A technician works on a Kibble balance
কিবল্‌ ব্যালেন্সে কাজ করছেন এক জন প্রযুক্তিবিদ। ছবি বিআইপিএম-এর সৌজন্যে।
সন্তোষ সেন

২০ মে সোমবার ছিল আন্তর্জাতিক পরিমাপ দিবস। আর সে দিন থেকে বদলে গেল কিলোগ্রাম, অ্যাম্পিয়ার, কেলভিন ও মোল-এর সংজ্ঞা। এগুলো যথাক্রমে ভর, তড়িৎপ্রবাহ, তাপমাত্রা ও পদার্থের অণু/পরমাণুর এসআই একক বা ইউনিট।

প্রথমে দেখা যাক এসআই ইউনিটা ঠিক কী? বিভিন্ন দেশে ইউনিট মাপার বিভিন্ন সিস্টেম চালু ছিল – যেমন, সিজিএস (সেন্টিমিটার-গ্রাম-সেকেন্ড), এফপিএস (ফুট-পাউন্ড-সেকেন্ড), এমকেএস (মিটার-কিলোগ্রাম-সেকেন্ড) ইত্যাদি। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বিজ্ঞান যত বেশি করে আন্তর্জাতিক আঙিনায় পা রাখল, তত বেশি করে প্রয়োজন হয়ে পড়ল ইউনিট মাপার একটি এবং কেবলমাত্র একটি সিস্টেমের। তাই ১৯৬০ সালের ১৪ অক্টোবর প্যারিসে ডাকা হল ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অফ ওয়েট অ্যান্ড মেজারমেন্ট। এই বৈঠকে ঠিক হল, এখন থেকে বিশ্ব জুড়ে মূলত একটি সিস্টেম বজায় থাকবে যা হল ইন্টারন্যাশনাল সিস্টেম বা এসআই, ফরাসি ভাষায় যার পোশাকি নাম ‘Systeme Internationale de Unite’। এই বৈঠকে এসআই সিস্টেমে ৭টি মৌলিক ভৌত রাশি ও তাদের ৭টি মৌলিক ইউনিট বা একক ঠিক করা হল।

কী সেই এককগুলো?

(১) মোল (পদার্থের পরিমাণ); (২) ক্যান্ডেলা (ঔজ্জ্বল্যের তীব্রতা); (৩) অ্যাম্পিয়ার (তড়িৎপ্রবাহ), (৪) কেলভিন (তাপমাত্রা); (৫) সেকেন্ড (সময়); (৬) মিটার (দৈর্ঘ্য) এবং (৭) কিলোগ্রাম (ভর)।

১৯৬০-এর পরে ১৯৬৪-তে আরও একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক করে এই ৭টি এককের সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করা হল। যেমন এক কিলোগ্রাম হল প্ল্যাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর ধাতুর একটি বিশেষ সিলিন্ডার, যা প্যারিসের উপকণ্ঠে শেভরে-তে ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অফ ওয়েটস অ্যান্ড মেজারস (আইবিডব্লিউএম)-এ রাখা ছিল তিন স্তরীয় ভল্টের মধ্যে।

প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এই বিশেষ ধাতু, আর কেনই বা এই বিশেষ ভল্ট? এই প্ল্যাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর ধাতুর তুলনায় অন্যান্য নির্দিষ্ট পরিমাণ পদার্থের ভর পরিবেশের সংস্পর্শে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কম-বেশি হয়ে যায়। এর পরেও এই বিক্রিয়ায় এই সংকর ধাতুর পরিবর্তনের যে ন্যূনতম সম্ভাবনা থাকে, সেটাও যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার জন্য এই বিশেষ ভল্টের ব্যবস্থা।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: কৃষ্ণগহ্বরের ছায়াছবি

