বাংলার গোকুলে

0

sambhuশম্ভু সেন

আরে, এ তো আর এক পঞ্চরত্ন মন্দির। তবে পোড়ামাটির প্রাচীন মন্দির নয়, একেবারে হাল আমলের ইট-বালি-সিমেন্টের। গা থেকে এখনও নতুনের গন্ধ যায়নি। তবে এই মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নেই। রয়েছে প্ল্যাটফর্ম, টিকিট কাউন্টার, স্টেশন মাস্টারের ঘর। এ হল গোকুলনগর স্টেশন, বাংলার গোকুল। হবে না-ই বা কেন ? মল্লভূমি বিষ্ণুপুর যদি গুপ্ত বৃন্দাবন হয়, তা হলে ঢোলসাগর থেকে প্রবাহিত যমুনা-তীরের গোকুলনগর কৃষ্ণভক্ত মল্লরাজাদের গোকুল হবে না কেন ? মল্লরাজ প্রথম রঘুনাথ সিংহ এখানেই তৈরি করেছিলেন গোকুলচাঁদ শ্রীকৃষ্ণের মন্দির। আর সেই ঐতিহ্য মেনেই এখানকার স্টেশনটিও মন্দিরের আদলে তৈরি। এ-ও এক দ্রষ্টব্য। 

gtemple   

একটু আগে জোর এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। আমরা তখন এই রাঢ়ের মাটিতে বিরসা মুন্ডা হল্ট স্টেশনের খোঁজে। তথ্যটা পেয়েছিলাম নেট থেকে। এখানে এই নির্মীয়মাণ বিষ্ণুপুর-আরামবাগ রেলপথে আদিবাসী বিদ্রোহের নায়ক বিরসার নামে স্টেশন কেন ? এই কেন-র উত্তর খোঁজার জন্য এখানে সরেজমিন তত্ত্বতালাশে আসা। এবং এখানকার ভূপ্রকৃতি বুঝিয়ে দিল এ অঞ্চল তো ছোটনাগপুর মালভূমিরই এক প্রান্ত। সুতরাং বিরসার বিদ্রোহভূমির বাইরে নয়। তাই বিরসার নামে স্টেশনে দোষ কী ?  বৃষ্টির পর লাল মাটি থেকে কেমন একটা অন্য রকম গন্ধ উঠছিল। এ গন্ধ ঠিক সোঁদা নয়। পাহাড়-মালভূমিতে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি হলে শুখা মাটি থেকে যে গন্ধ ওঠে, সেই গন্ধটা। একটু যেন বুনো, মন-কেমন করা। এই বনবাসুদেবপুরের গ্রাম-জঙ্গলে মাটি-পথ হঠাৎ-আসা বৃষ্টিতে কিছুটা অগম্য। তাই হল্ট স্টেশনের অন্বেষণ ছেড়ে পুবের স্টেশন গোকুলনগরে চলে আসা।

স্টেশন-প্ল্যাটফর্ম থেকে পুব দিকে তাকাতেই গাছপালার মাঝ থেকে উঁকি মারল বাঁকুড়া জেলার বৃহত্তম মন্দিরটি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লাম সলদা-গোকুলনগর পথে। ডান দিকে কিছুটা গেলে রেল-ক্রসিং। রেল ক্রসিং-এর ঠিক আগে বাঁ দিকে অল্প দূরে অনুচ্চ এক ঢিবির ওপর গন্ধেশ্বর শিবের পুবমুখী পাথরের দেউল-মন্দির। এই দেবালয়ের যোনিপট্ট-সহ শিবলিঙ্গটি পশ্চিমবঙ্গে সম্ভবত সব চেয়ে বড়। গর্ভগৃহের ভিতরে এক কোণে মহিষমর্দিনীর এক অপূর্ব মূর্তি রাখা আছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এটি পাল যুগের।  নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে মন্দিরটির। এর ছাদ চারচালা ধাপ-পদ্ধতিতে বিন্যস্ত।

গন্ধেশ্বর শিব দর্শন করে রেলপথ পেরিয়ে কিছুটা যেতেই বাঁয়ে পড়ল গোকুলচাঁদের সেই পরিত্যক্ত মন্দির। জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়েছিল এই মন্দির। মন্দিরের গা থেকে গজিয়েছিল নানা গাছপালা। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬-তে পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ মাকড়া পাথরের এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটি দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ায় এটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। প্রথম দর্শনেই মন্দিরের দুর্গসম প্রাচীরটি রীতিমতো সম্ভ্রম জাগায়। পুব দিকের প্রাচীরের মাঝখানে রয়েছে প্রবেশদ্বার। অঙ্গনেই ঢুকতেই পুবমুখী মন্দিরের পুরো চেহারা নজরে আসে। উঠে পড়লাম মন্দিরের চারদিকের তিন খিলানযুক্ত বারান্দায়। এক চক্কর ঘুরে আসার পর বুঝলাম, গর্ভগৃহের চার দিকেও একটি অভিনব প্রদক্ষিণ-পথ আছে।

