বিদেশের সীমানা পেরিয়ে দেশ, সাইকেলে ট্রান্স-হিমালয় অভিযানে অবিরাম হৃদয়পুরের চন্দন

0
2176
মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

সদ্য নেপাল সফর সেরে দেশে ঢুকেছেন। না, ঘরে ফিরছেন না এখনই। গল্পটা বোধহয় অনেকেরই জানা এখন। সাইকেলে চেপে ট্রান্স হিমালয় অভিযান করছেন বাংলার চন্দন বিশ্বাস। আপাতত দিন দুয়েকের জন্য আস্তানা গেড়েছেন দেহরাদুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই ফোনে কথা হল খবর অনলাইনের সঙ্গে।
অরুণাচল, ভূটান, সিকিম, নেপাল, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, জম্মু ও কাশ্মীর (লাদাখ)- ট্রান্স হিমালয়ের যাত্রাপথটা এইরকম(প্রায় ৮০০০ কিলোমিটার পথ)। আর কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, আসাম, নাগাল্যান্ড হয়ে অরুণাচলের পথেও চন্দনের সঙ্গী ছিল তাঁর সাইকেল। শেষ চার মাসে পেড়িয়ে এসেছেন ৫০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ। অবশ্য সবকিছুই যে পরিকল্পনা মাফিক এগিয়েছে, এমনটা নয়। ‘বার্ষিক জাতীয় সুখ’-এর হিসেব করা দেশটায়(ভুটান) সাইকেল সফর এখন নিষিদ্ধ, তাই সেখানকার সফর-সুখ পাওয়া হয়ে ওঠেনি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় এই তরুণের। নিজের ঘরের কোনের আরামটুকু বিসর্জন দিয়ে মাসের পর মাস একা ঘুরে বেড়াতে কেমন লাগে? একটুও কি গ্রাস করে না একাকিত্ব? প্রশ্ন করতে না করতেই এল উত্তর, “ধুর, চার মাসে ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে চারপাশ, নানা রকমের মানুষ, এক এক জায়গায় এক এক রকমের খাওয়া দাওয়া, এক এক রকমের সুর, ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা। রোজ এত নতুন কিছু দেখছি, একাকিত্ব আসবে কোথা থেকে? একা আছি, এই বোধটাই আসেনি কখনও”।


পাহাড়ে ঘুরতে যেতে যেতেই রক ক্লাইম্বিং, মাউন্টেনিয়ারিং,  র‍্যাফটিং-এর নেশা চেপে বসে কিশোরবেলায়। তারপর একদিন মাথায় আসে মাউন্টেন বাইকিং-এর ভাবনা। সাইকেল নিয়ে আসমুদ্র-হিমাচল(আক্ষরিক অর্থেই) দাপিয়ে বেরানোর শুরুটা এভাবেই। দু-চাকায় ভর করে ইতিমধ্যে চষে বেড়িয়েছেন জম্মু কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, গোয়া। ট্রান্স হিমালয় ভ্রমণের ভাবনা মনে আসে বছর খানেক আগে। তারপর দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব। যাত্রাপথ সম্পর্কে বিস্তর পড়াশোনা করতে হয়েছে মাঝের বেশ কিছুটা সময়। তবে রাজ্যে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের অনুকূল পরিবেশ না থাকায় স্পনসরশিপ, অনুমতিপত্র, অভিযানের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পেতেই অনেকটা সময় চলে গিয়েছে, আক্ষেপ করলেন হৃদয়পুরের ছেলেটা। ট্রান্স হিমালয় ভ্রমণের খরচ নেহাত কম নয়, সাড়ে ছ’লক্ষ টাকা। তবে সে খরচ পুষিয়ে দিতে বন্ধু- বান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়-পরিজন এগিয়ে এসেছেন সবাই। বিশেষ করে মামা সুদীপ্ত মিত্রের কথা না বললেই নয়। এর পর বছর ভর সরকারি আধিকারিক, মন্ত্রী-আমলাদের কাছে ছোটাছুটি তো ছিলই। সেখানেও বিশেষ সাহায্য করেছেন কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার কল্যাণ মুখোপাধ্যায়। ট্রান্স হিমালয় অভিযানের স্বপ্ন দেখার সময় থেকে এখনও পর্যন্ত পাশে পেয়েছেন শহরের দুই সংস্থা ‘সোনারপুর আরোহী’(চন্দনের নিজে এই ক্লাবেরই সদস্য) এবং ‘অ্যাল্পাইন’কে।


তবে যে সব পথ নিয়ে মনে অনিশ্চয়তা ছিল, তা পেড়িয়ে এসছেন চন্দন। হিমাচল আর লাদাখের রাস্তা তাঁর অনেকটাই চেনা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুমতি পেলে সিয়াচেন সীমান্ত পর্যন্ত যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সব ঠিকঠাক চললে আর মাস দুয়েকের মধ্যেই অভিযান সম্পূর্ণ হবে। ১৯৮০ সালে বিদ্যুৎ সরকার (ছোড়দা) প্রথম পায়ে হেঁটে ট্রান্স হিমালয় অভিযান করেছিলেন। ১৯৯৫তে বাচেন্দ্রি পাল মহিলাদের একটি দল নিয়ে একই অভিযানে বেড়িয়েছিলেন। রাজীব মণ্ডল ২০০৯ সালে হেঁটে এবং ২০১৩-তে মোটর বাইকে এই পথ ভ্রমণ করেছিলেন। তবে সাইকেলে এখনও পর্যন্ত কোনো সফল ট্রান্স হিমালয় অভিযান হয়নি।


রোজ রোজ এত যে বৈচিত্রের সাক্ষী থাকছেন, মানুষের সাথে তাঁর স্বাদ ভাগ করে নিতে চান চন্দন। ভবিষ্যতে তথ্যচিত্র বানানোর লক্ষ্যেই নিয়মিত চলছে ভিডিওগ্রাফি। পেশায় আলোকচিত্র শিল্পী হলেও লেখালেখির অভ্যেস দীর্ঘ দিনের। অভিযানে বেড়িয়েও দৈনিক সফর শেষে তাই ভরে ওঠে ডায়েরির পাতা। আগামী দিনে ওই পথে অভিযান করবেন যারা, তাঁদের জন্য নিজের অভিজ্ঞতা লিখে রাখতে চান চন্দন। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ঘর ছেড়েছিলেন। তারপর থেকে কেমন কাটছে জীবন? ভোরবেলা উঠে বেড়িয়ে পড়া, টানা আট থেকে ১০ ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে রাতের আশ্রয় খোঁজা। শেষ ক’মাসে কখনও রাত কাটিয়েছেন থানায়, ধর্মশালায়, গুরুদ্বার-মন্দিরে, কখনও বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাদ পড়েনি শ্মশানও। আর তাঁবু খাটানোর সব সরঞ্জাম তো রয়েইছে নিজের ঝোলায়। পথ চলতে চলতে ভরছে অভিজ্ঞতার ঝোলাটাও। কোথাও ফজলুল মিয়াঁর ছোট্ট মেয়েটা বলছে তাঁর সফর-সঙ্গী হবে। কোথাও আবার ভিনদেশী সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে নেপালি ভাষায় জমে উঠছে আড্ডা। বাকি পথটা জুড়েও নিশ্চই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে এমনই কিছু ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’।

আরও পড়ুন: সাইকেলে চেপে হিমালয় ভ্রমণ, যাত্রা শুরু হৃদয়পুরের চন্দনের

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here