কিন্তু মিটারের সংজ্ঞায় কোনো স্কেল ব্যবহার করা হল না। কারণ যে পদার্থেরই স্কেল হোক না কেন, তা মরশুম-ভেদে ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রায় ছোটো-বড়ো হবে, ফলে মিটারের পরিমাপ নির্দিষ্ট থাকবে না। এখানে সম্পূর্ণ বায়ুশূন্য মাধ্যমে আলোর যে গতিবেগ (২৯৯,৭৯২,৪৫৮ মিটার/সেকেন্ড) সেটাই ধার্য হল সংজ্ঞা হিসেবে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ বায়ুশূন্য মাধ্যমে আলো সেকেন্ডের এক ভাগের ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ ভাগ সময়ে যে দূরত্ব যায় তাকেই এক মিটার বলা হল। একই ভাবে ১৯৬৪ সালে সেকেন্ডর সংজ্ঞায় সিজিয়াম ক্লক ব্যবহার করা হল, অর্থাৎ সিজিয়াম- ১৩৩ পরমাণু থেকে যে তরঙ্গ বের হয় তাকে হিসেবে ধরে সেকেন্ডের পরিমাপ করা হল। এই পদ্ধতিতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা ৩০ হাজার বছরে এক সেকেন্ডেরও কম সময়।

এ বার ফেরা যাক কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞায়।

১৩০ বছর আগে প্ল্যাটিনাম-ইরিডিয়ামের যে সংকর ধাতুকে এক কিলোগ্রাম হিসেবে ধরা হয়েছিল তাতে মরচে পড়ে ভরের পরিবর্তনের কোনো রকম সম্ভাবনা না থাকলেও, বিজ্ঞানীদের বারবার হাতের ছোঁয়ায় আজ তার ভর ৫০ মাইক্রোগ্রাম কমে গেছে। এতে আমার আপনার শরীরের ভরের কোনো পরিবর্তন না হলেও বিজ্ঞানীমহলে আশঙ্কার মেঘ সৃষ্টি করেছে। কারণ বিজ্ঞান চায় নিখুঁত থেকে নিখুঁততম সংজ্ঞা। আর তাই কিলোগ্রামের মুকুটে জুটল নতুন পালক। ৫৭টি দেশের প্রতিনিধিরা ২০১৮ সালের সালের নভেম্বরে ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে মিলিত হয়ে বিজ্ঞানের জগতে আরও একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে এ বছর ২০ মে থেকে এক কিলোগ্রাম হিসেব করা হবে প্লাঙ্কের ধ্রুবক (h)  আর ফোটোনের ভরের সাহায্যে। এর নেপথ্যে আইনস্টাইনের অবদানটা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক।

শক্তি ও ভরের নিত্যতা সূত্র অনুসারে E=mc² — সমীকরণ (১)

যেখানে  E=শক্তি,  m=ভর আর c = সম্পূর্ণ বায়ুশূন্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগ। যদিও স্থির অবস্থায় ফোটোনের ভর শূন্য কিন্তু এই ফোটোন যখন বায়ু শূন্যমাধ্যমে যাতায়াত করে তার ভর দাঁড়ায়,

m=h/c×λ — সমীকরণ (২)। (E=mc² এবং E=hc/λ, এই দুই সমীকরণের সাহায্যে)।

এখানে এই h= প্লাঙ্কের ধ্রুবক = 6.625…×10-34 JS, এবং λ= তরঙ্গদৈর্ঘ্য। [λ, গ্রিক বর্ণ lambda]

আর তরঙ্গদৈর্ঘ্য হিসেবে সিজিয়াম 133 পরমাণু থেকে বিশেষ অবস্থায় বিকিরিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যেকে নেওয়া হল। এক নম্বর সমীকরণে h, c আর λ-এর মান বসিয়ে পাওয়া গেল, m=1.4…×1040

অর্থাৎ একের পিঠে ৪০টি শূন্য বসালে যতগুলো ফোটোন পাওয়া যাবে তার ভর হবে ১ কিলোগ্রাম। এখন  প্রশ্ন হল, এই ফোটনগুলোকে তো আর দাঁড়িপাল্লায় চড়ানো যাবে না। তা হলে মাপব কী ভাবে? তার নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক উপায়ও বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছেন। এই মাপার পদ্ধতি এবং অন্য তিনটি ইউনিট অর্থাৎ অ্যাম্পিয়ার, কেলভিন এবং মোলের নতুন সংজ্ঞা প্রসঙ্গে আমরা আলোচনা করব পরের কিস্তিতে।

(লেখক  বিজ্ঞানশিক্ষক ও বিজ্ঞানকর্মী, সম্পাদনা-সহায়তায় এনআইএসসি-র সদস্য গঙ্গোত্রী)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here