শ্রাবণরাতে তালসারিতে

sambhuশম্ভু সেন

“আঁধার অম্বরে প্রচণ্ড ডম্বরু বাজিল গম্ভীর গরজনে।/অশ্বত্থপল্লবে অশান্ত হিল্লোল সমীরচঞ্চল দিগঙ্গনে/নদীর কল্লোল, বনের মর্মর, বাদল-উচ্ছ্বল নির্ঝরঝর্ঝর,/ধ্বনি তরঙ্গিল নিবিড় সংগীতে –- শ্রাবণসন্ন্যাসী রচিল রাগিনি।/কদম্বকুঞ্জের সুগন্ধমদিরা অজস্র লুটিছে দুরন্ত ঝটিকা।/তড়িৎশিখা ছুটে দিগন্ত সন্ধিয়া, ভয়ার্ত যামিনী উঠিছে ক্রন্দিয়া — /নাচিছে যেন কোন প্রমত্ত দানব মেঘের দুর্গের দুয়ার হানিয়া।”

‘রুদ্র নাচের তালে’ ঝড় উঠেছিল সেই রাতে। বেদম ঝড়। তার পরে উথালিপাথালি বৃষ্টি। ঘন অন্ধকারের চাদরে ঢাকা চারপাশ। ক্যাসুরিনা-ঝাউ-আকাশমণি-ইউক্যালিপটাসের পাতায় শনশনানি, ডালে ডালে ঠোক্কর — ‘গহনরাতে শ্রাবণধারা পড়িছে ঝরে’। হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় আবৃত্তি-গান-গল্প। পান্থনিবাসের ঘরে আজ আমাদেরই রাজ।

মন উড়ি উড়ি করছিল। শ্রাবণে কোনও ‘ভার্জিন’ জায়গায় বেরিয়ে পড়লে হয় না!

‘ভার্জিন’ অবশ্য নয়, ‘নেভ’ বলা যেতে পারে। বেশ সহজ সরল অকপট জায়গা, টুরিস্টি নয়। টুরিস্টদের পা পড়ে বটে, তবে কেউই বিশেষ রাত কাটায় না। দিঘা থেকে এক চক্কর ঘুরে আসা যায়। অথচ এখানে সমুদ্র আছে, নদী আছে, দেশি নৌকায় জলপাড়ি আছে, সৈকত আছে, বালিয়াড়ি আছে, সন্ন্যাসী কাঁকড়ার অভিসার আছে, মাছ আছে, বক আছে, জেলেদের অভিযান আছে, চাঁদ আছে, বন আছে, বনজ্যোৎস্নার দাপাদাপি আছে।

এ সব ভেবেই বেরিয়ে পড়া।

দিঘা থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ওড়িশা সীমানা। কিয়াগেড়িয়া। পশ্চিমবঙ্গের শেষ গ্রাম। তার পর আরও তিন কিলোমিটার গেলে চন্দনেশ্বর। মোড় থেকে বাঁয়ে। ডাইনে পড়ে রইল বিখ্যাত মন্দির। গাড়ি এগিয়ে চলল সঙ্কীর্ণ পিচ রাস্তা ধরে। দু’দিকে অগোছালো কাজুর বাগান। গাছ ঝুঁকে এসেছে রাস্তায়, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। মাঝেমধ্যে ঘর-গেরস্থালি। কখনও কখনও রাস্তাই বাড়ির উঠোন। ধান তো বটেই, কাপড়চোপড় শুকোনোরও জায়গা। এমনকী চু কিত কিত, আইসপাইস, কাবাডি খেলার ময়দানও। রাস্তা যতই এগিয়েছে ততই গ্রাস করেছে নির্জনতা। হারিয়ে গেছে গাঁ-ঘর।

talsari-o

চন্দনেশ্বর থেকে ৪ কিলোমিটার। শেষে অল্পবিস্তর চড়াই। হঠাৎই গাছগাছালির মাঝে উঁকি দিল ওড়িশা পর্যটনের পান্থনিবাসটি।

মাসটা শ্রাবণ হলেও এ যেন ভরা ভাদর। কোথায় সেই পাগলপারা শ্রাবণধারা, যার জন্য এখানে ছুটে আসা ? বৃষ্টির লেশমাত্র আভাস নেই। রোদ বেশ তেজি। খাওয়াদাওয়ার পর বিশ্রাম। রোদ পড়তেই সৈকতের পথে। পান্থনিবাসের ফটকের বাইরে রাস্তা দু’ভাগ। একটা হারিয়ে গেছে জঙ্গলের মধ্যে, আরেকটা ক্রমশই নেমে গেছে সৈকতের দিকে। অল্প যেতেই পিচ রাস্তা শেষ। মাটির ঢালু পথ। গড়িয়ে গেছে এলোমেলো।

সুবর্ণরেখা এখান থেকে ১২ কিলোমিটার আগে সমুদ্রে মিশেছে। আর তারই একটা শাখা বেমালুম বিছিন্ন হয়ে সমুদ্রে নিজেকে সঁপে দিয়েছে এই তালসারিতে। তাই তালসারিতে সমুদ্রকে ছুঁতে হলে জোয়ারের সময় ছোটো নদীটা নৌকায় পেরোতে হয়। আর ভাটার সময় হাঁটুজল ভেঙে চলে যাওয়া যায় সমুদ্র-সান্নিধ্যে। শেষ বিকেলে সেই নদীতে এখন ভাটার টান। রোদের আদর মেখে শান্ত নদীটি এখন পটে আঁকা ছবি। তবু সমুদ্র-দর্শন দূর থেকেই সাঙ্গ করতে হল। স্থানীয় মানুষজন আকাশের দিকে তাকিয়ে কী বুঝলেন কে জানে, বললেন গতিক সুবিধের নয়, ও-পারে গিয়ে ফেঁসে যেতে পারি। আমরা কিছু কূলকিনারা পেলাম না।

অফ সিজনের সৈকতভূমি। ঝিনুকখচিত বালুকাবেলায় সন্ন্যাসী কাঁকড়ার অবাধ রাজত্বে নাক গলিয়ে আমরাই ক্লান্ত হলাম। অবশেষে হব-হব সন্ধ্যায় চায়ের টানে মধুদার দোকানে।

মধুদা মানে মধুসূদন সাহু। বালেশ্বরের প্রত্যন্ত গ্রামের আবাস ছেড়ে রুজির টানে এই সৈকতে আস্তানা গেড়েছেন স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে। ছিটেবেড়া দেওয়া মাটির ঘরের ছিটের চালটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে তারই তলায় দোকান দিয়েছেন। বয়ামে রাখা থিন এরারুট, মারি বা নিমকি জাতীয় বিস্কুট। আছে লাড্ডু জাতীয় শুকনো কিছু মিষ্টি। চা তো আছেই। সকালে-বিকেলে মধুদা গরম গরম সিঙাড়া, তেলেভাজারও ব্যবস্থা রাখেন। আর টুরিস্টরা আগাম অর্ডার দিলে ভাত-মাছ বা রুটি-মাংসও।

মধুদার সঙ্গে ঘরসংসারের গল্প করতে করতে কখন আকাশ কালো করে এসেছে খেয়াল করিনি। মধুদাই মেঘটা দেখিয়ে দিলেন, বললেন ঝড় আসছে। কে যেন এর মধ্যে গান ধরল ‘শাওনগগনে ঘোর ঘনঘটা’। যতটা সম্ভব দ্রুত পা চালালাম। সামনে বালিয়াড়ি, কিছুটা চড়াইও। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। নেমে এল প্রচণ্ড ঝড়। আর সেই ঝড়ের দমকে সবেগে দুলতে লাগল গাছগাছালি। বনরাজি মাতাল, কখন যে কী করে বসে ঠিক নেই। ঝড়ের তালে উড়ছে বালি। দৃষ্টিপথ রুদ্ধ। আমরা একেবারে নাজেহাল। হঠাৎই যেন মিশমিশে কালো নিশান উড়িয়ে চরাচরে নেমে এল আঁধার। পান্থনিবাসের ফটকের আলোটুকুও হারিয়ে গেল। নিকষ কালো আঁধারে সবাই ছন্নছাড়া। শুধু গলার আওয়াজে বোঝা গেল, সকলেই আশেপাশে। গন্তব্য সামান্য দূরে, অথচ কেউই সেখানে পৌঁছোতে পারছে না। হঠাৎই থেমে গেল ঝড়ের মাতন। কালো মেঘ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়তে লাগল। বৃষ্টি এল ঝমঝমিয়ে। আর আকাশ জুড়ে মাঝেমাঝেই শিকল ছড়িয়ে দিতে লাগল বিদ্যুৎ। সেই হঠাৎ হঠাৎ ঝলকানিতেই হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে চললাম। এ ভাবেই এক সময় পেয়ে গেলাম পায়ের তলার মাটি, থুড়ি পিচের রাস্তা। এবং অদূরেই দেখা গেল কে যেন আলো দুলিয়ে দুলিয়ে সংকেত দিচ্ছে। সেই আলোই আমাদের নিয়ে এল পান্থনিবাসে।

ঝড় উঠতেই লোডশেডিং। এখনও বিদ্যুৎ বেপাত্তা। আর তারই মাঝে চলছে আসর, আবৃত্তি-গান-চা-পকোড়ায়।

কখন যেন থেমে গেল ঝড়বৃষ্টি। নদী, সমুদ্র, সৈকত আর বনানী –– সব মিলেমিশে যেন এক নিশুতপুরে বাস এখন। মাঝেমাঝে শুধু কানে আসছে গাছের পাতা থেকে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ার শব্দ — টুপটাপ, টুপটাপ।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া/সাঁতরাগাছি থেকে ট্রেনে দিঘা। মালদা, নিউ জলপাইগুড়ি, পুরী, বিশাখাপতনম থেকেও ট্রেন আসে দিঘায়। কলকাতার এসপ্ল্যানেড-সহ বিভিন্ন জায়গা, হাওড়া এবং রাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে বাস। সেখান থেকে গাড়িতে তালসারি। গাড়ির ড্রাইভারকে বলে রাখলে নির্দিষ্ট দিনে এসে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

কোথায় থাকবেন

বেসরকারি কিছু ব্যবস্থা থাকলেও তালসারিতে সব থেকে ভালো ওটিডিসি’র পান্থনিবাস। অনলাইনে বুক করুন www.panthanivas.com.

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.