দেওঘর-শিমুলতলা-গিরিডি

প্রথম দিন – চলুন দেওঘর। হাওড়া থেকে ট্রেনে চলুন জসিডি। এমনিতে হাওড়া থেকে জসিডি যাওয়ার এক গাদা ট্রেন রয়েছে। কিন্তু টিকিট পাওয়ার দিক থেকে সব থেকে ভালো ট্রেনটি হল পটনা জনশতাব্দী এক্সপ্রেস। ট্রেনটি রবিবার ছাড়া প্রতি দিন দুপুর ২:০৫-এ হাওড়া থেকে ছেড়ে জসিডি পৌঁছোয় সন্ধে সওয়া ছ’টায়। জসিডি থেকে দেওঘর ৯ কিমি।

দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিন – দেওঘর ঘোরাঘুরি ও রাত্রিবাস।


দেওঘরে কী দেখবেন
(১) দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম বৈদ্যনাথধাম শিবমন্দির। মন্দির চত্বরে লর্ড শিবের মন্দিরটি ছাড়াও আছে ২১টি মন্দির। মন্দিরের উত্তরে ১৫০ সিঁড়ির ক্ষীরগঙ্গা দিঘি।
(২) শহরের ক্লক টাওয়ার থেকে ১২ কিমি দূরে তপোবন। এখানকার ছোটো গুহায় তপস্যা করেছিলেন বালানন্দ ব্রহ্মচারী। এর দক্ষিণ-পুবে শিবকুণ্ড আর শূলকুণ্ড। ৩৫০ ফুট উপরে শিবঠাকুর। শিব বা প্রকৃতি, যার আকর্ষণেই হোক উপরে উঠলে ঠকবেন না।

(৩) করণীবাগে নওলাক্ষি মন্দির, শ্বেত পাথরে বালানন্দ ব্রহ্মচারীর মূর্তি।
(৪) আরও এক কিমি যেতে বীর হনুমানের সংকটমোচন মন্দির
(৫) ডাইনে আধ কিমি যেতে কুণ্ডেশ্বরী মন্দির, করিঙ্গাসুরের পিঠে সিংহাসীনা চতুর্ভুজা জগদ্ধাত্রী।
(৬) বমপাস টাউনে নবদুর্গা মন্দির
(৭) ক্লক টাওয়ার থেকে ২ কিমি ডাইনে উইলিয়ামস টাউনে শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম বিদ্যালয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ-সারদামা-স্বামীজির মন্দির
(৮) ক্লক টাওয়ার থেকে ৪ কিমি কাছারি রোডে ৯৫ সিঁড়ির নন্দন পাহাড়। রয়েছে মনোরঞ্জন পার্ক।
(৯) পথেই পড়ে সৎসঙ্গ নগর তথা ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আশ্রম।
(১০) দূর থেকে দেখতে হাতির মতো লাগে। তাই টিলার নাম হাতি পাহাড়। টিলার মাথায় শিব মন্দির। একটি ঝরনাও প্রবাহিত এই পাহাড় থেকে। এর জলে নাকি অনেক ওষধি গুণ আছে। তাই অনেকেই এর জল পান করেন।

(১১) চলুন ত্রিকুট পাহাড়। দুমকাগামী পথে ২০ কিমি দূরে ২৪৭০ ফুট উঁচু পাহাড়শিরে চলুন রোপওয়ে চড়ে। অনিন্দ্যসুন্দর নৈসর্গিক শোভা।

চতুর্থ দিনদেওঘর থেকে চলুন শিমুলতলা। দূরত্ব ৪১ কিমি। গাড়িতে যেতে পারেন। জসিডি থেকে মেমু ট্রেনেও শিমুলতলা পৌঁছোতে পারেন। জসিডি থেকে সকাল ১০টায় রয়েছে ঝাঁঝা মেমু। ট্রেনটি ১০:২৫-এ শিমুলতলা পৌঁছোয়। ১১:২০-তে রয়েছে কিউল মেমু। শিমুলতলায় ঘোরাঘুরি ও রাত্রিবাস।

পঞ্চম দিন – শিমুলতলায় ঘোরাঘুরি ও রাত্রিবাস।


শিমুলতলায় কী দেখবেন
এক সময়ে বাংলা সিনেমার শ্যুটিং স্পট শিমুলতলা – সত্যজিৎ রায়ের ‘মহাপুরুষ’, তরুণ মজুমদারের ‘দাদার কীর্তি’, ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রের শ্যুটিং স্পট।
(১) স্টেশন থেকে বেরোতেই বাঁ দিকে সেকালের হাউস অব লর্ডস অর্থাৎ লর্ড এস পি সিংহের বাড়ি, ডাইনে হাউস অব কমনস্‌। কথায় বলে, টিলা টিলা শিমুলতলায় ভিলা ভিলা বাড়ি। পাহাড়, প্রকৃতি, জলবায়ুর আকর্ষণে বাঙালি ছুটে আসত এই শিমুলতলায়। তারই চিহ্ন সর্বত্র ছড়ানো। পাহাড়, টিলা শাল, মহুয়ার মাঝে ঘুরে বেড়ান, উপভোগ করুন প্রকৃতি।


(২) স্টেশন থেকে দেড় কিমি দূরে লাটু পাহাড়। পায়ে পায়ে চলুন। পথে দেখুন দুর্গের আকারের বাড়ি পাটনা লজ, নলডাঙার রাজবাড়ি। ১০০০ ফুট উঁচু গাছগাছালিতে ভরা লাটুপাহাড়ে চড়ে দেখে আদিবাসী দেবতার স্থান। নয়নাভিরাম সূর্যাস্ত।
(৩) রেললাইন পেরিয়ে ৬ কিমি দূরে হলদি ফল্‌স
(৪) ১০ কিমি দূরে ধরারা, সূর্যাস্তে মনোরম।
(৫) রেললাইন পেরিয়ে ২ কিমি দূরে পাহাড়ি ঝোরা লীলাবরণ

(৬) ১৭ কিমি দূরে টেলবা নদী পেরিয়ে ধীরহারা ফল্‌স


ষষ্ঠ দিন – গন্তব্য গিরিডি, দূরত্ব ৮৯ কিমি। মধুপুরে ট্রেন পালটে আসা গেলেও সুবিধামতো কানেক্টিং ট্রেনের অভাব আছে। তাই গাড়ি ভাড়া করে চলে আসাই ভালো। রাত্রিবাস গিরিডি।


সপ্তম দিন ও অষ্টম দিন – গিরিডিতে ঘোরাঘুরি ও রাত্রিবাস।


নবম দিন – বাড়ির পানে ফিরুন। কলকাতা ফেরার জন্য গিরিডি লিঙ্ক এক্সপ্রেস ধরুন। ট্রেনটি প্রতি দিন রাত ১০:৫০-এ গিরিডি থেকে ছেড়ে কলকাতা স্টেশন পৌঁছোয় পরের দিন সাড়ে সাতটা।


গিরিডিতে কী দেখবেন


(১) বাঙালির আরেক পশ্চিম গিরিডি। বাঙালি উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল বারগান্ডায়। কে আসেননি এখানে? রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য গিরিডিতে বাড়ি ছিল প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, নলিনীরঞ্জন সরকার, সুনির্মল বসু প্রমুখের। এখানকার শান্তিনিবাস এখন স্মারকভিলা। হাওয়া বদল করতে এসে জগদীশচন্দ্র এখানেই মারা যান। প্রশান্তচন্দ্রের ‘মহুয়া’য় আজ হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ মহিলা বিদ্যালয়। নিচু দিয়ে বয়ে চলেছে উশ্রী নদী


(১) ধানবাদ-কুলটি সড়কে ৭ কিমি গিয়ে ডান দিকে আরও ৪ কিমি গেলে উশ্রী ফল্‌স। চলার পথে বেশ দূরে দেখা যায় পরেশনাথ পাহাড়। ভিউ পয়েন্ট থেকে নেমে বাঁ হাতি কিছুটা গেলে বোঝা যায় ঝরনার উচ্ছলতা।


(২) শহর থেকে ১০ কিমি দূরে খান্ডোলি পাহাড়, ড্যাম, পার্ক।


(৩) ৩০ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ডের উচ্চতম পাহাড় পরেশনাথ (৪৪৭৮ ফুট)। জৈনতীর্থ পরেশনাথ। সকাল সকাল বেরিয়ে পাহাড়ের পাদদেশ মধুবন পৌঁছে চড়া যেতে পারে পাহাড়ে। পাহাড়ের মাথায় অসংখ্য মন্দির। জৈন ধর্মের ২৪ জন তীর্থঙ্করের মধ্যে ২০ জন এখানে মোক্ষ লাভ করেন। তাই এই পাহাড়কে বলা হয় ‘শিখরজি’। এই পাহাড়ে চড়া এক বিরল অভিজ্ঞতা। পায়ে হেঁটে বা ডুলিতে চড়ে ন’ কিমি পথ ভেঙে শিখরে পৌঁছোতে হয়। জঙ্গল-পথে পড়ে বেশ কিচু ঝরনা। সকাল সকাল পৌঁছে গেলে শিখর থেকে নামতে বিকেল হয়ে যায়। মধুবনেও অনেক মন্দির আছে। তবে পরেশনাথ পাহাড় থেকে নিসর্গদৃশ্য ভোলার নয়।
(৪) পরেশনাথের পথেই আরও ৩৫ কিমি এগিয়ে গেলে তোপচাঁচি লেক। পরেশনাথ পাহাড়মালা দিয়ে ঘেরা এই লেকের সঙ্গে বাংলা সিনেমার অনেক নস্টালজিয়া জড়িয়ে।
(৫) মধুপুর পেরিয়ে ৫৯ কিমি দূরে পাতরোলের কালীমন্দির। দেউলধর্মী মন্দিরে ৩০০ বছরের প্রাচীন দেবীমূর্তি।
(৬) মধুপুরের পথে ৪৫ কিমি গেলে বাকুলিয়া ফল্‌স
আরও পড়ুন পুজোয় অদূর ভ্রমণ / চাঁদিপুর-পঞ্চলিঙ্গেশ্বর-সিমিলিপাল-ভিতরকনিকা


কোথায় থাকবেন
(১) দেওঘর, এবং গিরিডিতে রয়েছে ঝাড়খণ্ড পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হোটেল। এর মধ্যে দেওঘরের হোটেলেই অনলাইনে বুক করা সম্ভব। দেওঘরে ঝাড়খণ্ড পর্যটনের একাধিক হোটেল আছে। দেওঘরে শহরে না থেকে ত্রিকুট পাহাড়ে ঝাড়খণ্ড পর্যটনের ‘টুরিস্ট কমপ্লেক্স’-এও থাকতে পারেন। অনলাইন বুকিং: jharkhandtourism.gov.in। এই ওয়েবসাইট থেকে গিরিডির হোটেলেরও সন্ধান পেয়ে যাবেন।
(২) গিরিডিতে ঝাড়খণ্ড পর্যটনের হোটেলে যোগাযোগ ৯৪৩১১৪৪৯২৭।
(৩) শিমূলতলায় আগেভাগে হোটেল বুকিং-এর দরকার নেই। স্টেশনে পৌঁছে দেখেশুনে বাড়ি নির্বাচন করতে পারেন।
(৪) তা ছাড়া সর্বত্রই বেসরকারি হোটেল আছে। সন্ধান পাবেন বেসরকারি হোটেলের ওয়েবসাইটগুলি থেকে। শিমুলতলা, দেওঘরে পাবেন হলিডে হোম। হলিডে হোম-এর জন্য দেখুন www.holidayhomeindia.com। এছাড়া অনলাইনে হোটেল বুকিং করতে পারেন trivago.com থেকে।


কী ভাবে ঘুরবেন


(১) দেওঘরে গাড়ি, অটো বা টাঙা ভাড়া করে ঘুরতে পারেন। সময় বেশি লাগলেও প্রথম দিন টাঙা ভাড়া করে বৈদ্যনাথ মন্দির, তপোবন, নওলাক্ষি মন্দির, সংকটমোচন মন্দির ও কুণ্ডেশ্বরী মন্দির দেখে নিন। খরচ কম পড়বে, অন্য একটা অভিজ্ঞতাও হবে।(২) দ্বিতীয় দিন দুমকার বাসে বা শেয়ার ট্রেকারে ত্রিকুট পাহাড় চলুন। বাসে গেলে ২ কিমি মতো হাঁটতে হবে। ত্রিকুট ঘুরে এসে দেওঘরের বাকি দ্রষ্টব্য দেখে নিন।
(৩) শিমুলতলায় হেঁটে, অটোয় ঘুরুন।
(৪) বেড়ানোর জন্য গিরিডিতে প্রায় চারটি দিন রয়েছে। প্রথম দিন পৌঁছে শহরটা ঘুরে নিন, কিছুটা হেঁটে, কিছুটা স্থানীয় যানে। স্মৃতিধন্য বাড়িগুলো দেখুন। একটা দিন পুরো রাখুন পরেশনাথ বা পরেশনাথ-তোপচাঁচির জন্য। আর একটা পুরো দিন রাখুন বাকুলিয়া ফল্‌স, মধুপুর শহর ও পাতরোলের মন্দির দর্শনের জন্য। শেষ দিন রাতে ট্রেন। সারা দিনটা হাতে। চলুন উশ্রী ফল্‌স, খান্ডোলি পাহাড়।


মনে রাখবেন
(১) দেওঘরে বৈদ্যনাথের পাণ্ডাদের সাহায্য ছাড়াও পুজো দেওয়া যায়।
(২) পরেশনাথ পাহাড়ে চড়লে সে দিন তোপচাঁচি লেক দেখা যাবে না।
(৩) গিরিডি থেকে ফেরার সুবিধা। তাই এই ভ্রমণসূচিতে দেওঘর থেকে শিমুলতলা হয়ে শেষে গিরিডি রাখা হয়েছে। ফেরার পক্ষে রাতের গিরিডি লিঙ্ক এক্সপ্রেসটি সুবিধাজনক ট্রেন। ট্রেনে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন