নিবেদনের আগে পর্যন্ত। বিকাল ৫টায় মন্দির আবার খোলে, আরতির পর ৭টায় বন্ধ হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র:

১। শ্রীশ্রীত্রিপুরাসুন্দরী দেবীপীঠের প্রাচীন ইতিহাস এবং দেবী মাহাত্ম্য – ত্রিপুরাসুন্দরী সেবা সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত

২। বৃহত্তর গড়িয়ার ইতিবৃত্ত – সুধাংশু মুখোপাধ্যায় – শিশুমেলা, কলকাতা ৭০০০৪৭

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন