এক লক্ষ কোটি বছর আগে চাঁদেও ছিল চৌম্বকীয় শক্তি, বলছে গবেষণা

0
moon
ছবি -ইন্টারনেট

ওয়েবডেস্ক: প্রায় এক লক্ষ কোটি বছর আগে অভ্যন্তরীণ ডায়নামো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে চাঁদ তার চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি হারিয়ে ফেলে ছিল, এমনটিই পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। চাঁদ থেকে সংগ্রহ করা পাথর বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, কী ভাবে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। তাঁদের মতে, সম্ভবত চাঁদের কেন্দ্রটি পুরোপুরি ভাবে স্ফটিকে আকার ধারণ করার পরে এই বিশেষ শক্তিটি হারিয়ে গিয়েছে।

এমআইটির ডিপার্টমেন্ট অব আর্থ, অ্যাটমোস্ফিয়ারিক এবং প্ল্যানেটারি সায়েন্সের সৈয়দ মিঘানির নেতৃত্বে বিজ্ঞানীদের একটি দল এবং চিনের ইউনিভার্সিটি অব জিওসায়েন্সের হুয়াপেই ওয়াং এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁরা বেশ কয়েক বছর ধরে চাঁদের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র নিয়ে গবেষণারত ছিলেন।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, পৃথিবীর একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্র রয়েছে। এই ক্ষেত্রটি পৃথিবীকে সূর্য থেকে আগত চার্জযুক্ত কণার প্রবাহ থেকে রক্ষা করে। মনে করা হয়, পৃথিবীর কেন্দ্রে বিভিন্ন ধাতুর তরল স্রোত একটি বৈদ্যুতিক স্রোত উৎপন্ন করে, যা এই ম্যাগনেটিক বা চৌম্বকীয় শক্তির উৎস।

মনে করা হয়, চার লক্ষ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সঙ্গে মঙ্গলের আকারের একটি মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের ফলে চাঁদ সৃষ্টি হয়েছিল। তার পর সেই বিচ্ছিন্ন অংশই মাধ্যাকর্ষণের ফলে পৃথিবীর উপগ্রহ রূপে তার চার পাশে ঘুরে চলেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে চাঁদ পৃথিবীর অনেক কাছে ছিল। কিন্তু ক্রমশ সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে গিয়েছে। শুধু তাই নয় এখনও দূরে সরে যাওয়ার এই প্রক্রিয়া চলছে। সরে যাওয়ার এই মাত্রা হল বছরে এক ইঞ্চি করে।

গবেষক লেখক বেঞ্জামিন ওয়েইস নিউজউইককে বলেছেন, সূর্য থেকে এক সুপারসোনিক প্লাজমা নির্গত হয়। চাঁদের একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র তার ভূপৃষ্ঠকে সূর্যের এই সুপারনোনিক প্লাজমা থেকে রক্ষা করত। তার ফলেই চাঁদের পৃষ্ঠ, বায়ুমণ্ডল ও আবহাওয়া সৌর গ্যাসে পরিপূর্ণ হতে পারেনি। কিন্তু এখন সেই শক্তিশালী ক্ষেত্রটি আর নেই। তাই এখন এর পৃষ্ঠ বায়ুমণ্ডল ও আবহাওয়া সৌর গ্যাসে পূর্ণ। তবে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি কী তৈরি করেছিল এবং ডায়নামো কখন বন্ধ হয়েছিল তা অবশ্য জানা যায়নি।

একটি গবেষণায় গবেষকরা লক্ষ করেছিলেন, চার লক্ষ কোটি বছর আগে চাঁদের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র ছিল ১০০ মাইক্রোটেসলা। এই পরিমাণ বর্তমানে পৃথিবীর শক্তির দ্বিগুণ।

এমআইটি প্রযুক্তি পর্যালোচনা রিপোর্টে বলা হয়েছে, চাঁদের পাথরগুলির নমুনা দেখে বোঝা গিয়েছে, বেশিরভাগই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে শিলাগুলি ঠাণ্ডা ও শক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোটো ছোটো পদার্থগুলি চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের দিকে একত্রিত হতে থাকে।

