মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

পর্বতারোহণ কি শুধুই অ্যাডভেঞ্চার? হয়তো না। মনের পাহাড় ডিঙোতে শেখান যাঁরা, সেই সব মানুষের সান্নিধ্যে কাটল শুক্রবারের সন্ধেটা। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে অনুষ্ঠিত হল সোনারপুর আরোহী ক্লাবের ২৮তম বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠান।
বার্ষিক শৈলারোহণ শিবির আর গ্রীষ্মকালীন ট্রেকে অংশ নেওয়া এ এক ঝাঁক তরুণ তরুণীকে উৎসাহ দিতেই প্রতি বছর সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে এই সংগঠন। ১৯৮২-তে পথ চলা শুরু। দেখতে দেখতে তারা পার করেছে ৩৫টা বছর। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সংগঠনের সদস্যরা। ‘আরোহী’র দুই সদস্য প্রশান্ত মণ্ডল এবং করুণাপ্রসাদ মিত্র শেষ এক বছরে ছুঁয়ে এসেছেন ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। সম্প্রতি আরেক ‘আরোহী’ সত্যরূপ সিদ্ধান্ত ওশিয়ানিয়ার কারস্টেনসৎজ সফল অভিযান সেরে ফিরেছেন দেশে। সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্মান জানালো হল এঁদের। সম্মানিত করা হল ২০১৭-এর এভারেস্ট অভিযানের বাংলার দুই সফল পর্বতারোহী শেখ সাহাবুদ্দিন আর কুন্তল কাঁড়ারকেও।


বাংলার অ্যাডভেঞ্চার জগতে সারা জীবনের অবদানের জন্য স্বীকৃতি দেওয়া হল প্রবাদপ্রতিম পর্বতারোহী মানিক ব্যানার্জিকে। মানিকবাবুর হাতে স্মারক তুলে দিলেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি চঞ্চলকুমার মিত্র। দুই কিংবদন্তির বক্তব্যেই উঠে এল কত কত অভিযানের স্মৃতি। একে অন্যের নেতৃত্বে অভিযানে গিয়েছেন বহু বার। নস্টালজিয়া ভরা সেই সব মুহূর্ত ছুঁয়ে গেল দর্শকের মন।
আগামী মাসেই হিমাচলপ্রদেশের অনামি অবিজিত এক শৃঙ্গের উদ্দেশে পাড়ি দেবে সোনারপুর আরোহীর দশ সদস্যের একটি দল। নেতৃত্ব দেবেন দলের সেক্রেটারি রুদ্রপ্রসাদ হালদার। সুমন্ত রায়ের নেতৃত্বে সেপ্টেম্বরে ট্রেল’স গিরিবর্ত্ম অভিযানে যাচ্ছেন আরও দুই সদস্য। দু’টি অভিযানের জন্যই পতাকা তুলে দেওয়া হল দলনেতাদের হাতে। অবিজিত শৃঙ্গ ছুঁতে পারলে তার নাম দেওয়া হবে প্রয়াত পর্বতারোহী গৌতম ঘোষের নামে, এমনটাই ইচ্ছে দলের সদস্যদের।

অ্যাডভেঞ্চারের নেশা যাঁদের শিরায় শিরায়, সেই মানুষগুলোর আলোচনাতেও কিন্তু বারবারই উঠে এল একটাই প্রসঙ্গ। পাহাড় মানে শুধুই এভারেস্ট নয়, পাহাড় মানে শুধু বরফ-পাথরের স্তূপও নয়। পর্বতারোহণ জীবনের প্রতি এঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটেছে। জীবনের নানা ধাপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যে সব এভারেস্ট, তা ডিঙোতে সাহায্য করেছে। তাই নতুন প্রজন্মকেও এই বার্তাই দিতে চাইলেন প্রবীণরা – মনটাকে পাহাড়ের মতো বড়ো করো।


যাঁরা প্রত্যক্ষ ভাবে পর্বতারোহণের সঙ্গে যুক্ত নন অথচ অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে মুখিয়ে থাকেন, তাঁদেরও হতাশ করেনি সংগঠনের প্রকৃতিপাগল সদস্যরা। সমাবর্তন মঞ্চেই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত হল বার্ষিক পত্রিকা ‘আরোহী’। অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করছিল অন্য রকম চমক। কলকাতায় বসেই স্লাইড শো-র মাধ্যমে নিমেষের মধ্যে পাড়ি দেওয়া হল কারস্টেনসৎজ পিরামিডের ঘন জঙ্গলে। সত্যরূপের সদ্য সম্পূর্ণ হওয়া অভিযানের রোমাঞ্চ বুকে নিয়েই সন্ধে গড়িয়ে রাত নামল শহরে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন