সাক্ষাৎকারের সময় জানার জন্য ফোন করতেই ওপাশ থেকে কলারটিউনে ভেসে এল রোনান কিটিং-এর ‘ইফ টুমরো নেভার কামস্‌…’। পরে অবশ্য কথায়-গল্পে বারবারই বুঝেছি, নিজের জীবনেও এটাই বিশ্বাস করেন সত্যরূপ সিদ্ধান্ত। আগামী কালের ভরসায় নয়, এই মুহূর্তটা থেকে সবটুকু নিংড়ে নিয়ে বাঁচেন। সদ্য কারস্টেনসৎজ পিরামিড ছুঁয়ে সত্যরূপ দেশে ফিরেছেন এ মাসের শুরুতেই। পরবর্তী লক্ষ্য সেভেন সামিটের শেষ ধাপ- ভিন্সন ম্যাসিফ। গত সপ্তাহেই দিন দুয়েকের ঝটিকা সফরে কর্মক্ষেত্র বেঙ্গালুরু থেকে এসেছিলেন কলকাতা শহরে। ব্যস্ততার মাঝেই সময় দিলেন খবর অনলাইনকে

প্রশ্ন: কারস্টেনসৎজ-এর সফল অভিযানের জন্য প্রথমেই অভিনন্দন জানাই আপনাকে। কেমন ছিল ওশিয়ানিয়ার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অভিযানের অভিজ্ঞতা?
সত্যরূপ: ধন্যবাদ। কারস্টেনসৎজ অভিযানের অভিজ্ঞতা আমার বাকি অভিযানের থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানকার পাহাড় অনেক বেশি পাথুরে। উচ্চতা তুলনামূলক ভাবে কম হলেও অভিযান হিসেবে বেশ কঠিন। কিন্তু সব মিলিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা। দুর্গমতা বোঝাতে গিয়ে আমরা অনেক সময়-ই মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দিনের শেষে নিজের স্বপ্নকে ধাওয়া করেই তো অত দূর যাওয়া। নিশ্চয়ই কিছু একটা পাই বলেই যাই। প্রতিকূলতা কি ছিল না? মানুষখেকোদের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে অনেকটাই। তার ওপর কোথাও কোথাও এক হাঁটু কাদা পেরিয়ে মাইলের পর মাইল পথ হাঁটা। খরস্রোতা নদী পেরোতে হয়েছে একটা গাছের কাণ্ডের ওপর ভরসা করে। একটু এদিক ওদিক হলে তলিয়ে যেতে পারতাম। ওই অবস্থায় হ্যান্ডিক্যাম নিয়ে এপার ওপার করতে হয়েছে। মুসা (বাংলাদেশের পর্বতারোহী মুসা ইব্রাহিম) রেকর্ড করে রাখছে সেই দৃশ্য! নিজের হৃদস্পন্দন নিজে শুনতে পাচ্ছিলাম। এখন যখন তোমাকে বলছি, আমার কিন্তু গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। ওই মুহূর্তগুলো তো এভাবেই কেটে যায়। পরে স্মৃতি রোমন্থন করতে বসে মনে হয়, ওই রোমাঞ্চটুকুর জন্যই তো বেঁচে থাকা।

প্র: পরের লক্ষ্য তো অ্যান্টার্কটিকার ভিন্সন ম্যাসিফ। শুনেছি সেখানকার অভিযানের খরচ অনেক। স্পনসরশিপ জোগাড় হয়েছে? কীভাবে তৈরি করছেন নিজেকে?
সত্যরূপ : প্রতিটা অভিযানের আগে আমি মন থেকে প্রস্তুত থাকি, আমি যাবই। কিন্তু টাকা জোগাড় করাটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সমস্যা। নিজের এবং পরিবারের সব সঞ্চয় উজার করে, ব্যাঙ্ক থেকে, পরিচিতদের থেকে লোন নিয়ে কোনো ভাবে অভিযানের খরচটা তোলার চেষ্টা করি। এবারেও তাই। সেভেন সামিটের প্রতিটা অভিযানই ব্যয়সাপেক্ষ। ভিন্সন ম্যাসিফের জন্য ১০ লক্ষ টাকা স্পনসরশিপ দিচ্ছে আমার কলেজ। যদিও অভিযানের খরচের একটা বড় অংশ জোগাড় করা বাকি।

প্র: স্বপ্ন ছোঁয়ার জন্য সেভেন সামিটকেই বাছলেন কেন? কোথাও কি গ্ল্যামারটা মাথায় ছিল? বাংলার বহু পর্বতারোহীদের তো মনে হতেই পারে, তাঁদের চাইতে আপনার পক্ষে স্পনসরশিপ পাওয়াটা সহজ বলেই এমন ঝুঁকি নিতে পারছেন?
সত্যরূপ: সেভেন সামিটের শুরুটা করেছিলাম ২০১২ তে, আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো দিয়ে। আর জীবনের প্রথম স্পন্সরশিপ পাই ২০১৫-র এভারেস্ট অভিযানের সময়। আমার কলেজ থেকে আর ফেসবুকের বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতদের থেকে। নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের জন্য অভিযান বাতিল হল সেবার। চোখের সামনে কয়েক মিনিটের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল। আমার লড়াইটা এ রাজ্যের যে কোনও পর্বতারোহীর মতোই। বিশ্বাস করাটা কঠিন হলেও এটাই সত্যি। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ১৪ বছর চাকরি করেও বেঙ্গালুরুতে আমার নিজের বাড়ি নেই, গাড়ি নেই, এসব নিয়ে আমার আক্ষেপও নেই। হ্যাঁ, একটা সাইকেল আছে। আর অনেক স্বপ্ন আছে। স্বপ্নগুলোকে সত্যি করার জন্য কখনো চাকরি ছেড়েছি। কখনও একসঙ্গে দুটো চাকরি করেছি। শেষ দু’ বছর অভিযান ছাড়া আমার দিনগুলো কিভাবে কাটে জানো? সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে শুরু হয় অফিস। দু’খানা চাকরি সামলে রাত ১২ টায় ঘরে ফেরা। অভিযানের সময় এগিয়ে এলে ২০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে চাঙ্গা রাখি নিজেকে। ভোরবেলা ট্রেনার এসে ঘুম ভাঙ্গায়। ট্রেনারকে বলা আছে ততক্ষণ দরজায় কড়া নাড়তে, যতক্ষণ আমার ঘুম না ভাঙ্গে। এসব শোনার পরেও মনে হয় আমি গ্ল্যামারের পেছনে ছুটছি? তাহলে তো ৮০০০ মিটার উচ্চতার ওপরের যে কোনও শৃঙ্গ ছোঁয়ার স্বপ্ন দিয়েই শুরুটা করতাম। সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ছোঁয়ার ভাবনাটা অন্য কিছুকে মাথায় রেখে নয়। ওটা একেবারেই আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। পৃথিবীর নানা দেশ, সেখানকার মানুষ, তাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, সেখানকার বাস্তুতন্ত্র, পাহাড়ের পাশাপাশি এই সমস্ত বিষয়ও আমায় খুব টানে। সেই আগ্রহের জায়গা থেকেই সেভেন সামিটের স্বপ্ন দেখেছিলাম।

প্র: হিমালয়ের অন্যান্য শৃঙ্গ অভিযানের কোনো চিন্তাভাবনা নেই?
সত্যরূপ: ইচ্ছে তো থেকেই যায়, কিন্তু হিমালয়ের যে কোনো অভিযানই সময়সাপেক্ষ। এত ছুটি পাওয়াটা সমস্যা। এরকম ভাবার কোনো কারণ নেই, যে হিমালয় আমার কাছে গ্ল্যামারাস নয়। যে কোনও পাহাড়ই গ্ল্যামারাস। আর আমি যে জায়গা থেকে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি, আমার কাছে কিন্তু ৭০০-৮০০ মিটারের পাহাড়গুলোও এক একটা এভারেস্ট। অ্যাজমার রোগী হওয়ায় স্কুলজীবনে কোনোদিন ১০০ মিটার দৌড়ে অংশ নিতে পারিনি। আমার মতো অনেক মানুষ আছেন, যারা হাঁপানিতে ভুগতে ভুগতে পাহাড়ে চড়ার স্বপ্নটাই দেখে উঠতে পারেননি। আমি তাঁদের সবার হয়ে স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলাম।  ছ’হাজার-সাত হাজার মিটার নয়, ছোটো কোনো টিলায় উঠতে পারলে সেটাকেও আমার মিরাক্যল মনে হয়। মনে হয়, নিজের সঙ্গে লড়াইটা জিতলাম।  আমায় দেখে আজ অন্য কেউ অনুপ্রাণিত হচ্ছে, এটাই তো সবচেয়ে বড় পাওয়া। সম্প্রতি, বাংলাদেশের একটি ছেলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, এখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। আমার মতোই হাঁপানিতে ভুগত, আমার ভিডিও দেখে উৎসাহ পেয়ে নিজেকে তৈরি করেছে, এখন ও অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখছে।

প্র: কখনও মনে হয়েছে আমাদের দেশে তথা বাংলায় অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের পরিবেশ এখনও যথেষ্ট প্রতিকূল?
সত্যরূপ: এসব নিয়ে মন্তব্য করার জন্য অনেক বড় পর্বতারোহীরা রয়েছেন। আমি তো নিজেকে সেভাবে পর্বতারোহী মনেই করি না। এসব নিয়ে কথা বলা আমার সাজে না। তবে এটুকু বলতে পারি, অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষগুলো একটু বেঁধে বেঁধে থাকলে ভালো হয়। স্বপ্নের পরিসরটা আরেকটু বড়ো হয় তাহলে। স্বপ্নের ওপর তো আর জিএসটি বসাচ্ছে না কেউ। শুধু ক্লাবের গণ্ডীর মধ্যে অ্যাডভেঞ্চারকে বন্দি না রেখে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে ভালো হয়। তার জন্য ক্লাবগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা বাড়াতে হবে। আর এখনকার অভিযানগুলোতে দলের চেয়ে ব্যক্তি সাফল্য বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। কাউকে দোষ দেওয়াও যায় না এর জন্য। স্পনসরাররা ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাচিভমেন্টটাই দেখে। আগে কিন্তু দলের একজন সদস্য সামিট করলেও অভিযানকে সফল বলা হতো। সেই দিনগুলো ফিরে আসা সমগ্র পর্বতারোহণের পক্ষেই খুব দরকার।

সাক্ষাৎকার:মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here