যদিও অগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা তিন লক্ষ কোটি বছর আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই তিন লক্ষ কোটি বছরের চাঁদের ইতিহাস কিছুই জানা যায় না, প্রায় রহস্যঘন। কারণ সেখানে কোনো পাথরের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে ২০১৭ সালে ওয়েইস এবং তাঁর সহকর্মীরা কিছু প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন। এই প্রমাণ বলছে সাড়ে দুই লক্ষ কোটি বছর আগে চৌম্বকীয় শক্তি কমে ১০ মাইক্রোটেলসা হয়ে গিয়েছিল।   

পড়ুন – মানবহৃদয়ের পেশিকোষগুলি মহাকাশে অন্য রকম আচরণ করে: গবেষণা

আরও একটি পাথরে তাঁরা দেখতে পেয়েছেন, এক লক্ষ কোটি বছর আগের প্রমাণ। দেখা গিয়েছে, এই সময়ে চাঁদের ম্যাগনেটিক ফিল্ডের ক্ষমতা কমে সর্বাধিক ০.১ মাইক্রোটেসলায় এসে পৌঁছেছে। এর থেকেই তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে, দেড় লক্ষ কোটি থেকে এক লক্ষ কোটি বছর আগে চাঁদের কেন্দ্রের ম্যাগনেটিক ফিল্ড বা চৌম্বকীয় শক্তি উৎপাদনকারী ডায়নামো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ওয়েইস বলেছেন, চাঁদের এই ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরির ডায়নামোটি কম পক্ষে দুই লক্ষ কোটি বছর সক্রিয় ছিল। তিনি বলেন, চাঁদও একটি মহাজাগতিক বস্তু। আর পাঁচটি মহাজাগতিক বস্তুর ঠাণ্ডা হওয়ার পদ্ধতি মেনে চাঁদও ঠাণ্ডা হয়েছে। তিনি বলেন, মঙ্গল চাঁদের দ্বিগুণ। অনুমান করা যায় মঙ্গলের ডায়নামো প্রায় চার লক্ষ কোটি বছর আগেই থেমে গিয়েছে। সে ক্ষেত্রে চাঁদের ডায়নামো অস্বাভাবিক ভাবে দীর্ঘস্থায়ী ডায়নামো বা শক্তি উৎস সক্রিয় ছিল।

পড়ুন – নয়ের দশকের থেকে ৭ গুণ দ্রুত বরফ গলছে গ্রিনল্যান্ডে: গবেষণা

এই গবেষণা থেকে উঠে আসছে, মোট দুই রকমের শক্তির উৎস ছিল চাঁদে। এক ছিল পৃথিবীর অনেক কাছে অবস্থানের জন্য পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি চাঁদের কেন্দ্রের ডায়নামোকে উজ্জীবিত করে রেখেছিল। দুই পরবর্তী ক্ষেত্রে পৃথিবীর মাধ্যকর্ষণের প্রভাব কাটিয়ে দূরে সরে গেলেও চাঁদের কেন্দ্রে তরল ধাতু কঠিন হওয়ার পদ্ধতি সক্রিয় ছিল। সেই স্ফটিকীকরণ পদ্ধতির কারণে ডায়নামো সক্রিয় ছিল। পরে ক্রমশ তরল ধাতু কঠিন হতে হতে এক সময় সম্পূর্ণ কঠিনে পরিণত হয়েছে ও ডায়নামো তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে  

তবে তিনি বলেছেন, এই ডায়নামোর কাজটি সম্পর্কে অর্থাৎ ডায়নামো যদি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় বা তার আগের পর্যায়ে ‘স্টপ স্টার্ট রেজিমে’ থাকে তা হলে সে সম্পর্কে আরও ভালো করে জানতে হবে। তার জন্য ছোটো ছোটো ও কম প্রাচীন পাথর নিয়ে আরও ভালো করে আরও অনেক গবেষণা প্রয়োজন। এই বিষয়ে ও তার বাইরে জানতে পারার ব্যাপারে গবেষকরা আশাবাদী। তাঁরা অ্যাপোলো স্যাম্পেলগুলিকে কাজে লাগিয়ে এই বিষয়ে ও প্রাচীন চাঁদের বিষয়ে জানার চেষ্টা করবেন।  

পড়ুন – ফিরে দেখা ২০১৯ : মহাকাশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.