মন্দিরটি পাঁচ শিখরযুক্ত। কিন্তু এই শিখরগুলিরও বৈশিষ্ট্য আছে। চার কোণে চারটি শিখর চতুষ্কোণবিশিষ্ট আর যে শিখরটি মন্দিরের মধ্যমণি সেটি আটকোনা। এবং বাকি চারটির তুলনায় অনেক বড়ো। মন্দিরের সেই গর্বোন্নত শিরের দিকে নজর আগে পড়ে। মন্দিরের পুব ও দক্ষিণের দেওয়ালে যাই-যাই করেও কিছু অলঙ্করণ এখনও রয়ে গেছে। তার মধ্যে বর্গাকার প্যানেলে দশাবতার, কৃষ্ণলীলা ইত্যাদি সহজেই চিহ্নিত করা যায়। নৃত্যশৈলীর কিছু প্যানেলও নজরে আসে।

দক্ষিণের দেওয়ালে কার্নিশের নীচে ঠিক মাঝে যে প্রতিষ্ঠা-ফলকটি রয়েছে তা আজ পাঠোদ্ধার করা খুব দুরূহ। তবে মন্দিরের বাইরে পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের সাইনবোর্ড থেকে জানা যায়, এই মন্দির ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম রঘুনাথ সিংহের আমলে তৈরি।

মন্দির-অঙ্গনের দক্ষিণ দিক বরাবর নাটমণ্ডপ। বিশাল এক ভিত্তিবেদীর ওপর সুবিশাল পাথরের সৌধ। ছাদ পুরোপুরি ভেঙে গেছে, কিন্তু দেওয়াল এবং তিনটি ফুলকাটা খিলান আজও অক্ষত। এক কোণে রয়েছে ছাদে ওঠার সিঁড়ি।

গোকুলচাঁদের বিগ্রহ বহুকাল অন্তর্হিত। প্রাঙ্গণে এ-দিক ও-দিক ছড়িয়ে রয়েছে পাথরের অজস্র ফলক। কী ভাবে এই মন্দিরের ওপর অত্যাচার হয়েছে এই সব ফলকই তার প্রমাণ। এই মন্দির থেকে পাওয়া বেশ কিছু মূর্তি বিষ্ণুপুরে যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবনের সংগ্রহশালায় রাখা আছে। এর মধ্যে সব চেয়ে সুন্দর সম্ভবত কালো পাথরের ‘অনন্তশয়ানে বিষ্ণু’ মূর্তিটি। ‘প্রবাসী’র ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যায় রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই মূর্তির উল্লেখ করে লিখেছিলেন, “বাঁকুড়া জেলার জয়পুরের কাছে একটি মন্দিরপ্রাঙ্গণ থেকে একটি সুন্দর মূর্তি উদ্ধার করেছেন জে সি ফ্রেঞ্চ”।

সলদা-গোকুলনগর অঞ্চলে এক প্রাচীন সংস্কৃতির যে রমরমা ছিল তার প্রমাণ এখানকার ঘাটেবাটে আজও মেলে। গন্ধেশ্বর মন্দির থেকে গোকুলচাঁদ মন্দির যাওয়ার সময় পথের ধারে নজরে পড়ে এক বিরাট শিবলিঙ্গ। সলদার দিক থেকে রেল-ক্রসিং পেরিয়ে বাঁ দিকে রেলপথ বরাবর কিছুটা গেলে ডান দিকে পড়ে এক জলাশয়। এর পাশ দিয়ে ঝোপঝাড়ের মাঝ দিয়ে প্রায়-না-থাকা পথ দিয়ে হেঁটে এলে সন্ধান পাওয়া যায় সবুজ ক্লোরাইট পাথরের এক বরাহমূর্তির। হাত ভাঙা, পা-সহ দেহের অনেকটাই মাটিতে গাঁথা। মাথা-বুক এখনও অক্ষত। অক্ষত মাথার সাজসজ্জা ও গলার অলঙ্কার। চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে অসাধারণ এক মূর্তি। জায়গাটা দেখে মনে হয় এক সময় এখানে কোনও মন্দির ছিল। এই অঞ্চলের বহু গাছতলায় জৈন ও হিন্দু দেবদেবীর অজস্র মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। হয়তো ভবিষ্যতের কোনও পুরাতাত্ত্বিকের অনুসন্ধানের অপেক্ষায়।

gtk

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে হাওড়া থেকে আরামবাগ। সেখান থেকে অটোয় আরামবাগ বাস স্ট্যান্ডে এসে সেখান থেকে বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরগামী বাসে কোতুলপুরের কাছে সলদা মোড়। সেখান থেকে রিকশা বা ভ্যান রিকশায় গন্তব্য স্থানে। সব চেয়ে ভালো হয় আরামবাগ স্টেশন থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে  নেওয়া। 

কোথায় থাকবেন  

আরামবাগ, বিষ্ণুপুরে প্রাইভেট লজ, হোটেল আছে। বিষ্ণুপুরে থাকার সব চেয়ে ভালো ব্যবস্থা পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের টুরিস্ট লজ। অনলাইন বুকিং www,wbtdc.com ।

তবে থাকার পক্ষে চব চেয়ে ভালো জায়গা জয়পুরে হোটেল বনলতা। যোগাযোগ : ০৩২৪৪-২৪৯২৩৪, ০৯৭৩২১১১৭০৫, ০৯৭৩২১১১৭০৬। ওয়েবসাইট www.hotelbanalata.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here