সন্তোষ সেন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শব্দটি এই একবিংশ শতাব্দীতে বহু আলোচিত ও বিতর্কিত। ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয়ে গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল, টেসলার মতো বহুজাতিক কোম্পানি ও বিশেষ করে আমেরিকা, ইউরোপ, চিন, জাপানের মতো তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর হাত ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (artificial intelligence বা AI) প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ আশির দশকের মধ্যেই বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ভারত সরকারও ২০১৮-এর বাজেট এআই, মেশিন লার্নিং, রোবটের গবেষণা ও এর সার্বিক ব্যবহারের জন্য নীতি আয়োগকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতি ঘোষণা করার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারের মুখপাত্র বলেছেন জানাচ্ছেন, “এ আই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার আমরা অনেক পিছিয়ে শুরু করছি, কিন্তু সামরিক বাহিনীতে এর ব্যবহারের বিস্তর সুযোগ আছে।”

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: লেজারের ফ্রেমে বন্দি ব্যাক্টেরিয়া

বিজ্ঞানের চরম উন্নতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমানে স্বাস্থ্য পরিষেবার জগতে সত্যিই বিপ্লব ঘটানো সম্ভব, বিশেষ করে ক্যানসার চিকিৎসায়। সম্ভব শিক্ষার জগতে আমূল পরিবর্তন ঘটানো। সত্যিই শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধার অবদান তো প্রমাণিত। ডিজিটাল মানি, ইবুক, ফোনে অ্যাপ বুক করা, গুগল সার্চ ইঞ্জিনের ব্যবহার তো আজ সর্বজনবিদিত। স্থায়ী সম্পদে কোনো রকম বিনিয়োগ না করেই কেবলমাত্র এআই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উবের, ওলার মতো কোম্পানিগুলোর লক্ষ কোটি টাকার মুনাফা তো আমরা সকলেই জানি।

ক্লান্তিকর, একঘেয়ে, যান্ত্রিক কাজ থেকে মুক্ত করে সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মানুষের অবদানকে চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। যান্ত্রিক কাজগুলো যন্ত্র, রোবট দিয়েই তো হতে পারে। মানুষ তার অমূল্য সময়, কৃত্রিম মেধা ও উন্নত মস্তিষ্ক ব্যবহার করে মহাকাশের অপার রহস্য উন্মোচন করুক, সমুদ্রগর্ভ থেকে তুলে আনুক হাজার হাজার না-জানা রহস্যের চাবিকাঠি।এআই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হোক, আজকের জ্বলন্ত সমস্যা, প্রকৃতি-মানুষের দ্বন্দ্বের সঠিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধানের কাজে।

কিন্তু আমাদের চাওয়াগুলো, সাধারণ মানুষের চাওয়াগুলো তো পুঁজিপতিদের চাওয়া হতে পারে না। তাই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ প্রযুক্তিতে তৈরি রোবটকে যখন, যতটা খুশি, যে ভাবে খুশি ব‍্যবহার করে লক্ষ কোটি মানুষের কর্মচ‍্যুতি ঘটিয়ে পুঁজিপতিরা চাইবেনই মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলতে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: মহাকাশে চাক্কা জ্যাম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত বিশারদরাই বলছেন আগামী ২০২০ সালের মধ্যে আমেরিকায় ৪৯ শতাংশ মানুষ কর্মছুট হবেন। চিন, ভারতের মতো দেশে যা প্রায় সত্তর শতাংশে পৌঁছোবে। এটা ঠিক যে, কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার বানানো, বিভিন্ন যন্ত্র বা রোবট তৈরি এবং তাদের চালানোর জন্য নতুন কিছু চাকরির সংস্থান হবে। কিন্তু এই কর্মকাণ্ডে খুব কম সংখ্যক প্রশিক্ষিত লোকের কর্মসংস্থান হবে। অন্য দিকে ব্যাপক হারে কৃত্রিম মেধার প্রযুক্তি ও রোবটের ব্যবহারের ফলে বিশ্ব জুড়েই কোটি কোটি মানুষ কাজ হারাবেন। শুধু কারখানার মজুর-শ্রমিক নয়, কাজ হারাবেন অফিস-কর্মচারীও। এমনকি আগামী দিনে ডাক্তার ও শিক্ষকদের উপরও কোপ পড়বে। বলা বাহুল্য, দেশে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের উপর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, তাঁরা কাজ হারানোর আশঙ্কায় ভুগছেন। আসুন, আমরা আওয়াজ তুলি, পুঁজির সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার মরিয়া প্রচেষ্টা নয়, বিঞ্জান, প্রযুক্তির চরম বিকাশকে কাজে লাগানো হোক মানুষ তথা সমাজের সার্বিক বিকাশের স্বার্থেই। আর এ কাজ ঘটাতে হবে ওদের কবল থেকে বিজ্ঞান প্রযুক্তির তথা নকল মেধার প্রযুক্তিকে মুক্ত করে এর সামাজিককরণের মধ্যে দিয়েই।

আলোচনা করুন, বাস্তবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কী ভাবে বিশ্বপুঁজির কবরে শেষ পেরেক ঠুকে বিশ্ব থেকেই চিরতরে পুঁজিবাদকে হটিয়ে দেওয়া যায়। কাজ হারানো লক্ষ কোটি মানুষকে সর্বজনীন মূল আয় (Universal Basic Income বা UBI) বা অন্যান্য দান খয়রাত করে কি পুঁজির সঞ্চলনকে আজ আর টিকিয়ে রাখা যাবে?

সকলের মূল্যবান মতামতের মধ্যে দিয়েই আসুন উত্তর খুঁজি এই সব জ্বলন্ত প্রশ্নের। তাই আসুন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তার প্রযুক্তি নিয়ে জানা বোঝার চেষ্টা করি, প্রশ্ন রাখি। প্রশ্ন, পরিপ্রশ্ন বিতর্ক আমাদের আরও সমৃদ্ধ করবে।

(লেখক সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলের সিনিয়র ফিজিক্স টিচার)

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন