রবিবারের পড়া: মাটির পাঁচ কিলোমিটারেরও নীচে এক অমর জীবজগৎ

0
microbes found in subterranean biosphere
ভূগর্ভস্থ জীবজগতে অজানা জীবাণু। ছবি সৌজন্যে লাইভ সায়েন্স।

দীপঙ্কর ঘোষ

কিছু দিন আগেই মাটির পাঁচ কিলোমিটারের‌ও নীচে ভয়ংকর তাপমাত্রায় আলো-বাতাসহীন, খাদ্যহীন পরিস্থিতিতেও প্রায় অমর অচেনা এক বিরাট জীবজগতের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। এই জীবজগতের আয়তন প্রায় আমাদের সব ক’টা মহাসাগরের সম্মিলিত পরিমাণের দ্বিগুণ। আর মোট‌ ওজন পনেরো থেকে চব্বিশ বিলিয়ন (হিসেব করে নিন ১ বিলিয়ন মানে ১০০ কোটি) টনেরও বেশি। এটুকুই এখনও পর্যন্ত জানা গিয়েছে। হয়তো আরও বড়ো আরও বিস্তৃত‌ এই জীবজগত। পুরো ব্যাপারটা জানতে হলে আমাদের যেতে হবে সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার এক বিস্তীর্ণ পাথুরে অঞ্চলে।

দক্ষিণ আফ্রিকার কাপভাল ক্রেটন। দুই মহাদেশের অন্তর্বর্তী ক্রিস্টাল পাথরের তৈরি এক বিস্তীর্ণ পাথুরে এলাকা। জুরাসিক যুগের পাথরও সেখানে পাওয়া যায়, এমনকি প্রিক্যাম্ব্রিয়ন যুগের পাথর‌ও সেখানে পাওয়া গিয়েছে। সাধারণ ভাবে এই পাথরগুলোর বয়স ৫৪০ মিলিয়ন বছর বলে ধরা হয়। (মনে করিয়ে দিই ১ মিলিয়ন মানে ১০ লক্ষ)।পরীক্ষায় জানা গিয়েছে কোনো কোনোটা আবার দুই থেকে তিন বিলিয়ন বছরের‌ পুরোনো !

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: বাঁচতে হলে ভাবতে হবে

ব্যাপারটা জটিল। একটা বিশেষ ক্রিস্টাল পাথরের অঞ্চলে কোটি বছরের পুরোনো পাথর! এই প্রাচীন ক্রিস্টালাইন বেড রক জাতীয় পাথর পৃথিবীর মাটির স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখে। এগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার সন্নিহিত অঞ্চলে একটা টেকটনিক প্লেট তৈরি করে রেখেছে অর্থাৎ এই সেই প্লেট যার নড়াচড়ায় তৈরি হয় ভূমিকম্প, ওঠে সুনামি। অস্থির হয়ে ওঠে পৃথিবী। ধ্বংস হয়ে যায় জনপদ। আবার সেই রুক্ষ  জায়গার পাশেই আছে এক সোনার খনি, তার নাম Mponeng (বাংলা উচ্চারণ সম্ভবত এমপনেং)। এই সোনার খনি চার কিলোমিটার গভীর। এই খনিতে দু’টো স্বর্ণ-ধাপ (gold reef) আছে। এর এক টন মাটিতে দশ গ্রাম সোনা পাওয়া গেলেই কোম্পানি লাভের মুখ দেখে। তাই মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে সোনার খনি। খুঁড়তে গিয়ে নিয়মিত মাটি পরীক্ষা করা হয় যাতে টেকটনিক প্লেটের কোনো ক্ষতি না হয়।আর এই খোঁড়াখুঁড়িতেই প্রথম এই প্রাচীন অজানা এক অদ্ভুত জীবজগতের খোঁজ পাওয়া যায়। এক অদ্ভুত ধরনের জীব, যাদের সঙ্গে পৃথিবীর কোনো প্রাণীর মিল নেই। এরা কেউ এককোষী, কেউ বহুকোষী বা অ্যার্কিয়া। ব্যাপারটা বিজ্ঞানীদের চমকে দেয়। তার পর বাহান্নটা দেশের এক হাজার দু’শো বৈজ্ঞানিক ডিপ কার্বন অবজারভেটরি চালু করে সেখান থেকে কাজ আরম্ভ করেন।

এ বিষয়ে আরও জানার জন্যে অবশেষে আরও অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা মিলে একটা প্রকল্প চালু করেন।  আমেরিকার শক্তি বিষয়ক মন্ত্রক এবং সুইডেনের ক্রিস্টালাইন বেড রক এই গবেষণায় অর্থ সাহায্য করতে শুরু করে। এই কেন্দ্র চালু হয়েছে অ্যাটলান্টিক উপকূলবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলিনায়। ক্যারেন লয়েড (অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অফ টেনেসি, নক্সভিলা) এই প্রকল্পের কর্ণধার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে ভূতাত্ত্বিক, জীববিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, সবাই মিলে এই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। জাপানি জাহাজ চিকায়ু তার যন্ত্রপাতি নিয়ে সমুদ্রের বহু গভীরে গর্ত খুঁড়ছে। অর্থাৎ জোর কদমে কাজ চলছে।

অজানা জীবাণু। ছবি সৌজন্যে সায়েন্স অ্যালার্ট।

বিজ্ঞানীরা আশ্চর্য হয়ে ভাবছেন, পৃথিবীর এত গভীরে অক্সিজেন ছাড়া, আলো ছাড়া, প্রাণের অস্তিত্ব কী ভাবে সম্ভব? মাটির বহু নীচে অবস্থান। এই অঞ্চলের নাম তাই সাবটেরেনিয়ান বায়োস্ফিয়ার। আবার যে হেতু আলোহীন এক গভীর অন্ধকারে রয়েছে এই জীবজগৎ, তাই অনেকেই একে ডার্ক বায়োস্ফিয়ার‌ও বলেন। দেখা যাচ্ছে এরা মিথেনোজেন। অর্থাৎএদের অক্সিজেন লাগে না। কিন্তু তাপমাত্রা? দু’শো পঞ্চাশ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় এরা দিব্য বেঁচে আছে। অথচ অন্য সব প্রাণী ওই তাপমাত্রায় মরে ভূত হয়ে যায়। এ ছাড়াও এরা যে পরিমাণ মাটির চাপ শরীরে বহন করে চলেছে তাতে অন্য সব প্রাণীই চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাবে। অথচ এরা বেঁচে আছে। শত সহস্র বছর ধরে বেঁচে আছে।

এদের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এদের মৃত্যু নেই। এরা সমস্ত চাপ-তাপ সহ্য করে শত সহস্র বছর ধরে বেঁচে আছে। কেবলমাত্র শরীরের ধ্বংস হ‌ওয়া অংশটুকু সারিয়ে নেয়, তার পর অতি ধীর গতিতে নিজেদের জৈবক্রিয়া চালিয়ে যায়। এদের শ্বাসপ্রশ্বাস আর সমস্ত শারীরিক কাজকর্ম অত্যন্ত ধীরে ধীরে হয়। তাই অনন্ত কাল ধরে বেঁচে থাকে। সে কারণেই প্রথম এদের সন্ধান পাওয়া যায় অতি প্রাচীন পাথরের মধ্যে। এখন দেখা যাচ্ছে গোটা পৃথিবীর সমস্ত জায়গায় মাটির তলায় এরা আছে। এমনকি সমুদ্রের গভীরতম অঞ্চলের মাটির দু’ কিলোমিটার নীচে পর্যন্ত মাটি খোঁড়া সম্ভব হয়েছে। সেখানেও ওরা আছে। এবং বহাল তবিয়তেই আছে। হয়তো কোনো দিন মাটির ওপরে এসে ওরা বাঁচতে শিখে যাবে। তখন এই অচেনা প্রাণীজগতের আচার-আচরণে হয়তো মানবপ্রজাতি বিপন্ন হয়ে পড়বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here