শুভদীপ রায় চৌধুরী

আগামী কাল সরস্বতীপুজো, বাঙালির ঘরে ঘরে মা সরস্বতীর আরাধনা। আপামর ভক্তসমাজ মেতে উঠবেন বাগদেবীর আরাধনায়। ব্যতিক্রম নয় বীরভূম জেলার কড়িধ্যা গ্রামও।

কড়িধ্যা গ্রামের একটু পরিচয় দেওয়া যাক। তিনশো বছরের প্রাচীন এই গ্রাম। গ্রামে রয়েছে প্রচুর মন্দির, তার মধ্যে সংখ্যায় সব চেয়ে বেশি শিবমন্দির। এই সব মন্দিরের বেশির ভাগ অবশ্য ভগ্নপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। সামান্য কিছু মন্দির রয়েছে অক্ষত।

কিন্তু কেন এত শিবমন্দির কড়িধ্যায়? তিনশো বছর আগে মারাঠা বর্গীরা যখন রাজনগর আক্রমণ করে তখন তাদের যাওয়ার পথ ছিল এই কড়িধ্যা দিয়ে। বর্গীরা যে পথ দিয়ে যেত, সেই পথের আশেপাশের সমস্ত গ্রাম তারা আক্রমণ করত, লুটপাট চালাত। কড়িধ্যার গ্রামবাসীরা শুনেছিলেন, এই মারাঠারা শৈব সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই তাদের হাত থেকে নিজেদের জিনিসপত্র রক্ষা করার জন্য তাঁরা বহুসংখ্যক শিবমন্দির নির্মাণ করেন। ওই সব মন্দিরের ভেতরে জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখা হয়।

কড়িধ্যায় প্রাচীন কাল থেকেই নানা পুজোপার্বণ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তার মধ্যে অন্যতম সরস্বতীপুজো। অতীতে কড়িধ্যা গ্রামে সেন বংশের জমিদারি ছিল। আর সেন পরিবারের পাশাপাশি এই গ্রামে বসবাস করেন নন্দী বংশের সদস্যরাও। আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে সীতানাথ নন্দী বীরভূমের দুবরাজপুর থেকে চলে আসেন কড়িধ্যা গ্রামে এবং সেই সময় থেকে তিনি শুরু করেন মা সরস্বতীর পুজো। তখনকার দিনে সীতানাথ নন্দী ছিলেন বীরভূম জেলার অন্যতম উচ্চশিক্ষিত মানুষ। তাঁর কাছে বহু পড়ুয়া আসত শিক্ষা গ্রহণের জন্য। সেই থেকে নন্দীবাড়ির কুলদেবী হন মা সরস্বতী।

নন্দীবাড়ির প্রতিমায় কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। এখানে দেবী পদ্মাসনা এবং তাঁর পাশে রয়েছেন জয়া এবং বিজয়া। একচালার সাবেকি প্রতিমা নানা পারিবারিক গহনায় সাজানো হয়।

পুজোর দিন সকালে বাড়ি সংলগ্ন পুকুর থেকে দেবীর ঘটের জল আনা হয় এবং তার পর শুরু হয় পুজো। পুকুরের জল আনার সঙ্গে সঙ্গে লাটাইয়ের সুতো ছাড়তে ছাড়তে মন্দির পর্যন্ত সুতো নিয়ে আসা হয় – এ এক বিশেষ প্রথা নন্দীবাড়ির। দেবীকে নানা রকমের ফল, মিষ্টি ইত্যাদি ভোগ দেওয়া হয়। সরস্বতীপুজোয় ঢাকিরা  বংশপরম্পরায় ঢাক বাজিয়ে আসছেন নন্দীবাড়িতে।

সরস্বতীপুজোর দিন দুপুরে সাধারণত নিরামিষ খাবার খাওয়া হয়, কিন্তু নন্দীবাড়িতে পুজোর পর দুপুরবেলায় ভাত-মাছ খাওয়ার রীতি রয়েছে। পুজোর দিন সন্ধ্যাবেলায় আরতির সময় রুপোর থালায় লুচিভোগ ও মিষ্টি নিবেদন করা হয় এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয়।

মুকুরী সপ্তমীর দিন চণ্ডীপাঠ হয় এবং বারি-ঘট বিসর্জনের মাধ্যমে পুজোর সমাপ্তি ঘটে। সেই দিন দই-চিঁড়ে নিবেদন করা হয়, সিঁদুরখেলা হয় এবং বিকালে গোটা গ্রাম প্রদক্ষিণ করে প্রতিমা বিসর্জন হয়।

এ বছর করোনা ভাইরাসের কারণে প্রসাদ বিতরণ বন্ধ থাকবে এবং বিসর্জনে গ্রাম প্রদক্ষিণের যে প্রথা রয়েছে সেটাও বন্ধ থাকছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য সৌরভ নন্দী। প্রশাসনের সমস্ত রকম নিয়ম মেনেই পুজো হবে। বাইরের দর্শনার্থীদের প্রবেশ এ বছর বন্ধ রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: বাহন ছাড়াই বীণাপাণির আরাধনা হয় উত্তর কলকাতার বটকৃষ্ণ পালের বাড়িতে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন