চন্দন বিশ্বাস

৩৫ বছর আগে জাপান থেকে আগত একটি অভিযাত্রী দল প্রথম আরোহণ করার প্রচেষ্টায় আসেন হিমাচলের এই অনামি ভার্জিন শৃঙ্গটি। মানালি থেকে কেলং হয়ে উদয়পুরের রাস্তায় ঢুকতে উদয়পুরের ২০ কিলোমিটার আগে থিরট। থিরট থেকে চন্দ্রভাগা নদী পেরিয়ে ঝলিং ধার দিয়ে যেতে হবে ৬১১৩ মিটারের এই শৃঙ্গটির দিকে। শৃঙ্গটির ঠিক পিছনেই রয়েছে আমাদের পরিচিত ছবিয়া পাস। অসফল ছিল সেই অভিযান।

ঘটনার ৩০ বছর পর ২০১২ সালে ‘সোনারপুর আরোহী’র তরফে আরও একবার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আগের থেকে কোনো তথ্য না থাকায় বেশ খানিক এগিয়েও পিছিয়ে আসতে হয় যথেষ্ট ইকুইপমেন্ট এবং গিয়ার্স না থাকায়। এইবছর ‘সোনারপুর আরোহী’র থেকে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করা হয়েছিল। কলকাতা থেকে ১৬ আগস্ট মানালির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন দশ সদস্যের এক দল, দলনেতা রুদ্রপ্রসাদ হালদার। আরোহীর অন্যান্য অভিযানের মত এই অভিযানেও অনেকটাই স্পনসর করেছিলেন ক্যানিং-এর গ্যালাক্সি মোবাইল স্টোরের কর্ণধার ইকবাল গাজি।

পোর্টারদের অসহযোগিতায় থিরট থেকে বেসক্যাম্পে পৌঁছাতে একটু অসুবিধা হলেও ২২ আগস্ট বেসক্যাম্প এসটাব্লিশ করা হয়েছিল। প্রথমে ডানদিকের রিজ ধরে অনেকটা গিয়ে ক্যাম্প ১ এসটাব্লিশ করা হয়েছিল। অত ভার বহন করে ক্যাম্প ১ এসটাব্লিশ করা মুখের কথা না। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ক্যাম্প ১ থেকে এগোতে গিয়ে দেখা যায় যে আর এগোনো যাচ্ছে না, কোনো রাস্তা নেই। আবার সব মালপত্র গুটিয়ে ফিরে আসতে হয় বেসক্যাম্প। ইতিমধ্যেই বাকি সদস্যরা বাদিকের রিজ ধরে বেশ খানিকটা এগিয়ে দেখে এসেছে রাস্তা, মনে হচ্ছে যাওয়া যাবে। বাদিকের রিজ ধরে গিয়ে একটি গ্লেসিয়ারের উপর ক্যাম্প ১ তৈরি করা হয়। দলনেতা রুদ্রপ্রসাদ এবং একজন শেরপা আরও একটু এগিয়ে দেখে আসেন ক্যাম্প ২-এর জায়গাটাও। ক্যাম্প ২ পিকের ঠিক নীচেই। ক্যাম্প ২-কেই সামিট ক্যাম্প ঠিক করা হয়েছে। ক্যাম্প ২ সামিট ক্যাম্প হলেও রাস্তা বন্ধুর। মোটামুটিভাবে অনুমান করা গিয়েছিল সামিট ক্যাম্প থেকে সামিট করে ফিরতে ১৮ ঘন্টার একটা মার্চ লাগবে।

কিন্তু শুরু হল অন্য উপদ্রব। প্রবল হাওয়া, ভারী বৃষ্টি এবং স্নোফল। সবাই বেসক্যাম্পে আটক। শুধু বিপ্লব বৈদ্য এবং শেখ ওমর ফারুক  নেমে আসেন থিরট। যোগাযোগ করেন আমাদের সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার জন্য। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আরোহীর বাকি সদস্যরা কাজে নেমে পড়ে। ভারত সরকারের মেটালার্জি ডিপার্টমেন্টের ওয়েদার ম্যাপ নিয়ে গবেষণা করে শৌভিক মন্ডল বলেন ভারতের পশ্চিমে আরবসাগর, উত্তরে তিব্বত, পূর্বে মায়ানমার এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে ঘূর্ণাবর্ত পরিস্থিতি। উনি পরামর্শ দেন যে আগামী রবিবার পর্যন্ত আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। তারপরে আরও তিনটে দিন দেখে এগোনো হবে।

কয়েকদিনের মেঘলা আকাশ -বৃষ্টি আর স্নোফলের পরে প্রকৃতির সদয় মূর্তি দেখে সবাই প্রস্তুত। এবার শুরু বেসক্যাম্প থেকে প্রকৃত লক্ষের দিকে যাত্রা। মোটামুটি ১৮ ঘন্টার একটা মার্চ…তারপরই হয়তো আসবে কাঙ্খিত সাফল্য। সকালের দিকে যাত্রা শুরু হল, চেষ্টা হলো সারাদিন, নানা দিক দিয়ে, তবে খুব কাছাকাছি এসেও পিকের লোকেশনটা এমন যে তার সঠিক কোন অ্যাপ্রোচ খুঁজে পাওয়া গেলো না। বিপ্লব বৈদ্যের বক্তব্য অনুসারে টেকনিক্যালি টাফ এই পিকের ডিফিকাল্টি অতিক্রম করে শিখরে আরোহণ করা অন্তত এবার সম্ভব না।

ঠিক হলো পাশের আর একটি পিক সামিট করা হবে, এটাও ভার্জিন পিক, উচ্চতা ৬০০০ মিটারের কাছাকাছি।
ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই কাজে লেগে পড়া। প্রায় ৪৬০০ মিটারে তৈরি করা হয়েছিল ক্যাম্প ২। রাত এগারোটা নাগাদ রুদ্রপ্রসাদ হালদার এবং সঞ্জয় চক্রবর্তী শুরু করলেন তাদের সামিট মার্চ। ৭ সেপ্টেম্বর, ভোর পাঁচটায়  রুদ্রপ্রসাদ হালদার আর সঞ্জয় চক্রবর্তী শৃঙ্গ স্পর্শ করেন, সঙ্গে দাওয়া শেরপা, কালচেন শেরপা এবং লোপসাং শেরপা। উচ্চতা নির্ধারণ করা হয় ৫৭৮৯ মিটার।

যদিও এটা আরোহী’র টারগেট পিক ছিলো না। চেষ্টার ত্রুটি অবশ্য কারো ছিলো না, নানা দিক থেকে পিকের কাছাকাছি এসেও তার লোকেশনটা এমন একটা জায়গায় যে তার সঠিক অ্যাপ্রোচ খুঁজে পাওয়া যায়নি । বিপ্লব বৈদ্যের কথা অনুযায়ী, ‘টেকনিক্যালি টাফ এই পিকের ডিফিকাল্টি অতিক্রম করে অন্তত এবারের জন্য তাকে সামিট করা অসম্ভব। একে সামিট করতে গেলে পিকের চারপাশে আরও কয়েক বার রেইকি করা দরকার।’

দলনেতা রুদ্রপ্রসাদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, ‘টারগেট পিক টির সামনের দিকে তিনটি রিজের মধ্যে চারটি গ্ল্যেসিয়ার রয়েছে। প্রত্যেকটি গ্ল্যেসিয়ারের মধ্য দিয়ে প্রাণপন চেষ্টা করেও সর্বোচ্চ ৫২০০ মি. পর্যন্ত যাওয়া গেছে – তবে তার পর থেকে কোন অ্যাপ্রোচ রুট খুঁজে পাওয়া যায় নি এমনকি বরফের দেওয়াল ধরে দুই দুই বার ৬৫০ মি.রোপ ক্লাইম করার পরেও। তারপরে ক্লাইম করার আর সুইসাইডাল অ্যাটেম্প নেওয়ার সমান। তবে পিছনের দিক থেকে আছে ছবিয়া পাস। ঐ দিক থেকে খুঁজে পাওয়া যেতেও পারে অ্যাপ্রোচ কোনো রুটের।’
এছাড়া টারগেট পিক থেকে অনবরত রক ফল ও অ্যাভালাঞ্জ যে ভাবে হচ্ছিল তাতে করে সেটাকে মৃত্যুপুরী বলেই মনে হচ্ছিলো কোনো কোনো সদস্যের।

যাই হোক না কেন আবার অপেক্ষা পরবর্তী কোন এক্সপিডিশনের জন্য। আজ না হোক, কোন না কোন দিন অধরা এই পিকটি ধরা দেবেই – এই বিশ্বাস নিয়েই সফল অভিযাত্রীরা মানালি ফেরত আসেন। সম্পূর্ণ আনএক্সপ্লোরড জায়গায় এইরকম ট্রায়াল এন্ড এরর চলতেই থাকবে। প্রত্যেক সদস্য সেটার জন্য তৈরি ছিলেন।

ওরা দশজন:
রুদ্র প্রসাদ হালদার (দলনেতা)
বিপ্লব বৈদ্য
পার্থসারথী লায়েক
সৌমিত মন্ডল
বিমান নস্কর
বিরাজ বিশ্বাস
প্রতীপ বর্মণ
সঞ্জয় চক্রবর্তী
শেখ ওমর ফারুক
অভিজিত ঘোষ

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here