রবিবারের পড়া: কৃষ্ণগহ্বরের ছায়াছবি

0
photograph of blackhole
কৃষ্ণগহ্বরের ছবি।

সন্তোষ সেন

২০০ জন বিজ্ঞানী মিলে এ বছর ১০ এপ্রিল ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলেছেন। ব্ল্যাকহোলের ছবি না বলে বরং ব্ল্যাকহোলের প্রতিবিম্ব বলাই যুক্তিসঙ্গত। ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ কর্তৃপক্ষের তরফে চারটে মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আটটা বড়ো বড়ো রেডিও টেলিস্কোপ বসানো হয়েছিল। রেডিও টেলিস্কোপগুলির সাহায্যে ব্ল্যাকহোলের এই প্রতিবিম্ব পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, ব্ল্যাকহোল কী।

আমরা জানি, নক্ষত্রের মধ্যে নিউক্লিয়ার ফিউশন চলতে থাকে দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি তাপমাত্রায়। আইনস্টাইনের সমীকরণ E=MC2-এর হিসেবে নক্ষত্র থেকে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি বিকিরণ হয় তার ফলে নক্ষত্রের অন্তর্মুখী অভিকর্ষ সামঞ্জস্যে থাকে। যে সব নক্ষত্র শক্তি বিকিরণ করে, এই কারণেই তাদের আকার নিজস্ব অভিকর্ষে ছোটো হয়ে যায় না। কিন্তু নক্ষত্রের মৃত্যুর পর অর্থাৎ যখন নক্ষত্রের সব জ্বালানি শেষ হয়ে যায় (সব হাইড্রোজেন হিলিয়ামে এবং হিলিয়াম থেকে অন্যান্যতে পরিণত হয়ে যায়), তখন তারা সঙ্কুচিত হতে থাকে নিজস্ব অভিকর্ষের অন্তর্মুখী টানে। যে সব নক্ষত্র আমাদের সূর্যের থেকে ১.৪৪ গুণ বড় (চন্দ্রশেখর লিমিট), তাদের সঙ্কোচন এতটাই হয় যে, তত্ত্বগত দিক (ম্যাথমেটিক্যালি) থেকে বলা যায় তাদের আয়তন প্রায় শূন্য কিন্তু ঘনত্ব প্রায় অসীম। চন্দ্রশেখর লিমিটের নীচে যে সব নক্ষত্র, তাদের পরিণতি অন্য রকম হয়। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে স্থানকালের বক্রতা (১৯১৫) অনুযায়ী, উচ্চভরসম্পন্ন বস্তুর চার দিকের স্থানকাল এতটা বেঁকে যায় যে, সেখানে আলোর সরলরৈখিক গতিপথও বেঁকে যায়। এ বার যে সব নক্ষত্রের পরিণতি, আয়তন প্রায় শূন্য কিন্তু ঘনত্ব প্রায় অসীম, তাদের চার দিকের স্থানকাল এতটাই বেঁকে যায় যে, ওই বক্রতায় আলো প্রবেশ করলে তা প্রায় শূন্য আয়তনে সঙ্কুচিত প্রায় অসীম স্থান অতিক্রম করে বেরিয়ে আসবে অসীম সময় পর। অর্থাৎ, সেখানে যা কিছু প্রবেশ করে, সেগুলো বেরিয়ে আসে না। যেন, অন্ধকার গর্ত, একেই বলে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল।

ব্ল্যাকহোল থেকে তো আলো বেরিয়ে আসতে পারে না, তা হলে ব্ল্যাকহোলের ছবি তোলা সম্ভব হল কী করে? ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্র থেকে যে দূরত্ব অতিক্রম করলে আর বেরিয়ে আসা যায় না, ব্ল্যাকহোলের চার দিকে সেই দুরত্বের গোলোককে বলে ‘ইভেন্ট হরাইজন’ বা ‘ঘটনা দিগন্ত’। যে কোনো বস্তু (গ্রহ, উল্কা, নক্ষত্র, বা অন্যান্য জ্যোতিষ্ক বা পদার্থ) যখন ‘ঘটনা দিগন্ত’-এর কাছাকাছি চলে যায়, তারা প্লাজমা অবস্থায় চলে যায়, অর্থাৎ পদার্থের পরমাণুগুলো ইলেকট্রন, প্রোটোন ও নিউট্রনে ভেঙে যায়। সেখান থেকে সব রকম তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ (ইলেক্ট্রো ম্যাগেনেটিক ওয়েভ) বিকিরণ হতে পারে। ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো আলো আসতে পারে না বলে যে হেতু ব্ল্যাকহোল দেখা সম্ভব নয়, তাই ব্ল্যাকহোলের ছবি মানে সেই ‘ঘটনা দিগন্ত’-এরই প্রতিবিম্ব যার মাঝে রয়েছে অন্ধকূপের মতো কৃষ্ণগহ্বর। ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ ব্যবহার করে ২০০ জন বিজ্ঞানী গত দশ বছরের চেষ্টায় মেসিয়র ৮৭ নীহারিকার কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোলের ‘ঘটনা দিগন্ত’-এর মানচিত্র বের করতে পেরেছেন। মেসিয়র ৮৭ নীহারিকা আমাদের থেকে ৫৩৪ কোটি ৯০ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে। এর কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোলের ভর আমাদের সূর্যের ২ লক্ষ ৪০ হাজার গুণ।

Shyamsundar

ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ প্রধানত দুটো ব্ল্যাকহোলের ওপর নজর রাখছিল, একটা বর্তমান আলোচ্য মেসিয়র ৮৭-এর কেন্দ্রে, আর একটা আমাদের নীহারিকা স্যাজিটেরিয়াস এ-র কেন্দ্রে । কিন্তু আমাদের নীহারিকার কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোল অতটা শক্তিশালী নয়, তাই পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়নি স্যাজিটেরিয়াস এ-কে নিয়ে। ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ কর্তৃপক্ষের তরফে আটটা রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে মেসিয়র ৮৭ নীহারিকার কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোল থেকে আসা উচ্চ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেতার তরঙ্গ (রেডিও ওয়েভ) গ্রহণ করা হয়েছে। ওই রেডিও টেলিস্কোপগুলো থেকে পাওয়া সব তথ্য একত্র করে উন্নত প্রযুক্তির সফটওয়্যারে সেগুলোকে দৃশ্যমান আলোয় রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই ভাবে আমরা দানবাকার সক্রিয় ব্ল্যাকহোলের ‘ঘটনা দিগন্ত’-এর সম্পূর্ণ ছবি পেয়েছি। কোনো ক্যামেরা নয়, উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আমরা ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছি। এই ভাবে প্রযুক্তির উন্নতি আবার প্রমাণ করল, বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক তত্ত্বটি, স্থান-কালের বক্রতা। আর বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের ভরও হিসেব করতে সক্ষম আজ।

আরও পড়ুন প্রথমবার ব্ল্যাক হোলের ছবি প্রকাশ, আরও একবার সত্যি প্রমাণিত হতে চলেছেন আইনস্টাইন

এখন বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন, আমাদের মিল্কিওয়ে (আকাশগঙ্গা) নীহারিকার কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলতে, আর তার পর অন্য ব্ল্যাকহোলগুলোরও। মহাকাশ আর গভীর সমুদ্রগর্ভের রহস্য সন্ধানে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নতি আজীবন চলবে। আশা রাখি, বর্তমান সমাজে মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে অসঙ্গতির সমাধানও করবে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নতি।

অনুবাদ: গঙ্গোত্রী (এনআইএসসি)

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন