নিয়ম ভাঙার ৫০ বছর, সেই সব দিন ফিরে পেতে ফের অভিযানে দীপালি সিংহ

0
2082
মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

শেষটা দিয়েই শুরু করা যাক। এ কথা সে কথায় কখন যে সন্ধে নেমেছে দক্ষিণ কলকাতায়, খেয়াল হয়নি। ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁইছুঁই। নজরুল-কবিতাপাঠের আসরে আর যাওয়াই হল না দীপালি্দির। ১৯৬৭-র বাংলার প্রথম মহিলা পর্বতারোহণ অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া দীপালি সিংহ। সে দিনের সেই দামাল মেয়ে এখন সত্তর পেরিয়েছেন। স্বামী, সন্তান দু’জনেই কর্মসূত্রে কলকাতার বাইরে। এ শহরে একাই থাকেন দীপালিদি। গান, কবিতা,  নাটক, বই, গল্প-আড্ডা নিয়ে দিব্যি আছেন। হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করছেন, নিয়মিত ট্রামে বাসে যাতায়াত, বাজারহাট সবই করছেন। সামনের জুলাইয়ে যাচ্ছেন চন্দ্রতাল। উপলক্ষ, পূর্ব ভারতের মহিলাদলের প্রথম পর্বত অভিযানের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন।

সময়ের হিসেবই শুধু বলে দেয় অফুরান প্রাণশক্তি নিয়ে সামনে বসে থাকা মহিলা আসলে ৭১ বছরের এক বৃদ্ধা। মনের বয়স ঠিক কত? যখন যে সময়ের গল্প বললেন, মনে হল দু’জনেই ছুঁয়ে দেখছি যেন মুহূর্তটা। কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। পর্বতারোহণের কোর্সে নাম লিখিয়ে বাড়ি ফিরল মেয়ে। তার পর বাবার কাছে জানতে চাওয়া ‘মাউন্টেনিয়ারিং কী?’। খুব স্বচ্ছ ধারণা না থাকলেও পরিবারের সদস্যদের অমতেই মেয়েকে উৎসাহ দিতে ছাড়েননি বাবা। প্রাথমিক বাছাই পর্বে রোগা হওয়ার জন্য প্রায় বাদ-ই পড়ছিলেন দীপালি। জেদ করেই দার্জিলিং পর্যন্ত গেলেন। তার পর শুরু হল হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট-এ বেসিক কোর্স। প্রশিক্ষণ পুরোটাই হত সিকিমে। সালটা ১৯৬৪। সিকিম তখনও ভারতের অংশ নয়। গোটা ইনস্টিটিউট পরিচালনার দায়িত্বে তখন তেনজিং নোরগে। প্রশিক্ষণের সময় সামান্য ঝড় উঠলেই মজা করে বলতেন, “দেওয়ালি (সারা জীবন এই নামেই তাঁকে ডাকতেন তেনজিং),  উড় জায়েগি,  শো জা” ।

বেসিক কোর্সের তিন বছরের মধ্যেই অভিযানের কথা মাথায় রেখেই অ্যাডভান্স কোর্স করলেন। কোর্স শেষে শুরু হল অভিযানের প্রস্তুতি। গন্তব্য গাড়োয়াল হিমালয়ের নন্দাঘুন্টি। কিন্তু দীপালি সিংহ ছাড়া দলের বাকি সাত জনের কারোরই অ্যাডভান্স কোর্স করা নেই। ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন (আইএমএফ)-এর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হল, এই অবস্থায় কোনো ভাবেই মিলবে না ছাড়পত্র। কিন্তু দীপালি আর তাঁর দলের মেয়েরা যে হারতে শেখেননি। জেদ ধরে বসে রইলেন, অভিযানে তাঁরা যাবেনই। রাজ্য কংগ্রেসের তৎকালীন প্রধান প্রফুল্ল সেন তাঁদের পাঠালেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। ইন্দিরা রাজি করালেন আইএমএফ প্রেসিডেন্ট এইচসি সারিনকে। শুধু ২০০০০ ফুটের বেশি উচ্চতার শৃঙ্গে অভিযানের অনুমতি না মেলায় গন্তব্য বদলে হল রোন্টি।

এ তো গেল বাইরের লড়াই। ঘরেরটা? বাবা ছাড়া পরিবারের গুরুজনদের মাথাব্যথার শেষ নেই। নাচগান শিখে দিব্যি লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘরে না থেকে একী অদ্ভুত নেশায় খেপল মেয়েটা! রাতের পর রাত বাড়ির বাইরে রাত কাটাতে হবে, এবং ফলস্বরূপ মেয়ের বিয়ে হবে না, এই চিন্তাতেই অস্থির পড়শি থেকে স্বজন। বাবা দেবেন্দ্রচন্দ্র সিংহ শুধু নিজের মেয়েকেই উৎসাহ দিতেন না, দীপালির দলের সদস্যদের প্রত্যেকের বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন, “মেয়েকে ছাড়ুন। পাহাড়ে উঠুক মেয়েরা”।

অবশেষে শুরু হল অভিযান। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় যখন দেবীদুর্গার বোধনে ব্যস্ত কলকাতা, বাংলার এক ঝাঁক দুর্গা বেরিয়ে পড়ল পাহাড় ছুঁতে। তাদের নেত্রী দীপালি। আর দলের চিকিৎসক হিসেবে মেজদা ডঃ দীপক সিংহ। সেই প্রথম অতগুলো মানুষের দায়িত্ব এসে পড়ল ২১ বছরের মেয়েটার মাথায়। দলের মেয়েদের সারাক্ষণ নজরে রাখা, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারও তাঁর ওপর। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে প্রতিটা মুহূর্ত।   সব মিলিয়ে একটা কখনো-ভুলতে-না-পারার মতো অভিজ্ঞতা। সফল হল পূর্ব ভারতের মহিলাদলের প্রথম পর্বতাভিযান। শিখর শীর্ষে আরোহণ করলেন স্বপ্না মিত্র (চৌধুরী)।অভিযান শেষে আবার শহর কলকাতায় ফেরা। ততদিনে মহিলাদের জন্য দীপালি তৈরি করে ফেলেছেন পর্বতারোহণ দল- পথিকৃৎ। বছর তিনেকের মধ্যেই প্রথম বারের জন্য শুধু মেয়েদের নিয়ে শুশুনিয়ায় রকক্লাইম্বিং কোর্সের আয়োজন করল পথিকৃৎ।

এর পর একের পর এক অভিযান। পথিকৃৎ-এর ব্যবস্থাপনায় ১২টা অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন দীপালি সিংহ। শেষ অভিযান ছিল ২০০০ সালে। চতুরঙ্গী অভিযান। মাঝে দীর্ঘ ১৭ বছরের ব্যবধান।

এ রকম অবস্থায় হঠাৎ নতুন করে চন্দ্রতাল যাওয়ার কথা মাথায় এল কী ভাবে? আগের গন্তব্যগুলোর তুলনায় চন্দ্রতাল নাকি ততটা দুর্গম নয়, তাই ‘অভিযান’ শব্দটায় ঘোর আপত্তি দীপালিদির। স্মৃতির সফরের নাম দিয়েছেন ‘ফিরে দেখা জার্নি’। “প্রথম অভিযানের ৫০ বছর পূর্তিতে ঘরে বসে থাকব, তা তো হয় না। কিন্তু গাড়োয়ালে আজকাল অনেক নিষেধাজ্ঞা। আমাদের শুরুটা গাড়োয়াল হিমালয় দিয়ে হলেও হিমাচল হিমালয়ে অনেক স্মৃতি রয়েছে। পুরোনো সময়গুলো একটুও যদি ছুঁয়ে আসতে পারি, বেশ হয়। তা ছাড়া আমাদের এক বন্ধু সুজয়া (গুহ) রোন্টি অভিযানের কয়েক বছরের মধ্যেই চন্দ্রতালের কাছে এক অভিযানে গিয়ে মারা যায়। ওখানে ওর একটা স্মৃতি সৌধ আছে। এই সব কারণেই বেছে নিলাম চন্দ্রতাল” — পুরোনো অ্যালবামের হলদে হয়ে আসা স্মৃতির কোলাজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন দীপালিদি।

অ্যালবামের প্রতি পাতায় সাদাকালো ছবিগুলোয় চোখ বোলাতেই যেন কথা বলে উঠছে ইতিহাস। এডমন্ড হিলারি, ক্রিস বনিংটন, জুনকো তাবেই-এর সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি রয়েছে তাতে। সময়গুলো অবশ্য আরও অনেক যত্নে রাখা আছে ‘পাহাড়ি’ মেয়েটার মনে। এত যে  জীবনীশক্তি, কোথাও কি যন্ত্রণা নেই? বন্ধু-সতীর্থদের অনেকেই আজ নেই। এমনকি চন্দ্রতাল যাওয়ায় যাঁর উৎসাহ ছিল সব চেয়ে বেশি, মাসখানেক আগে সেই স্নেহলতা বসাকও চলে গেলেন বিনা নোটিশেই। মাঝরাতে ঘুম ভাঙলেই কে যেন বলে উঠছে, “দীপালিদি, আমায় যদি না নিয়ে যাও, দেখো তোমায় আমি কী করি!” স্নেহলতার টিকিট ফেরত দেবেন না দীপালিদি। মনে মনে স্নেহলতা তাঁদের সঙ্গে চলুক, এটাই তাঁর ইচ্ছে। সঙ্গীদের মধ্যে আপাতত স্বপ্না মিত্র (চৌধুরী) আর  বেণুদির (বন্দ্যোপাধ্যায়) যাওয়া নিশ্চিত, এটা ভেবেই দু’ হাত দিয়ে প্রাণপণে সরাতে চাইছেন ভিড় করে আসা গাঢ় অন্ধকার।

বাংলার ঘরে ঘরে পর্বতারোহী জন্মাবে, এমন স্বপ্ন দীপালি সিংহ দেখেন না। তাঁর স্বপ্নটা আরও বড়ো। “সবাইকে পাহাড়ে চড়তে হবে, তার কোনো মানে নেই। প্রকৃতিকে আগে ভালোবাসতে শিখুক এই প্রজন্ম। অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পে গিয়ে পাহাড় ছুঁয়ে দেখুক, জলে নামুক, সাঁতার কাটুক, গাছের পাতা চিনুক, রাতের আকাশের তারাদের সঙ্গে একটু কথা বলুক। একটা সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ না পেলে ভবিষ্যতের ভালো নাগরিক তৈরি হবে কী করে?”

এখনকার অভিযান প্রসঙ্গে দীপালিদেবীর আক্ষেপ, “আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক সুবিধে যেমন হয়েছে, অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চটা হারিয়ে গেছে অনেকটাই। তরুণ প্রজন্ম হয়তো আগের থেকে বেশিই আসছে, সমাজের অহেতুক ট্যাবুও ফিকে হয়ে এসেছে অনেকটাই। তবু শুধু পাহাড়কে ভালোবেসে পাহাড়ের কাছে আসছে ক’জন?”

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here